নিউজবাংলা ডেক্স, ৬ সেপ্টেম্বর : বাংলাদেশী পোষাক রফতানিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চলতি বছর বড় ধরনের সংকোচন দেখা দিয়েছে। জানুয়ারি থেকে জুলাই ২০২৬ এই সাত মাসে দেশটি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় পোশাক আমদানি করেছে ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ কম। অর্থমূল্যে আমদানির পরিমাণ নেমে এসেছে ৪১ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলারে। আগের বছরের একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক আমদানির পরিমাণ কমেছে ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতও চাপের মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি সাত মাসে কমেছে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। শুধু জুলাই মাসের হিসাব আরও উদ্বেগ তৈরি করেছে। ওই মাসে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি আগের বছরের জুলাইয়ের তুলনায় ১০ দশমিক ৭৩ শতাংশ কমেছে।
তবে কয়েকটি দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে এখনো ভালো আছে। বিশেষ করে চীন ও ভারতের রফতানিতে বড় পতন হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগও তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে উৎপাদন ব্যয়, শুল্কের চাপ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা তিনটি বিষয়ই সামলাতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেল বা ওটেক্সার তথ্য বিশ্লেষণ করে বাজারের এই চিত্র পাওয়া গেছে। তথ্য বিশ্লেষণ ও সংকলন করেছে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস (বিএভি)।
২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুলাই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ৪৫ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করেছিল। ২০২৬ সালের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪১ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি কমেছে প্রায় ৩ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার।
শুধু অর্থমূল্য নয়, আমদানির পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১৪ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন বর্গমিটার সমতুল্য পোশাক আমদানি করেছিল। চলতি বছরের একই সময়ে সেই পরিমাণ কমে হয়েছে প্রায় ১৩ দশমিক ২০ বিলিয়ন বর্গমিটার সমতুল্য।
অন্যদিকে আমদানি করা পোশাকের গড় একক মূল্য কিছুটা বেড়েছে। গত বছর যেখানে প্রতি ইউনিটের গড় মূল্য ছিল ৩ দশমিক ১৪ ডলার, চলতি বছর তা বেড়ে হয়েছে ৩ দশমিক ১৭ ডলার।
২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুলাই সময়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৪ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি করেছিল। চলতি বছরের একই সময়ে রফতানি কমে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলারে।
অর্থাৎ সাত মাসে বাংলাদেশের রফতানি কমেছে প্রায় ৩২৩ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলার বা ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ।
তবে একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানি যেখানে ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ কমেছে, সেখানে বাংলাদেশ থেকে আমদানি কমেছে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ সামগ্রিক বাজারের তুলনায় বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কিন্তু জুলাইয়ের তথ্য নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ওই মাসে বাংলাদেশের রফতানি কমেছে ১০ দশমিক ৭৩ শতাংশ। সাত মাসের গড় পতনের তুলনায় এটি অনেক বেশি।
তাই আগামী কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের ক্রয়াদেশ ও রফতানি কোন দিকে যায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগীদের মধ্যে চীন সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে।
জানুয়ারি-জুলাই সময়ে চীনের পোশাক রফতানি কমেছে ৩৪ দশমিক ২১ শতাংশ। গত বছর দেশটি যুক্তরাষ্ট্রে ৬ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি করেছিল। চলতি বছর তা নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ কমেছে প্রায় ২ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার।
ভারতের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি ভালো নয়। দেশটির পোশাক রফতানি কমেছে ২৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ। ৩ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার থেকে রফতানি নেমে এসেছে ২ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারে।
পাকিস্তানের রফতানি কমেছে ৫ দশমিক ৬০ শতাংশ। ১ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার থেকে তা কমে হয়েছে ১ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলার।
ভিয়েতনাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। দেশটির রফতানি কমেছে মাত্র ১ দশমিক ০৩ শতাংশ। ৯ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার থেকে রফতানি নেমে এসেছে ৯ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলারে।
অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়া এই সংকুচিত বাজারেও প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। ইন্দোনেশিয়ার রফতানি বেড়েছে ২ দশমিক ৭৬ শতাংশ। কম্বোডিয়ার বেড়েছে ১০ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চাহিদা কমলেও সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা কমেনি। বরং বাজারের অংশ দখলের লড়াই আরও তীব্র হয়েছে।
জানুয়ারি-জুলাই সময়ে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রফতানির পরিমাণ কমেছে ৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ। গত বছরের প্রায় ১ দশমিক ৬০ বিলিয়ন বর্গমিটার সমতুল্য রফতানি চলতি বছর কমে হয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন বর্গমিটার।
তবে প্রতিযোগী চীন ও ভারতের পতন এ ক্ষেত্রে আরও বেশি। চীনের পোশাক রফতানির পরিমাণ কমেছে ২৪ দশমিক ১৭ শতাংশ। ভারতের কমেছে ২৪ দশমিক ০২ শতাংশ।
অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়া পোশাক রফতানির পরিমাণ বাড়িয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার রফতানি পরিমাণ বেড়েছে ৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার ১২ দশমিক ০৫ শতাংশ।
এতে বাংলাদেশের সামনে একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। চীন ও ভারতের বাজার অংশের কিছুটা যদি অন্য সরবরাহকারী দেশের দিকে যায়, তাহলে বাংলাদেশ সেই অংশ দখল করতে পারে। তবে এজন্য মান, দাম ও সরবরাহ সক্ষমতায় প্রতিযোগীদের চেয়ে এগিয়ে থাকতে হবে।
বিএভির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জানুয়ারি-জুলাই সময়ে বাংলাদেশি পোশাকের গড় একক মূল্য কমেছে ২ দশমিক ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ রফতানির পরিমাণ কমার পাশাপাশি প্রতি ইউনিট পোশাক বিক্রি করেও আগের তুলনায় কম অর্থ পাওয়া গেছে।
প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যেও অনেকের গড় দাম কমেছে। চীনের পোশাকের গড় একক মূল্য কমেছে ১৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। ইন্দোনেশিয়ার ৬ দশমিক ১০ শতাংশ, পাকিস্তানের ৫ দশমিক ১২ শতাংশ এবং ভারতের ২ দশমিক ৩০ শতাংশ। কম্বোডিয়ার গড় দাম কমেছে ১ দশমিক ৪০ শতাংশ।
বাংলাদেশের দাম কমার হার এসব দেশের কয়েকটির তুলনায় কম হলেও বিষয়টি উদ্যোক্তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একই সময়ে দেশে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।
রফতানিকারকদের মতে, বাংলাদেশের পোশাকের গড় দাম কমার অন্যতম কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি শুল্কের চাপ।
বাড়তি শুল্কের পুরো বোঝা মার্কিন ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি। ক্রেতাদের সঙ্গে দর-কষাকষির মাধ্যমে শুল্কের একটি অংশ রফতানিকারকদের বহন করতে হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ক্রয়াদেশ ধরে রাখতে পোশাকের দাম কমিয়ে দিতে হয়েছে।
স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম জানিয়েছেন, রেসিপ্রোকাল ট্যারিফের একটি অংশ বাংলাদেশের রফতানিকারকদের বহন করতে হয়েছে। ফলে পোশাকের দাম কিছুটা কমাতে হয়েছে এবং এর প্রভাব পড়েছে গড় ইউনিট মূল্যে।
রফতানিকারকদের তথ্য অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে বাড়তি শুল্কের এক-তৃতীয়াংশ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রায় অর্ধেক পর্যন্ত রফতানিকারকদের বহন করতে হয়েছে।
এতে বাংলাদেশের পোশাক উদ্যোক্তারা দুই দিক থেকে চাপের মধ্যে পড়েছেন। একদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে বিদেশি ক্রেতারা কম দামে পণ্য চাইছেন।
দেশের পোশাক কারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট, বিকল্প জ্বালানির বাড়তি খরচ, শ্রম ব্যয় এবং কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ আগের তুলনায় বেশি।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের মতে, উৎপাদন খরচ বাড়লেও পোশাকের দাম বাড়ছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের কম দামে ক্রয়াদেশ নিতে হচ্ছে।
ব্যবসা ধরে রাখতে কেউ কেউ লোকসানেও অর্ডার নিচ্ছেন। দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতি চললে কারখানাগুলোর আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হতে পারে। এর ফলে কিছু কারখানা রুগ্ণ হয়ে পড়া কিংবা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
গ্যাসের সংকট এই চাপ আরও বাড়াচ্ছে। পর্যাপ্ত গ্যাস না পেয়ে অনেক কারখানাকে বেশি দামে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে।
তবে পোশাক খাতের জন্য পুরো পরিস্থিতি নেতিবাচক নয়। রফতানিকারকদের কেউ কেউ মনে করছেন, কয়েক মাস আগের তুলনায় শুল্কের চাপ ভাগাভাগির পরিস্থিতি কিছুটা সহজ হয়েছে।
শোভন ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, মার্কিন ক্রেতারা এখন আগের মতো বড় ছাড় দাবি করছেন না। ফলে সামনে তুলনামূলক ভালো দামে পোশাক বিক্রির সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে ক্রয়াদেশ বাড়ার ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে।
এটি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চীন ও ভারতের রফতানিতে বড় পতনের ফলে মার্কিন ক্রেতাদের কাছে বিকল্প সরবরাহকারীর প্রয়োজন বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ যদি এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দ্রুত ও কার্যকরভাবে সাড়া দিতে পারে, তাহলে হারানো রফতানি কিছুটা পুনরুদ্ধার করার পাশাপাশি নতুন ক্রয়াদেশও পাওয়া সম্ভব।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, বাংলাদেশের পোশাকের গড় দাম কমার পেছনে শুধু বাড়তি শুল্ক নয়, যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক বাজার সংকোচনও ভূমিকা রেখেছে।
তিনি মনে করেন, উৎপাদন ব্যয় বাড়ার সময় রফতানি মূল্য কমে যাওয়া উদ্যোক্তাদের জন্য বড় চাপ। তবে চীন ও ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের রফতানি কম কমেছে এটি ইতিবাচক দিক।
তার মতে, এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে উৎপাদন ব্যয় কমাতে হবে। পাশাপাশি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে এবং উচ্চমূল্যের পোশাক রফতানিতে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
শুধু কম দামে পোশাক বিক্রি করে দীর্ঘমেয়াদে বাজার ধরে রাখা সম্ভব নয়। মান, নতুন ডিজাইন, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং দ্রুত সরবরাহ এসব ক্ষেত্রেও বাংলাদেশকে প্রতিযোগীদের ছাড়িয়ে যেতে হবে।
সামগ্রিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি কমেছে। বাংলাদেশও সেই ধাক্কা সামলাতে গিয়ে রফতানি হারিয়েছে। তবে চীন ও ভারতের মতো বড় প্রতিযোগীদের তুলনায় বাংলাদেশের পতন কম।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে জুলাইয়ের ১০ দশমিক ৭৩ শতাংশ রফতানি পতন। একটি মাসের তথ্য দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা নির্ধারণ করা যায় না। তবে পরবর্তী মাসগুলোতেও যদি একই হারে রফতানি কমতে থাকে, তাহলে তা বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য বড় সতর্কবার্তা হবে।
অন্যদিকে চীন ও ভারতের বড় পতনের কারণে যে বাজারের জায়গা তৈরি হয়েছে, বাংলাদেশ তা কাজে লাগাতে পারলে পরিস্থিতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
সেজন্য এখন প্রয়োজন উৎপাদন ব্যয় কমানো, জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করা, উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদন বাড়ানো এবং নতুন পণ্যের বাজার তৈরি করা। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে হবে।




