স্টাফ রিপোর্টার, নিউজবাংলা ডেক্স ,১৯ সেপ্টেম্বর : জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের ধারাবাহিক লংমার্চ ও অন্যান্য রাজনৈতিক কর্মসূচি পর্যবেক্ষণ করছে বিএনপি। বিরোধী জোটের এসব কর্মসূচিকে রাজনৈতিক অধিকার হিসেবে দেখলেও এর উদ্দেশ্য, কার্যকারিতা এবং জনসম্পৃক্ততার মাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা।
৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে প্রথম লংমার্চ করে ১১ দলীয় ঐক্য। ওই কর্মসূচিতে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট নিরসন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নসহ বিভিন্ন দাবি সামনে আনা হয়।
এর ধারাবাহিকতায় আজ ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর অভিমুখে দ্বিতীয় বড় লংমার্চ করছে জোটটি। জোটের পক্ষ থেকে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য বিভাগীয় শহরকেন্দ্রিক কর্মসূচির কথাও জানানো হয়েছে।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বিরোধী দলের কর্মসূচিগুলো তাঁরা পর্যবেক্ষণে রাখছেন। তবে এখন পর্যন্ত এসব কর্মসূচিকে বড় ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করে পাল্টা কর্মসূচি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি দলটি।
বিএনপির নেতাদের যুক্তি, সরকারে থেকে বিরোধী দলের কর্মসূচির জবাবে একই ধরনের পাল্টা কর্মসূচি আয়োজনের চেয়ে জনসাধারণের সমস্যাগুলোর সমাধানে প্রশাসনিক ও নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তবে দলের ভেতরে এমন মতও রয়েছে যে, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, দ্রব্যমূল্য ও আইনশৃঙ্খলার মতো সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত বিষয়ে বিরোধীরা যদি ধারাবাহিকভাবে মাঠে থাকে, তাহলে বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
৫ সেপ্টেম্বরের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চে ১১ দলীয় ঐক্য ছয় দফা দাবি সামনে আনে। এর মধ্যে ছিল গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা।
কর্মসূচির আগে জোটের পক্ষ থেকে আরও বিস্তৃত দাবির কথাও জানানো হয়েছিল। আগস্টে ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে কয়েকটি বিভাগীয় শহর অভিমুখে লংমার্চ এবং পরবর্তী সময়ে বড় সমাবেশের পরিকল্পনার কথা আসে।
৫ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচিতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের পথে নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও ফেনীসহ বিভিন্ন স্থানে পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। পরে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে কর্মসূচির সমাপ্তি ঘটে।
আজকের ঢাকা-রংপুর লংমার্চে ১১ দলীয় ঐক্য আরও কয়েকটি দাবিকে সামনে এনেছে। প্রথম লংমার্চের পর এটিকে জোটটির দ্বিতীয় বড় রাজপথের কর্মসূচি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি এসব লংমার্চের মাধ্যমে জোটটি বিভিন্ন অঞ্চলে নিজেদের সাংগঠনিক উপস্থিতি জানান দিতে চাইছে। বিশেষ করে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, দ্রব্যমূল্য ও আইনশৃঙ্খলার মতো জনসম্পৃক্ত বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে তারা সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরির চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে বিএনপি মনে করছে, এসব দাবির সমাধান রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির মাধ্যমে নয়; বরং সরকারের প্রশাসনিক ও নীতিগত উদ্যোগের মাধ্যমেই করতে হবে।
বিরোধী দলের লংমার্চের জবাবে এখন পর্যন্ত বিএনপি কোনো পাল্টা লংমার্চ বা একই ধরনের রাজপথের কর্মসূচি ঘোষণা করেনি। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন কর্মসূচির প্রয়োজন তৈরি হয়নি।
বিএনপির অবস্থান হলো, রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি পালনের অধিকার রয়েছে। তবে কোনো কর্মসূচির কারণে জনদুর্ভোগ তৈরি হলে কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে সমস্যা হলে সরকার পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।
এই অবস্থান থেকে বিএনপি আপাতত সংসদ, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং সরকারের কার্যক্রমের মাধ্যমে বিরোধীদের বক্তব্যের জবাব দেওয়ার পথেই রয়েছে।
১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চের উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিরোধী জোট বলছে, জনসাধারণের সমস্যা তুলে ধরতেই তারা মাঠে নেমেছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা প্রশ্ন তুলছেন, দীর্ঘ গাড়িবহর নিয়ে লংমার্চ আয়োজন করলে বিদ্যুৎ, গ্যাস বা জ্বালানি সংকটের মতো বাস্তব সমস্যার সমাধান কতটা সম্ভব।
৫ সেপ্টেম্বর লংমার্চের উদ্বোধনী কর্মসূচিতে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য তাঁরা রাজপথে নেমেছেন এবং কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
অন্যদিকে সরকারপক্ষের বক্তব্যে মূলত সংকট মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ এবং লংমার্চের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে এসেছে।
এখানে রাজনৈতিক বিতর্কের মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজপথের কর্মসূচি কতটা জনমত তৈরি করতে পারে এবং সেই কর্মসূচির দাবিগুলো বাস্তব নীতিগত পরিবর্তনে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে।
বিএনপি দীর্ঘ সময় বিরোধী দলে থাকার পর বর্তমানে সরকার পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে। ফলে দলটির রাজনৈতিক অগ্রাধিকারেও পরিবর্তন এসেছে বলে দলের ভেতরে আলোচনা রয়েছে।
বিরোধী অবস্থানে থাকাকালে রাজপথের আন্দোলন ছিল বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখন সরকারের দায়িত্বে থাকায় প্রশাসন পরিচালনা, অর্থনীতি, জনসেবা এবং বিভিন্ন সংকট মোকাবিলা দলের সামনে বড় দায়িত্ব হিসেবে এসেছে।
এই বাস্তবতায় বিরোধীদের কর্মসূচির জবাবে একই ধরনের কর্মসূচি আয়োজনের বদলে সরকার পরিচালনার দিকেই বেশি মনোযোগ দেওয়ার কথা বলছেন দলের নেতারা।
তবে জনসম্পৃক্ত ইস্যুতে বিরোধীরা নিয়মিত কর্মসূচি চালিয়ে গেলে সরকারের অবস্থান জনগণের কাছে আরও পরিষ্কারভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন হতে পারে এমন মতও দলের ভেতরে রয়েছে।
বিরোধী দলগুলো যখন ধারাবাহিকভাবে মাঠের কর্মসূচি পালন করছে, তখন বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে দলটি মাঠপর্যায়ে কতটা সক্রিয় হয়, সেদিকেও নজর রয়েছে।
কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকেই বর্তমানে সরকার, সংসদ ও প্রশাসনিক দায়িত্বে যুক্ত। ফলে আগের মতো নিয়মিত দলীয় কর্মসূচিতে তাঁদের উপস্থিতি সব জায়গায় দেখা যাচ্ছে না।
অন্যদিকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের কেউ কেউ নিজেদের উদ্যোগে এলাকায় সক্রিয় হচ্ছেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে কেন্দ্রীয়ভাবে দলীয় প্রস্তুতি আরও দৃশ্যমান হলে বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থানও স্পষ্ট হতে পারে।
১১ দলীয় ঐক্য সেপ্টেম্বর-অক্টোবরজুড়ে বিভিন্ন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ৫ সেপ্টেম্বরের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের পর ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা-রংপুর কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ফলে রাজপথে বিরোধী জোটের উপস্থিতি আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
এ অবস্থায় বিএনপির জন্য দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। একদিকে বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা, অন্যদিকে বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি, দ্রব্যমূল্য ও আইনশৃঙ্খলার মতো জনসম্পৃক্ত বিষয়ে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নিশ্চিত করা।
রাজনীতিতে লংমার্চসহ বিভিন্ন কর্মসূচি গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের একটি মাধ্যম। তবে এসব কর্মসূচির প্রকৃত রাজনৈতিক প্রভাব নির্ভর করবে জনসম্পৃক্ততা, ধারাবাহিকতা, দাবিগুলোর বাস্তবতা এবং সরকারের প্রতিক্রিয়ার ওপর। বর্তমানে বিএনপি পাল্টা কর্মসূচির পথে না গিয়ে সরকার পরিচালনা ও রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমেই পরিস্থিতি মোকাবিলার কৌশল অনুসরণ করছে।



