ফুটবল ইতিহাসে এমন কিছু নাম রয়েছে, যাদের প্রভাব কেবল মাঠের সাফল্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁদের উপস্থিতি ছুঁয়ে গেছে সমাজ, সংস্কৃতি এবং মানুষের আবেগকে। সেই তালিকার একেবারে শীর্ষে রয়েছেন ব্রাজিলের কিংবদন্তি ফুটবলার পেলে। তিনবারের বিশ্বকাপজয়ী এই মহাতারকা শুধু ব্রাজিলের গর্ব ছিলেন না, আফ্রিকার কোটি মানুষের কাছেও তিনি ছিলেন অনুপ্রেরণা, আশা এবং আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। তাঁর আফ্রিকা সফরগুলো আজও অসংখ্য গল্প, স্মৃতি ও কিংবদন্তির অংশ হয়ে রয়েছে।
পেলের আসল নাম ছিল এডসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো। তাঁর বাবা জোয়াও রামোস দো নাসিমেন্তো, যিনি ‘ডনডিনহো’ নামে পরিচিত ছিলেন, বিখ্যাত উদ্ভাবক টমাস এডিসনের নাম অনুসারে ছেলের নাম রাখেন। তবে নামের বানানে সামান্য পরিবর্তন এনে ‘এডিসন’-এর পরিবর্তে রাখা হয় ‘এডসন’। ছোটবেলায় পরিবারের সবাই তাঁকে ‘ডিকো’ নামে ডাকতেন। পরবর্তীতে পৃথিবী তাঁকে চিনেছে এক নামেই—পেলে।
অসাধারণ প্রতিভা, অনন্য গোল করার দক্ষতা এবং খেলাকে শিল্পে পরিণত করার ক্ষমতা খুব অল্প সময়েই তাঁকে বিশ্ব ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ে পরিণত করে।
১৯৫০-এর দশকের শেষ এবং ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে আফ্রিকার ইতিহাসে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। একের পর এক দেশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। নতুন রাষ্ট্র, নতুন পতাকা এবং নতুন স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলা এই দেশগুলোর কাছে পেলে ছিলেন আত্মবিশ্বাসের প্রতীক।
ব্রাজিলের ক্লাব সান্তোসের হয়ে কিংবা জাতীয় দলের সদস্য হিসেবে তিনি নিয়মিত আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে সফর করতেন। সদ্য স্বাধীন দেশগুলো তাঁকে আমন্ত্রণ জানাত প্রীতি ম্যাচ খেলতে। প্রতিবার তাঁর আগমনে বিমানবন্দর থেকে শুরু করে শহরের রাজপথ পর্যন্ত উৎসবের আবহ তৈরি হতো। হাজার হাজার মানুষ শুধু একবার চোখের দেখা পাওয়ার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতেন।
নিজের আত্মজীবনীতে পেলে উল্লেখ করেছিলেন, আফ্রিকায় বারবার সফর তাঁর জীবন ও চিন্তাভাবনায় গভীর পরিবর্তন এনেছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়; এটি মানুষের আশা, ঐক্য এবং আত্মপরিচয়ের শক্তিশালী মাধ্যম।
আফ্রিকার মানুষও তাঁকে শুধুমাত্র একজন ফুটবলার হিসেবে দেখেনি। তারা তাঁকে নিজেদের একজন হিসেবে গ্রহণ করেছিল। ফলে পেলে ও আফ্রিকার সম্পর্ক ধীরে ধীরে আবেগের এক অনন্য বন্ধনে পরিণত হয়।
১৯৬৫ সালে পেলের আলজেরিয়া সফরকে ঘিরে তৈরি হয় বহু আলোচিত ঘটনা। সে সময় দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অস্থির। রাজধানী আলজিয়ার্সে সামরিক ট্যাঙ্ক টহল দিচ্ছিল এবং একই সময়ে নির্মিত হচ্ছিল বিখ্যাত চলচ্চিত্র দ্য ব্যাটল অব আলজিয়ার্স।
তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আহমেদ বেন বেলা পেলের জন্য দুটি প্রীতি ম্যাচের আয়োজন করেছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হুয়ারি বুমেদিয়েন।
একটি জনপ্রিয় গল্পে বলা হয়, পেলের সফর নিয়ে প্রশাসন এতটাই ব্যস্ত ছিল যে সেই সুযোগেই অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। যদিও ইতিহাসবিদদের মতে, এই দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। তবুও ঘটনাটি আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত কিংবদন্তি হিসেবে রয়ে গেছে।
১৯৭০ সালের বিশ্বকাপে আফ্রিকার প্রথম প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেয় মরক্কো। এই অর্জন পেলের কাছে ছিল অত্যন্ত আনন্দের সংবাদ। তিনি প্রকাশ্যে মরক্কোকে অভিনন্দন জানান এবং আফ্রিকান ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
মরক্কোর কিংবদন্তি ফুটবলার লারবি বেন বারেক সম্পর্কে একটি বিখ্যাত উক্তি পেলের নামে প্রচলিত রয়েছে—“আমি যদি ফুটবলের রাজা হই, তবে বেন বারেক ফুটবলের ঈশ্বর।”
এই উক্তির সত্যতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এটি আজও ফুটবলপ্রেমীদের কাছে সমান জনপ্রিয়।
পেলের আফ্রিকা সফরের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত গল্পটি জড়িয়ে আছে নাইজেরিয়ার সঙ্গে।
১৯৬৯ সালে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ চলাকালীন একটি প্রদর্শনী ম্যাচ খেলতে যান পেলে। বহুল প্রচলিত কাহিনিতে বলা হয়, তাঁর ম্যাচ দেখার সুযোগ করে দিতে উভয় পক্ষ ৪৮ ঘণ্টার জন্য যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিল।
পরবর্তীতে পেলে নিজেই স্বীকার করেছিলেন, পুরো ঘটনাটি কতটা সত্য তা তিনি নিশ্চিত নন। তবে তিনি এটুকু বলেছিলেন যে তাঁর সফরকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। ফলে গল্পটি ইতিহাস ও লোককাহিনির মাঝামাঝি একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
১৯৭৬ সালে পেশাদার ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার পরও আফ্রিকার সঙ্গে পেলের সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়নি। বরং তিনি আরও বেশি সময় ব্যয় করেন তরুণ ফুটবলারদের উৎসাহিত করতে।
কেনিয়া, উগান্ডা, ঘানা, সেনেগাল, মিশর, মোজাম্বিকসহ বহু দেশে তিনি সফর করেন। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং নতুন প্রজন্মকে বড় স্বপ্ন দেখতে উৎসাহ দেন।
একটি কোমল পানীয় কোম্পানির আমন্ত্রণে কেনিয়া ও উগান্ডা সফরের সময় তিনি তরুণদের প্রশিক্ষণ দেন। কেনিয়ায় তাঁর ম্যাচ দেখার জন্য টিকিটের পরিবর্তে প্রাপ্তবয়স্কদের ছয়টি এবং শিশুদের তিনটি কোমল পানীয়ের বোতলের ঢাকনা জমা দিলেই প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হতো। এতেই বোঝা যায়, তাঁকে একবার দেখার জন্য মানুষের আগ্রহ কতটা ছিল।
মালির কিংবদন্তি ফুটবলার সালিফ কেইতা একবার বলেছিলেন, তাঁদের প্রজন্মের আফ্রিকানদের কাছে বিশ্বমঞ্চে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণার নাম ছিল পেলে, মহম্মদ আলি এবং ইউসেবিও।
ঘানার কিংবদন্তি মিডফিল্ডার আবেদি আয়েউ নিজের নামের সঙ্গে গর্বের সঙ্গে ‘পেলে’ যুক্ত করেন। এরপর থেকেই তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিত হন ‘আবেদি পেলে’ নামে।
এটি প্রমাণ করে, আফ্রিকার অসংখ্য ফুটবলারের কাছে পেলে শুধু একজন খেলোয়াড় ছিলেন না; তিনি ছিলেন আদর্শ।
পেলের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, একদিন কোনো আফ্রিকান দেশ অবশ্যই বিশ্বকাপ জিতবে। যদিও তাঁর জীবদ্দশায় সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি, তবুও আফ্রিকান ফুটবলের অগ্রগতিতে তিনি সবসময় আনন্দ প্রকাশ করেছেন।
২০২২ সালের বিশ্বকাপে মরক্কো ইতিহাস গড়ে সেমিফাইনালে পৌঁছালে পেলে সামাজিক মাধ্যমে লিখেছিলেন যে, আফ্রিকার এমন সাফল্য দেখে তিনি ভীষণ আনন্দিত। তাঁর এই বার্তা প্রমাণ করে, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আফ্রিকা তাঁর হৃদয়ের খুব কাছেই ছিল।
পেলের জীবন কেবল গোল, ট্রফি কিংবা বিশ্বকাপ জয়ের গল্প নয়। তিনি দেখিয়েছেন, খেলাধুলা মানুষের মধ্যে ভৌগোলিক, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক দূরত্ব কমিয়ে আনতে পারে।
ব্রাজিলের এই কিংবদন্তি ফুটবলার আফ্রিকার মানুষের কাছে ছিলেন আশা, আত্মবিশ্বাস এবং ঐক্যের প্রতীক। তাঁর সফরগুলো নতুন প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে এবং ফুটবলকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।
আজও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে পেলের নাম উচ্চারিত হয় গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে। তাই বলা যায়, পেলের গল্প যতটা ব্রাজিলের, ততটাই আফ্রিকারও। তিনি শুধু ফুটবলের রাজা ছিলেন না, একটি পুরো মহাদেশের হৃদয়ে স্থান করে নেওয়া এক চিরন্তন কিংবদন্তি।

