সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট...

Homeজাতীয়নতুন পে-স্কেলে ইনক্রিমেন্ট কমছে উচ্চতর গ্রেডে, বাড়ছে নিচের গ্রেডে

নতুন পে-স্কেলে ইনক্রিমেন্ট কমছে উচ্চতর গ্রেডে, বাড়ছে নিচের গ্রেডে

ক্যাপ্টেন ও সমতুল্য এবং তার নিচের পদে ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট। মেজর পদে ৪ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট। লেফটেন্যান্ট কর্নেল ও কর্নেল পদে ৩.৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সমপদে ২.৭৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট।

নিজস্ব প্রতিবেদক,১৬ সেপ্টেম্বর, নিউজবাংলা : সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন জাতীয় পে-স্কেল-২০২৬ অনুযায়ী, নিচের গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পেলেও উচ্চতর গ্রেডে এই হার ধাপে ধাপে কমবে। একই সঙ্গে বাড়ি ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, মোবাইল ভাতা ও উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার নিয়মেও পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামোয় বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল থাকছে। তবে গ্রেডভেদে মূল বেতন ও বিভিন্ন ভাতার পরিমাণ পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে। সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে এই পরিবর্তনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

বর্তমানে সব গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবী মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পান। নতুন কাঠামোয় এই অভিন্ন হার আর থাকছে না। নিচের গ্রেডে ৫ শতাংশ বহাল থাকলেও উচ্চতর গ্রেডে ইনক্রিমেন্টের হার কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত হার অনুযায়ী: গ্রেড, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, গ্রেড-২০ থেকে গ্রেড-৬ পর্যন্ত ৫ শতাংশ। গ্রেড-৫, ৪ শতাংশ। গ্রেড-৪ ও গ্রেড-৩, ৩.৫ শতাংশ। গ্রেড-২, ২.৭৫ শতাংশ।

অর্থাৎ, গ্রেড-২০ থেকে গ্রেড-৬ পর্যন্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট পাবেন। কিন্তু গ্রেড-৫ থেকে শুরু করে উচ্চতর গ্রেডে এই হার কমতে থাকবে।

উদাহরণ হিসেবে, কারও মূল বেতন ২০ হাজার টাকা হলে ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টে বছরে ১ হাজার টাকা বেতন বাড়বে। অন্যদিকে মূল বেতন ১ লাখ টাকা হলে ২.৭৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টে বৃদ্ধি হবে ২ হাজার ৭৫০ টাকা। তাই শতাংশের হার কমলেও উচ্চতর গ্রেডে মূল বেতন বেশি হওয়ায় টাকার অঙ্কে বেতন বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য হতে পারে।

নতুন জাতীয় বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর বেতন ও ইনক্রিমেন্ট ব্যবস্থায়ও পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত কাঠামোয়: ক্যাপ্টেন ও সমতুল্য এবং তার নিচের পদে ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট। মেজর পদে ৪ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট। লেফটেন্যান্ট কর্নেল ও কর্নেল পদে ৩.৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সমপদে ২.৭৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট।

এর ফলে বেসামরিক সরকারি চাকরিজীবীদের পাশাপাশি সামরিক কর্মকর্তাদের বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও গ্রেড ও পদভেদে পার্থক্য তৈরি হবে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তৈরি সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, নতুন কাঠামোয় বিদ্যমান ২০টি গ্রেড রাখা হচ্ছে। তবে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতনে বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো অনুযায়ী, গ্রেড-২০-এর প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হতে পারে। অন্যদিকে গ্রেড-১-এর নির্ধারিত বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।

এই পরিবর্তনের মাধ্যমে সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে নতুন বেতন কাঠামো একবারে পুরোপুরি কার্যকর না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ২০২৪ সালে চালু করা বিশেষ প্রণোদনাও নতুন পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতিল করার প্রস্তাব রয়েছে।

এই প্রণোদনা প্রথমে ৫ শতাংশ ছিল। পরে তা বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়। নতুন বেতন কাঠামো চালু হলে আলাদা এই প্রণোদনা না রেখে মূল বেতন ও অন্যান্য ভাতার মাধ্যমে সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

তবে প্রণোদনা বাতিলের ফলে প্রত্যেক কর্মচারীর হাতে পাওয়া মোট বেতন কীভাবে পরিবর্তিত হবে, তা নির্ভর করবে নতুন মূল বেতন, ভাতা এবং বাস্তবায়নের নিয়মের ওপর।

নতুন পে-স্কেলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হচ্ছে বাড়ি ভাতা। বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীরা কর্মস্থল ও গ্রেডভেদে মূল বেতনের নির্দিষ্ট শতাংশ বাড়ি ভাড়া পান। নতুন কাঠামোয় এই হার কিছুটা কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

বর্তমানে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় গ্রেডভেদে মূল বেতনের ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়। নতুন প্রস্তাবে এই হার ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে।

বর্তমানে অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও সাভারে মূল বেতনের ৪০ থেকে ৫৫ শতাংশ বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়। নতুন কাঠামোয় তা ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ হতে পারে।

সিটি করপোরেশন ও সাভারের বাইরে বর্তমানে ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়। নতুন প্রস্তাবে এই হার ২৫ থেকে ৪৫ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে।

বাড়ি ভাতার শতাংশ কমলেও মূল বেতন দ্বিগুণ বা তারও বেশি বাড়ানোর প্রস্তাব থাকায় ভাতার টাকার অঙ্ক বাড়তে পারে। অর্থাৎ, মূল বেতন বৃদ্ধির মাধ্যমে ভাতার হার কমানোর প্রভাব কিছুটা সামঞ্জস্য করার চেষ্টা করা হয়েছে।

সরকারি চাকরিজীবীদের উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার নিয়মেও পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে একই গ্রেডে ১০ বছর চাকরি করলে পদোন্নতি না হলেও উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

নতুন কাঠামোয় এই সময় কমিয়ে ৮ বছর করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে পদোন্নতি না পাওয়া কর্মচারীরা আগের তুলনায় দ্রুত উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা পেতে পারেন।

তবে দ্বিতীয়বার উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রে একই গ্রেডে আরও ৬ বছর চাকরি করার শর্ত থাকছে। পদোন্নতিযোগ্য পদে কর্মরতরা পদোন্নতি না পেলে চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ দুইবার এই সুবিধা পাবেন।

অন্যদিকে যেসব পদে পদোন্নতির সুযোগ নেই এবং ‘ব্লকড পদ’ হিসেবে ঘোষিত, সেসব পদে কর্মরতরা চাকরিজীবনে তিনবার উচ্চতর গ্রেড সুবিধা পেতে পারেন। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথমবার ৮ বছর, দ্বিতীয়বার আরও ৬ বছর এবং তৃতীয়বার পরবর্তী ৮ বছর চাকরির পর এই সুবিধা দেওয়ার বিধান রাখা হচ্ছে।

নতুন বেতন কাঠামোয় চিকিৎসা ভাতায়ও পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে সব সরকারি কর্মচারী মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পান।

নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী: বয়স, মাসিক চিকিৎসা ভাতা ৫০ বছর পর্যন্ত ৩ হাজার টাকা । ৫০ বছরের বেশি থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত ৪ হাজার টাকা।

পেনশনভোগী ৬০ থেকে ৭০ বছর ৫ হাজার টাকা, পেনশনভোগী ৭০ বছরের বেশি ৬ হাজার টাকা।

বয়সভেদে চিকিৎসা ভাতা নির্ধারণের ফলে চাকরিজীবী ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের চিকিৎসা ব্যয়ের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

বর্তমানে প্রথম থেকে পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তারা মোবাইল বিলের সুবিধা পান। নতুন কাঠামোয় প্রথমবারের মতো সব স্তরের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য মোবাইল ভাতার ব্যবস্থা করার প্রস্তাব রয়েছে।

প্রস্তাবিত মোবাইল ভাতা: প্রথম থেকে পঞ্চম গ্রেড: মাসে ৫০০ টাকা। ষষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেড: মাসে ১৫০ টাকা।

এতে নিচের গ্রেডের কর্মচারীরাও মোবাইল যোগাযোগের জন্য নির্দিষ্ট আর্থিক সুবিধা পাবেন।

জীবনযাত্রার ব্যয় ও পরিবহণ খরচ বাড়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কয়েকটি ছোট ভাতাও বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

ভাতার নাম বর্তমান প্রস্তাবিত যাতায়াত ভাতা ৩০০ টাকা ,৬০০ টাকা। টিফিন ভাতা ২০০ টাকা ৫০০ টাকা। ধোলাই ভাতা ১০০ টাকা ৩০০ টাকা।

তবে বাংলা নববর্ষ ভাতা ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। পাহাড়ি ভাতা এবং হাওড়, দ্বীপ ও চরভাতা মূল বেতনের ২০ শতাংশই থাকবে। তবে এসব ভাতার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হতে পারে।

এ ছাড়া ঝুঁকি ভাতাসহ বিভিন্ন বিশেষ ভাতার পরিমাণ বিদ্যমান হারের তুলনায় ২০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে প্রেষণ ভাতার কাঠামোও পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে শিক্ষা সহায়ক ভাতা, কার্যভার ভাতা, আপ্যায়ন ভাতা, কুক অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যালাউন্স, উৎসব ভাতা এবং শ্রান্তি-বিনোদন ভাতার বিদ্যমান হার বহাল রাখার সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে।

নতুন জাতীয় বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কাঠামোও পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, নন-কমব্যাট্যান্ট বা এনরোল্ড এবং সমতুল্য পদে প্রারম্ভিক মূল বেতন ২১ হাজার টাকা হতে পারে। মেজর জেনারেল ও সমপদে নির্ধারিত বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সমপদকে গ্রেড-২ এবং কর্নেল ও সমপদকে গ্রেড-৩-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া বিমানবাহিনীর ফ্লাইং পে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। কমান্ড, স্টাফ, টিচিং, কোয়ালিফিকেশন, ডিস্টার্বেন্স ও বিশেষজ্ঞ বেতন ১০ শতাংশ করে বাড়তে পারে। দক্ষতা, নিযুক্তি, প্যারাসুট, কমান্ডো বা স্নাইপার, স্কুবা ডাইভিং ও সদাচরণ বেতন ১৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। জরিপ ভাতা বাড়তে পারে ৩০ শতাংশ।

সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের জন্য বিদ্যমান ৮১ ধরনের ভাতাও পর্যালোচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রতিরক্ষা ভাতা, কিট ভাতা, ডেঞ্জার মানি, দোভাষী ভাতা ও শিক্ষকতা ভাতাসহ বেশিরভাগ ভাতা বিদ্যমান পরিমাণের ওপর ১০ শতাংশ বাড়তে পারে।

তবে বাড়ি ভাড়া, যাতায়াত, কার্যভার, আপ্যায়ন, টিফিন, ধোলাই, পাহাড়ি, উৎসব, শ্রান্তি ও বিনোদন, নববর্ষ, শিক্ষা সহায়ক, চিকিৎসা এবং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে প্রেষণ ভাতা নতুন জাতীয় বেতন স্কেলের অনুরূপ করার প্রস্তাব রয়েছে।

প্রস্তাবিত জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এর কার্যকারিতা ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ধরা হয়েছে। তবে মূল বেতন ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকারের হিসাবে, নতুন কাঠামোয় প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হতে পারেন।

প্রসঙ্গত, ৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য যৌথ বাহিনী নির্দেশাবলি-২০২৬ অনুমোদনের কথাও জানানো হয়েছে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ