নিউজ বাংলা অনলাইন : লিওনেল মেসির পায়ের জাদু দেখতে ফুটবলপ্রেমীদের নতুন কোনো কারণ খুঁজতে হয় না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় নিয়ে আবেগ বাড়লেও মাঠে নামলেই এখনও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিচ্ছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। এবার মেজর লিগ সকারে কলম্বাস ক্রুর বিপক্ষে এমন এক ফ্রিকিক গোল করলেন মেসি, যা নিয়ে আবারও আলোচনায় ফুটবল বিশ্ব।
সোমবারের ম্যাচে বক্সের ডান প্রান্তের একেবারে কঠিন জায়গা থেকে সরাসরি ফ্রিকিক নেন মেসি। সাধারণত এমন অবস্থান থেকে সতীর্থদের উদ্দেশে ক্রস বাড়ানো হয়। কিন্তু মেসি বেছে নিলেন সরাসরি গোলের চেষ্টা। তাঁর বাঁকানো শট গোলরক্ষককে ফাঁকি দিয়ে দূরের পোস্ট ঘেঁষে জালে জড়ায়। মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ ফুটবল মহলে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর দুর্দান্ত গোলের আলোচনা।
তবে মেসির অসাধারণ গোলও শেষ পর্যন্ত ইন্টার মায়ামিকে হার থেকে বাঁচাতে পারেনি। রক্ষণভাগের ভুল এবং শেষ দিকে প্রতিপক্ষের কার্যকর আক্রমণে কলম্বাস ক্রুর কাছে পরাজিত হয়েছে মায়ামি।
ম্যাচের ৩৩ মিনিটে ফ্রিকিকটি পায় ইন্টার মায়ামি। জায়গাটি ছিল বক্সের ডানদিকে, কর্নার ফ্ল্যাগের খুব কাছাকাছি। সাধারণ পরিস্থিতিতে সেখান থেকে গোলের জন্য সরাসরি শট নেওয়া বেশ কঠিন।
কিন্তু মেসির জন্য কঠিন জায়গাই যেন বিশেষ কিছু করে দেখানোর সুযোগ। তিনি বলের নিচে নিখুঁতভাবে পা রাখেন। এরপর বলটি বাতাসে উঠে বাঁক নিতে নিতে দূরের পোস্টের দিকে এগিয়ে যায়। গোলরক্ষক শেষ মুহূর্তে বলের গতিপথ বুঝতে পারলেও সেটি ঠেকানোর মতো অবস্থানে ছিলেন না।
বল জালে জড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মায়ামি সমতায় ফেরে। আর মেসির গোলটি হয়ে ওঠে ম্যাচের অন্যতম আলোচিত মুহূর্ত।
কলম্বাস ক্রুর বিপক্ষে করা এই গোলটি মেসির ফ্রিকিক দক্ষতার আরও একটি উদাহরণ। ইন্টার মায়ামির হয়ে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে সরাসরি ফ্রিকিক থেকে এটি তাঁর ১২তম গোল। চলতি মৌসুমেও ফ্রিকিক থেকে এটি তাঁর ষষ্ঠ গোল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মেজর লিগ সকারে চলতি বছরে মেসির গোলসংখ্যাও বেড়ে দাঁড়ায় ২১-এ। ফলে ব্যক্তিগত গোলের তালিকাতেও তিনি শীর্ষস্থানীয়দের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ধরে রেখেছেন।
মেসির ক্যারিয়ারে ফ্রিকিক গোল অবশ্য নতুন কোনো বিষয় নয়। বার্সেলোনা থেকে শুরু করে প্যারিস সাঁ জার্মেই, ইন্টার মায়ামি এবং আর্জেন্টিনা বিভিন্ন দলের হয়ে তাঁর অসংখ্য ফ্রিকিক গোল ফুটবলপ্রেমীদের মনে জায়গা করে নিয়েছে।
মেসির বর্তমান সময়ের প্রতিটি ম্যাচ ঘিরেই আলাদা আবেগ তৈরি হচ্ছে। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় যত এগিয়ে আসছে, ভক্তদের আগ্রহও তত বাড়ছে।
বেনিনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার আবেগঘন ম্যাচের আগে মেজর লিগ সকারে এটিই ছিল মেসির শেষ ম্যাচ। ফলে ম্যাচটি ঘিরে তাঁর ভক্তদের আগ্রহ ছিল স্বাভাবিকভাবেই বেশি।
সেই ম্যাচে দুর্দান্ত ফ্রিকিক গোল করে মেসি যেন আরও একবার মনে করিয়ে দিলেন, সেট-পিসে তাঁর দক্ষতা এখনও কতটা কার্যকর।
মেসির গোলের আগে অবশ্য ম্যাচে এগিয়ে ছিল কলম্বাস ক্রু। পেনাল্টি থেকে দলকে এগিয়ে দেন জ্যাকসন মার্টিনেজ।
এরপর মেসির দুর্দান্ত ফ্রিকিকে সমতায় ফেরে ইন্টার মায়ামি। ম্যাচের পরিস্থিতি তখন এমন ছিল যে, দুই দলই হয়তো পয়েন্ট ভাগাভাগি করে মাঠ ছাড়বে।
কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের চিত্র পাল্টে যায়। মায়ামির বদলি খেলোয়াড় সান্তিয়াগো মোরালেস লাল কার্ড দেখলে দলটি একজন খেলোয়াড় কম নিয়ে খেলতে বাধ্য হয়।
এরপর কলম্বাস আক্রমণের সুযোগ আরও বাড়িয়ে দেয়।
ম্যাচের শেষ দিকে কলম্বাসের একটি শট সামলাতে গিয়ে সমস্যায় পড়েন ইন্টার মায়ামির গোলরক্ষক রোকো রিওস নোভো। তাঁর হাত ফসকে বল সামনে চলে যায়।
সেই সুযোগ কাজে লাগাতে কোনো ভুল করেননি থিয়ারে। সামনে পাওয়া সুযোগকে গোলে পরিণত করে কলম্বাসকে আবার এগিয়ে দেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত সেই গোলই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে। মেসির অসাধারণ ফ্রিকিকের পরও জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে কলম্বাস ক্রু।
এই হারের ফলে ইস্টার্ন কনফারেন্সের পয়েন্ট তালিকায় ইন্টার মায়ামি তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা নিউ ইংল্যান্ড রেভল্যুশনের সঙ্গে তাদের পয়েন্টের ব্যবধান ছিল না।
অন্যদিকে শীর্ষে থাকা ন্যাশভিল এসসি মায়ামির চেয়ে ১৪ পয়েন্ট এগিয়ে ছিল। কলম্বাস ক্রুও এই জয়ের মাধ্যমে টেবিলের নিচের দিক থেকে কিছুটা ওপরে উঠে প্লে-অফের আশা ধরে রাখে।
ফলে মেসির দুর্দান্ত ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের পরও দলীয় ফলাফল মায়ামির জন্য হতাশার হয়ে থাকে।
মেসির এই গোলের পর তাঁর পেশাদার ক্যারিয়ারে সরাসরি ফ্রিকিক থেকে গোলের সংখ্যা ৭৬-এ পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফ্রিকিক গোলের সর্বকালের তালিকায় শীর্ষস্থান নিয়ে অবশ্য পরিসংখ্যানভেদে কিছু পার্থক্য রয়েছে। ব্রাজিলের সাবেক মিডফিল্ডার মার্সেলিনহো কারিওকার নাম এই আলোচনায় প্রায়ই উঠে আসে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী মার্সেলিনহোর ফ্রিকিক গোল ৭৮টি। আবার তিনি নিজে তাঁর গোলসংখ্যা ৮৬ বলে দাবি করেছেন। ফলে কোন হিসাব গ্রহণ করা হচ্ছে, তার ওপর মেসির সঙ্গে ব্যবধানও পরিবর্তিত হয়।
এ কারণেই ফ্রিকিকের সর্বকালের রেকর্ড নিয়ে আলোচনা করতে গেলে বিভিন্ন পরিসংখ্যানের উৎস ও হিসাবের পদ্ধতি বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
সরাসরি ফ্রিকিক গোলের ইতিহাসে ব্রাজিলের ফুটবলারদের দীর্ঘদিনের প্রভাব রয়েছে। মার্সেলিনহো ছাড়াও জার রসা পিন্টো, রবার্তো দিনামিতে এবং জুনিনহোর মতো খেলোয়াড়দের নাম এই তালিকায় আলোচিত হয়।
ব্রাজিলের বাইরে সার্বিয়ার প্রয়াত তারকা সিনিশা মিহাইলোভিচও ফ্রিকিক বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিশ্ব ফুটবলে বিশেষ পরিচিতি পেয়েছেন।
তবে আধুনিক ফুটবলে মেসি যে ফ্রিকিককে নিজের অন্যতম শক্তিশালী অস্ত্রে পরিণত করেছেন, তা নিয়ে খুব বেশি বিতর্ক নেই। গোলরক্ষকের অবস্থান, দেয়ালের উচ্চতা, দূরত্ব এবং শটের বাঁক সবকিছু হিসাব করে তাঁর নেওয়া ফ্রিকিক বহুবার ম্যাচের মোড় ঘুরিয়েছে।
মেসির ফ্রিকিকের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো বলের গতিপথে নিয়ন্ত্রণ। তিনি শুধু শক্তি দিয়ে শট নেন না। বরং বলের গতি, বাঁক এবং উচ্চতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করার চেষ্টা করেন।
বিশেষ করে বক্সের আশপাশ থেকে নেওয়া ফ্রিকিকে তাঁর শট প্রায়ই গোলরক্ষকের জন্য কঠিন হয়ে ওঠে। অনেক সময় বলটি দেয়ালের ওপর দিয়ে উঠে শেষ মুহূর্তে নিচে নেমে আসে। আবার কখনও বল বাইরে যাচ্ছে মনে হলেও হঠাৎ বাঁক নিয়ে পোস্টের ভেতরে ঢুকে পড়ে।
কলম্বাসের বিপক্ষের গোলটিও ছিল এমনই একটি মুহূর্ত। জায়গাটি ছিল অস্বাভাবিক কঠিন, কিন্তু মেসির নিখুঁত শট সেটিকে গোলের সুযোগে পরিণত করে।



