সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট...

Homeস্পোটস ওয়ার্ল্ডফুটবলসতীর্থদের ভালোবাসায় আর্জেন্টিনা জার্সিতে মেসির বিদায়

সতীর্থদের ভালোবাসায় আর্জেন্টিনা জার্সিতে মেসির বিদায়

৩-০ গোলের বেনিনের বিপক্ষে জয় শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়। এই ম্যাচের মাধ্যমে মেসির আর্জেন্টিনার জার্সিতে দীর্ঘ ও গৌরবময় আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের একটি অধ্যায়ের পর্দা নামল।

নিউজ বাংলা অনলাইন : একটি দীর্ঘ ও গৌরবময় পথচলার শেষ। শেষ বাঁশি বাজার পর আর ম্যাচের ফল নিয়ে কোনো উত্তেজনা ছিল না। বুয়েনস এইরেসের এস্তাদিও মনুমেন্তালে তখন সব আলো, সব আবেগ আর সব ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু একমাত্র লিওনেল মেসি। আর্জেন্টিনার সতীর্থরা ছুটে এসে ঘিরে ধরলেন প্রিয় অধিনায়ককে। কেউ জড়িয়ে ধরলেন, কেউ কাঁধে হাত রাখলেন। গ্যালারিজুড়ে বেজে উঠল করতালি আর ‘মেসি, মেসি’ ধ্বনি।

বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয় দিয়ে জাতীয় দলের জার্সিতে নিজের শেষ ম্যাচ খেললেন মেসি। মঙ্গলবার (৭ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত এই ম্যাচ শুধু আর্জেন্টিনার আরেকটি জয় নয়, বরং দেশটির ফুটবল ইতিহাসের একটি আবেগঘন অধ্যায়ের সমাপ্তি।

দীর্ঘ ২০ বছরের বেশি সময় ধরে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের সঙ্গে মেসির পথচলা। এই সময়ে এসেছে সাফল্য, ব্যর্থতা, হতাশা এবং অবশেষে বহু প্রতীক্ষিত গৌরব। জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা ও অলিম্পিক স্বর্ণপদক জিতেছেন তিনি।

বিদায়ী ম্যাচেও মেসি বুঝিয়ে দিয়েছেন, কেন তাকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বয়স ৩৯ ছুঁলেও মাঠে তার প্রভাব ছিল স্পষ্ট। গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়েও গোল করিয়েছেন তিনি।

ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনা ছিল আক্রমণাত্মক। তবে প্রথমার্ধে কোনো গোল না হওয়ায় অপেক্ষা বাড়তে থাকে সমর্থকদের।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে। ৪৮ মিনিটে মেসির নেওয়া কর্নার থেকে গোল করেন নিকোলাস ওতামেন্দি। মেসির নিখুঁত ডেলিভারিতে বল পেয়ে সুযোগ কাজে লাগান আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার।

এরপর ৬০ মিনিটে আবারও মেসির জাদু। তার দেওয়া পাস থেকে গোল করে আর্জেন্টিনার ব্যবধান ২-০ করেন নিকো পাজ। বিদায়ী ম্যাচে মেসির পারফরম্যান্স তখনই হয়ে ওঠে বিশেষ কিছু।

দুটি গোলের পেছনে সরাসরি অবদান রাখার পরও তখনো বাকি ছিল আরও একটি বিশেষ মুহূর্ত।

৬৮ মিনিটে আর্জেন্টিনা পেনাল্টি পায়। বল নিয়ে স্পটকিক নেওয়ার জন্য এগিয়ে আসেন মেসি। স্টেডিয়ামের হাজারো দর্শকের চোখ তখন তার দিকে।

৭১ মিনিটে সেই মুহূর্তকে স্মরণীয় করে তোলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। ঠান্ডা মাথায় পেনাল্টি থেকে বল জালে পাঠান তিনি। বিদায়ী ম্যাচেই জাতীয় দলের হয়ে নিজের শেষ গোলটি করেন মেসি।

এই গোলের মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ১২৬-এ। দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচেও গোল করে মাঠ ছাড়ার সুযোগ পেয়েছেন ফুটবলের এই মহাতারকা।

ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যপট বদলে যায়। খেলোয়াড়দের মধ্যে জয় উদযাপনের চেয়ে মেসিকে ঘিরে আবেগই হয়ে ওঠে বড় বিষয়।

সতীর্থরা একে একে ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরেন। দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধা, বন্ধু এবং অধিনায়ককে বিদায় জানান তারা। মাঠের এই মুহূর্তে বোঝা যাচ্ছিল, আর্জেন্টিনা দলের কাছে মেসির গুরুত্ব কেবল একজন ফুটবলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

প্রতিপক্ষ বেনিনের খেলোয়াড়রাও এগিয়ে এসে মেসিকে অভিনন্দন জানান। ম্যাচ কর্মকর্তারাও তাকে সম্মান জানান। বিদায়ের মুহূর্তে মেসির মুখেও ছিল আবেগের ছাপ।

মাঠের আবেগ শেষ হওয়ার পরও মেসির বিদায় উদযাপন থামেনি। স্টেডিয়ামে তার সম্মানে আয়োজন করা হয় বিশেষ ড্রোন শো।

রাতের আকাশে একসময় ফুটে ওঠে ‘Gracias Leo’ বার্তা। স্প্যানিশ এই কথার অর্থ ‘ধন্যবাদ লিও’। প্রিয় তারকাকে বিদায় জানাতে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের আবেগ তখন ছড়িয়ে পড়ে পুরো স্টেডিয়ামজুড়ে।

যে মানুষটি বছরের পর বছর আর্জেন্টিনার ফুটবলপ্রেমীদের স্বপ্ন দেখিয়েছেন, তার জন্য এমন বিদায় যেন ছিল স্বাভাবিকই।

জাতীয় দলের হয়ে মেসির ক্যারিয়ার শুধু ট্রফি দিয়ে বিচার করা সম্ভব নয়। ব্যক্তিগত অর্জনেও তিনি আর্জেন্টিনার ইতিহাসে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।

বিদায়ী ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার হয়ে তার পরিসংখ্যান দাঁড়িয়েছে ২০৭ ম্যাচে ১২৬ গোল ও ৭০ অ্যাসিস্ট। এই সংখ্যাগুলোই বলে দেয় জাতীয় দলের হয়ে কতটা ধারাবাহিক ছিলেন তিনি।

তবে মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বড় মঞ্চে তার সাফল্য। বহু বছরের অপেক্ষার পর তিনি আর্জেন্টিনাকে কোপা আমেরিকা জিতিয়েছেন। এরপর এসেছে বিশ্বকাপ জয়। অলিম্পিক স্বর্ণপদকও রয়েছে তার অর্জনের তালিকায়।

জাতীয় দলের হয়ে মেসির শুরুর সময়টা সবসময় সুখের ছিল না। একের পর এক ফাইনালে ব্যর্থতা তাকে কঠিন সমালোচনার মুখে ফেলেছিল। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, ক্লাব ফুটবলে এত সফল মেসি কেন আর্জেন্টিনার হয়ে বড় কোনো ট্রফি জিততে পারছেন না।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই গল্প বদলে যায়। মেসি ও তার সতীর্থরা একের পর এক সাফল্য এনে দেন আর্জেন্টিনাকে। কোপা আমেরিকা থেকে বিশ্বকাপ—সবচেয়ে বড় ট্রফিগুলোই শেষ পর্যন্ত তার হাতে ওঠে।

তাই জাতীয় দলের বিদায়ও তার জন্য হয়ে উঠেছে পূর্ণতার এক মুহূর্ত।

মেসির বিদায় শুধু একজন খেলোয়াড়ের অবসর বা জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘটনা নয়। এটি আর্জেন্টিনার ফুটবল সংস্কৃতির একটি আবেগঘন অধ্যায়ের সমাপ্তি।

যে শিশুরা মেসিকে দেখে ফুটবলের প্রেমে পড়েছে, তার গোল উদযাপন করে আনন্দে মেতেছে এবং কঠিন সময়েও প্রিয় তারকার পাশে থেকেছে, তাদের কাছে মেসির এই বিদায় নিঃসন্দেহে এক আবেগঘন মুহূর্ত।

এ কারণেই শেষ বাঁশির পর গ্যালারিতে ছিল না শুধু জয়ের উচ্ছ্বাস। ছিল কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসা আর স্মৃতির আবেগ।

একজন ফুটবলারের ক্যারিয়ার শেষ হয়। কিন্তু তার তৈরি করা ইতিহাস শেষ হয় না। মেসির ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই।

আর্জেন্টিনার জার্সিতে ২০৭ ম্যাচ, ১২৬ গোল ও ৭০ অ্যাসিস্টের পাশাপাশি বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা ও অলিম্পিক স্বর্ণপদক সব মিলিয়ে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার হয়ে থাকবে প্রজন্মের পর প্রজন্মের আলোচনার বিষয়।

৩-০ গোলের বেনিনের বিপক্ষে জয় শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়। এই ম্যাচের মাধ্যমে মেসির আর্জেন্টিনার জার্সিতে দীর্ঘ ও গৌরবময় আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের একটি অধ্যায়ের পর্দা নামল।

শেষ বাঁশি বাজার পর সতীর্থদের ভালোবাসা, প্রতিপক্ষের অভিনন্দন, গ্যালারির ‘মেসি, মেসি’ ধ্বনি এবং আকাশে ভেসে ওঠা ‘Gracias Leo’ সবকিছু মিলিয়ে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ রাতটি হয়ে থাকল আবেগে ভরা এক স্মরণীয় অধ্যায়।

ফুটবল মাঠে হয়তো আর আর্জেন্টিনার জার্সিতে দেখা যাবে না লিওনেল মেসিকে। তবে তার গোল, অ্যাসিস্ট, ট্রফি আর অসংখ্য স্মৃতি আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম মেসির কীর্তি মনে রাখবে এবং তার ফুটবলযাত্রা হয়ে থাকবে অনুপ্রেরণার এক অনন্য গল্প।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ