আর্জেন্টিনা ও সুইৎজারল্যান্ডের মধ্যকার রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে একের পর এক নাটকীয় ঘটনায় জমে ওঠে ম্যাচ। প্রথমে সমতা ফিরিয়ে উচ্ছ্বাসে ভাসলেও মুহূর্তের মধ্যেই বড় ধাক্কা খায় সুইৎজারল্যান্ড। গোলের পর প্লে-অ্যাকটিংয়ের অভিযোগে ভিএআরের সহায়তায় দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখেন সুইস স্ট্রাইকার ব্রিল এমবোলো। ফলে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় তাকে এবং শেষ পর্যন্ত ১০ জনের দল নিয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়ে সুইৎজারল্যান্ড। অন্যদিকে সংখ্যাগত সুবিধা পেয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ়ভাবে নিজেদের হাতে তুলে নেয় আর্জেন্টিনা।
দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণের তীব্রতা বাড়িয়ে আর্জেন্টিনার রক্ষণে একের পর এক চাপ সৃষ্টি করছিল সুইৎজারল্যান্ড। সেই চাপেরই ফল আসে যখন ড্যান এনদোয়ে দুর্দান্ত এক আক্রমণ থেকে জালে বল পাঠিয়ে সমতাসূচক গোল করেন। গোলের পর সুইস সমর্থকদের উল্লাসে স্টেডিয়াম মুখর হয়ে ওঠে।
তবে আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। গোলের পর একটি সংঘর্ষের ঘটনায় এমবোলোর আচরণ ভিএআরের নজরে আসে। রিপ্লেতে দেখা যায়, তিনি অতিরঞ্জিতভাবে পড়ে গিয়ে ফাউলের অভিনয় করেছেন। রেফারি ভিডিও সহকারী প্রযুক্তির সহায়তায় বিষয়টি পর্যালোচনা করে তাকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখান। এর ফলেই লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় এমবোলোকে।
এমবোলোর বিদায়ের পর ম্যাচের গতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। একজন কম খেলোয়াড় নিয়ে খেলতে বাধ্য হওয়ায় সুইৎজারল্যান্ডকে রক্ষণাত্মক কৌশল গ্রহণ করতে হয়। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা বলের দখল বাড়িয়ে আক্রমণের ধার আরও তীব্র করে তোলে।
সংখ্যাগত সুবিধা পাওয়ার পর মাঝমাঠে আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে লিওনেল মেসিদের দল। ফলে সুইসদের জন্য পাল্টা আক্রমণের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে।
লাল কার্ডের আগেই ম্যাচে একাধিক গোলের সুযোগ তৈরি করেছিল সুইৎজারল্যান্ড। বিশেষ করে গ্রানিত জাকা কয়েকটি সহজ সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হন। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে একা পেলেও কাঙ্ক্ষিত ফিনিশিং করতে পারেননি তিনি।
এছাড়া বক্সের ভেতরে দ্রুত পাস আদান-প্রদান করেও শেষ মুহূর্তে তাল হারিয়ে ফেলছিল সুইস আক্রমণভাগ। সুযোগ তৈরি হলেও গোলের দেখা না পাওয়ায় চাপ বাড়তে থাকে তাদের ওপর।
প্রথমার্ধে ম্যাচের একমাত্র গোলটি আসে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের পা থেকে। আর্জেন্টিনার ধারাবাহিক আক্রমণের মধ্যেই তিনি দারুণ ফিনিশিং করে দলকে এগিয়ে দেন।
যদিও গোলের পর খুব বেশি পরিষ্কার সুযোগ তৈরি করতে পারেনি আর্জেন্টিনা। সুইৎজারল্যান্ড দ্রুতগতির ফুটবল খেলে মাঝমাঠে লড়াই জমিয়ে তোলে এবং আর্জেন্টিনার রক্ষণকে বারবার চাপে ফেলে।
পুরো ম্যাচেই লিওনেল মেসি ছিলেন আর্জেন্টিনার আক্রমণের মূল ভরসা। তিনি ক্রমাগত নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে সুইস ডিফেন্ডারদের বিভ্রান্ত করেন। তার ড্রিবলিং, ছোট ছোট পাস এবং দূরদর্শী বল বিতরণ আর্জেন্টিনার আক্রমণকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
মেসিকে ঘিরেই একাধিক আক্রমণ গড়ে উঠলেও শেষ মুহূর্তের ফিনিশিংয়ের অভাবে কয়েকটি সম্ভাবনাময় সুযোগ হাতছাড়া হয়।
সমতা ফেরানোর লক্ষ্যে সুইৎজারল্যান্ড আক্রমণের ঝড় তোলে। একসঙ্গে ছয় থেকে সাতজন ফুটবলার আক্রমণে উঠে এসে আর্জেন্টিনার ডিফেন্সকে ব্যস্ত রাখেন। এক পর্যায়ে রক্ষণভাগের ভুলে বিপজ্জনক পরিস্থিতিও তৈরি হয়। তবে গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ এবং ডিফেন্ডারদের দৃঢ়তায় বড় বিপদ এড়িয়ে যায় আর্জেন্টিনা।
এছাড়া বক্সের ঠিক বাইরে থেকে একটি ফ্রি-কিক পেলেও সেটি কাজে লাগাতে পারেনি সুইসরা। শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ায় আরেকটি সম্ভাবনাময় সুযোগ নষ্ট হয়।
এই ম্যাচে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দলের মধ্যে ছিল তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। সুইৎজারল্যান্ড দ্রুত বল আদান-প্রদানের মাধ্যমে আর্জেন্টিনাকে চাপে রাখলেও ম্যাক অ্যালিস্টার, রদ্রিগো ডি পল ও মেসির সমন্বয়ে ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায় আর্জেন্টিনা।
বিশেষ করে লাল কার্ডের পর সংখ্যাগত সুবিধা কাজে লাগিয়ে আর্জেন্টিনা বলের দখল ধরে রাখে এবং প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে তোলে।
ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা নিঃসন্দেহে এমবোলোর লাল কার্ড। আধুনিক ফুটবলে ভিএআরের ব্যবহার যে কেবল অফসাইড বা গোললাইন প্রযুক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্লে-অ্যাকটিংয়ের মতো ঘটনাও শনাক্ত করতে কার্যকর—এই ম্যাচ তার আরেকটি উদাহরণ হয়ে থাকল।
রেফারির সিদ্ধান্তে কেউ সন্তুষ্ট হলেও অনেক সমর্থক বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তুলেছেন। তবুও ফুটবলে ন্যায্য সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করতে ভিএআরের গুরুত্ব আবারও স্পষ্ট হয়েছে।
আর্জেন্টিনা ও সুইৎজারল্যান্ডের এই লড়াই ছিল উত্তেজনা, আক্রমণ, নাটকীয়তা এবং বিতর্কে ভরপুর। অ্যালিস্টারের গোলে এগিয়ে যাওয়া, এনদোয়ের সমতা ফেরানো এবং এরপরই এমবোলোর লাল কার্ড—সব মিলিয়ে ম্যাচটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে। শেষ পর্যন্ত ভিএআরের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আর্জেন্টিনার জন্য বড় সুবিধা এনে দেয়, আর সুইৎজারল্যান্ডকে ১০ জন নিয়ে কঠিন লড়াই চালিয়ে যেতে হয়। ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এটি ছিল রোমাঞ্চে ভরা একটি ম্যাচ, যেখানে প্রতিটি মুহূর্তেই বদলে গেছে খেলার গল্প।

