সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট...

Homeবিশ্ব সংবাদইয়েমেনের তাইজে কেন তীব্র হচ্ছে লড়াই, বাড়ছে মানবিক সংকট

ইয়েমেনের তাইজে কেন তীব্র হচ্ছে লড়াই, বাড়ছে মানবিক সংকট

তাইজ ইয়েমেনের সবচেয়ে জনবহুল গভর্নরেটগুলোর একটি। এখানে প্রায় ৪৫ লাখ মানুষের বসবাস। অঞ্চলটির পশ্চিমে রয়েছে লোহিত সাগরের উপকূল। গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালিও এই অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত।

নিউজ বাংলা, আন্তর্জাতিক ডেক্স : ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তাইজ গভর্নরেটে আবারও তীব্র হয়ে উঠেছে সরকারি বাহিনী ও হুথিদের সংঘাত। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিতে দুই পক্ষের মধ্যে কয়েক দিন ধরে পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে। এতে শুধু সামরিক অবস্থানই নয়, সাধারণ মানুষের জীবন ও নিরাপত্তাও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার এবং ইরান-সমর্থিত হুথিদের দীর্ঘদিনের সংঘাতের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র তাইজ। সাম্প্রতিক সময়ে লড়াই আরও বাড়ার পেছনে রয়েছে লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকায় হুথিদের অগ্রগতি এবং সরকারের হারানো ভূখণ্ড পুনর্দখলের চেষ্টা।

ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের (পিএলসি) প্রধান রাশাদ আল-আলিমি রোববার হুথিদের কাছ থেকে হারানো এলাকা পুনরুদ্ধারে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে তাইজকে ঘিরে সামনে আরও বড় সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

তাইজ ইয়েমেনের সবচেয়ে জনবহুল গভর্নরেটগুলোর একটি। এখানে প্রায় ৪৫ লাখ মানুষের বসবাস। অঞ্চলটির পশ্চিমে রয়েছে লোহিত সাগরের উপকূল। গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালিও এই অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ বাব আল-মান্দেব দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে। ফলে এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য নয়, আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

সেপ্টেম্বরের শুরুতে হুথিরা দ্রুতগতিতে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের বড় একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এতে বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দেয়। একই সঙ্গে তাইজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য সরবরাহপথও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

তাইজের বড় একটি অংশ ইয়েমেনের পার্বত্য এলাকায় অবস্থিত। রাজধানী তাইজ সিটি পাহাড়ঘেরা একটি এলাকায় অবস্থিত এবং বর্তমানে সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। শহরটি ইয়েমেন সরকারের জন্য রাজনৈতিক ও সামরিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে তাইজকে অনেকটা ইয়েমেনের উত্তর ও দক্ষিণের সংযোগস্থল হিসেবে দেখা হয়। উত্তরের বড় অংশ হুথিদের নিয়ন্ত্রণে, আর দক্ষিণের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

তাইজে হুথিদের অগ্রগতি অব্যাহত থাকলে সরকারি বাহিনী দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর এডেনের সঙ্গে যোগাযোগ হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এডেনেই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকগুলো কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

গবেষক ও নীতি পরামর্শক ইব্রাহিম জালালের মতে, তাইজের গুরুত্ব সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক—সব দিক থেকেই ব্যাপক। তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তাইজকে চাপে রাখার মাধ্যমে হুথিরা লোহিত সাগরের উপকূলীয় নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করতে এবং লাহিজ, এডেনসহ দক্ষিণাঞ্চলে চাপ বাড়াতে চাইছে।

অন্যদিকে সরকারের কাছে তাইজের লড়াই শুধু একটি শহর বা কয়েকটি পাহাড়ের নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন নয়। এটি দেশের বিভিন্ন অংশের সঙ্গে যোগাযোগ এবং নিজেদের নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ড ধরে রাখার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

ইয়েমেনের রাজধানী সানা হুথিদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর ২০১৪ সাল থেকেই তাইজ যুদ্ধের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। পরবর্তী বছরগুলোতে শহরটি দীর্ঘ অবরোধ ও হামলার মুখে পড়ে।

২০১৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সরকারি বাহিনী হুথিদের একাধিক আক্রমণ প্রতিহত করে। দীর্ঘ সংঘাতে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

বর্তমান লড়াইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান জাবাল হান। তাইজ শহরের পশ্চিমে অবস্থিত এই পাহাড়টি সামরিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড়টির নিয়ন্ত্রণ যার হাতে থাকবে, সে শহরের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের প্রবেশপথ ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারবে।

তাইজের লড়াইয়ে এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই পরিষ্কারভাবে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করতে পারেনি। পর্যবেক্ষকদের অনেকে পরিস্থিতিকে অচলাবস্থা হিসেবে দেখছেন।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সরকারি বাহিনী তাইজের বিভিন্ন এলাকায় হুথিদের অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে হুথি যোদ্ধারা কামান, ট্যাংক, মর্টার ও রকেটের সহায়তায় শহরের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে।

শহরের বাসিন্দারা গোলাবর্ষণের মধ্যে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ধুবাব এলাকায় একটি আবাসিক স্থানে গোলা আঘাত হানলে মাত্র ১৪ দিন বয়সী এক শিশু নিহত হয়েছে। আরও কয়েকজন বেসামরিক মানুষ বিভিন্ন হামলায় আহত হয়েছেন।

শহরের বাইরে গ্রাম ও পাহাড়ি এলাকাতেও সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি অংশ হুথিদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নিজেদের উদ্যোগে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে বলে জানা গেছে।

তাইজের পশ্চিমে অবস্থিত জাবাল হান বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবস্থানগুলোর একটি। পাহাড়টির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে তাইজ শহরে প্রবেশকারী মানুষ ও পণ্য সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি করা সম্ভব।

এ কারণে সরকারি বাহিনী সেখানে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। হুথিরাও বারবার ওই এলাকায় হামলা চালানোর চেষ্টা করছে।

রোববার ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী দাবি করেছে, তারা তাইজের কয়েকটি এলাকায় অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং সামা এলাকায় একটি দুর্গের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। সামরিক কর্তৃপক্ষ আরও দাবি করেছে, জাবাল হান, হাজরানসহ পশ্চিম তাইজের বিভিন্ন এলাকায় হুথিদের হামলা প্রতিহত করা হয়েছে।

ইয়েমেনের সামরিক মুখপাত্র মাজেদ আল-নুজাইলি দাবি করেছেন, বিমান, ড্রোন, কামান, ক্ষেপণাস্ত্র ও স্নাইপার ব্যবহার করে একাধিক অভিযান চালানো হয়েছে। এতে বিপুলসংখ্যক হুথি যোদ্ধা হতাহত হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। তবে এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

তাইজে সরকারি বাহিনীর প্রতিরোধ শক্তিশালী হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে স্থানীয় উপজাতিগুলোর সঙ্গে তাদের সমন্বয়ের কথা উঠে এসেছে।

সেপ্টেম্বরের শুরুতে লোহিত সাগরের উপকূলে হুথিরা তুলনামূলক দ্রুত অগ্রসর হলেও তাইজে তারা বেশি প্রতিরোধের মুখে পড়েছে। স্থানীয় উপজাতিগুলোর সদস্যরা সরকারি বাহিনীর সঙ্গে মিলে বিভিন্ন এলাকায় প্রতিরোধে অংশ নিচ্ছেন বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।

সামা দুর্গ দখলের সাম্প্রতিক অভিযানে স্থানীয় উপজাতীয় যোদ্ধারাও অংশ নিয়েছেন বলে জানা গেছে। ফলে তাইজে হুথিদের জন্য সামরিক অগ্রগতি অর্জন আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষদের ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত সরকারি ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শুরুতে সংঘাত বাড়ার পর দেশটিতে প্রায় দুই লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তাদের বড় একটি অংশ তাইজ গভর্নরেটের বাসিন্দা।

শহরে প্রবেশ ও বের হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সড়ক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। এতে খাদ্য, পানি, ওষুধ এবং অন্যান্য জরুরি পণ্য পৌঁছানো বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা—ডব্লিউএইচও—দুটিই সতর্ক করেছে যে নতুন করে সংঘাত বাড়লে ইয়েমেনের দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরও বড় চাপের মুখে পড়তে পারে।

তাইজের মানবিক পরিস্থিতির সঙ্গে মোখা বন্দরের যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ। হুথিদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার আগে মোখা বন্দর তাইজ শহরের জন্য খাদ্য ও মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ ছিল।

যুদ্ধের কারণে সেই সরবরাহব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শহরের সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়ছে। সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইয়েমেন এমনিতেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটগুলোর একটি মোকাবিলা করছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির প্রায় অর্ধেক মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটের মধ্যে রয়েছে। প্রায় ৩৪ মিলিয়ন জনসংখ্যার দেশটিতে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ গুরুতর অপুষ্টির সমস্যায় ভুগছেন।

তাইজকে ঘিরে বর্তমান সংঘাত শুধু একটি গভর্নরেটের নিয়ন্ত্রণের লড়াই নয়। এর সঙ্গে ইয়েমেনের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ, লোহিত সাগরের উপকূল, বাব আল-মান্দেব প্রণালি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তার বিষয়ও জড়িত।

সরকার যদি তাইজে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারে, তাহলে দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং হুথিদের উপকূলীয় অগ্রযাত্রা ঠেকানো সহজ হতে পারে। বিপরীতে হুথিরা তাইজের ওপর চাপ বাড়াতে পারলে তারা দেশের দক্ষিণাঞ্চলেরদিকে নিজেদেরসামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেতে পারে।

তবে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সাধারণ মানুষের জন্য। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বাস্তুচ্যুতি, খাদ্যসংকট, চিকিৎসা ঘাটতি এবং জরুরি সহায়তার সংকট আরও বাড়তে পারে। তাইজের পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করছে দুই পক্ষের সামরিক অগ্রগতি এবং ইয়েমেনের বৃহত্তর রাজনৈতিক সমীকরণের ওপর।

তথ্য সূত্র: আল-জাজিরা

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ