সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট...

Homeবিশ্ব সংবাদফ্রান্সে স্কুল বিক্ষোভে সংঘর্ষ, বিস্ফোরণে কিশোরের হাত বিচ্ছিন্ন

ফ্রান্সে স্কুল বিক্ষোভে সংঘর্ষ, বিস্ফোরণে কিশোরের হাত বিচ্ছিন্ন

উত্তর ফ্রান্সের লঁস শহরে বিক্ষোভের সময় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর গুরুতর আহত হয়। পুলিশ সূত্রে প্রাথমিকভাবে বলা হয়েছিল, কিশোরটি একটি স্টান গ্রেনেড তুলে নিয়েছিল।

নিউজ বাংলা, আন্তর্জাতিক ডেক্স : ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ঘিরে পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। শিক্ষক সংকট, শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য এবং পর্যাপ্ত শিক্ষা সুবিধার দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন বিভিন্ন শহরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। এরই মধ্যে উত্তরাঞ্চলীয় শহর লঁসে বিস্ফোরণে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর গুরুতর আহত হয়েছে এবং তার একটি হাত বিচ্ছিন্ন হয়েছে।

ঘটনাটি ফ্রান্সে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেকেই অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় পুলিশের ব্যবহৃত কৌশল নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

সোমবার উত্তর ফ্রান্সের লঁস শহরে বিক্ষোভের সময় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর গুরুতর আহত হয়। পুলিশ সূত্রে প্রাথমিকভাবে বলা হয়েছিল, কিশোরটি একটি স্টান গ্রেনেড তুলে নিয়েছিল।

তবে এই তথ্য এখনো নিশ্চিত নয়। স্থানীয় সরকারি কৌঁসুলির কার্যালয় জানিয়েছে, তদন্তকারীরা এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি ডিভাইসটি কিশোর নিজে তুলেছিল কি না, নাকি সেটি কোনোভাবে তার ওপর এসে পড়েছিল।

ঘটনার তদন্তে ফ্রান্সের পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্ত বিভাগকে যুক্ত করা হয়েছে। শিক্ষার্থী বিক্ষোভ চলাকালে গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনাগুলো নিয়ে এরই মধ্যে ছয়টি তদন্ত পরিচালনা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

ফ্রান্সের শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে ঘটনাটিকে ‘মানবিকভাবে অত্যন্ত মর্মান্তিক’ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে ঘটনার কারণ বা পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

মন্ত্রী জানিয়েছেন, বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৯০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন স্কুলে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।

জেফ্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভের সময় ২৪টি স্কুলে আগুন দেওয়া হয়েছে অথবা ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ৭৮ জন শিক্ষক ও শিক্ষা বিভাগের কর্মীও আহত হয়েছেন।

লঁসের বিস্ফোরণের পর ফ্রান্সে বিক্ষোভ দমনে পুলিশের কৌশল নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ফ্রান্স পুলিশের শক্তি প্রয়োগের মাত্রা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে।

সংগঠনটির অভিযোগ, আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেক অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থী পুলিশের লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস এবং রাবার বুলেট ব্যবহারের শিকার হয়েছে। তাদের মতে, ১৮ বছরের কম বয়সী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পদক্ষেপ অবশ্যই পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, ফ্রান্সের আইন ও মানবাধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে পুলিশের কার্যক্রম সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন।

অন্যদিকে ফরাসি সরকারের মুখপাত্র মাউদ ব্রেজোঁ বলেছেন, সরকারের প্রধান লক্ষ্য এখন পরিস্থিতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে ফ্রান্সের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার ৫৮৯টি স্কুল কোনো না কোনোভাবে বিক্ষোভের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

এর আগে শুক্রবার এই সংখ্যা ছিল ৭৩৫টি। ফ্রান্সে মোট প্রায় ৩ হাজার ৭০০টি উচ্চবিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে কয়েক শ স্কুল পুরোপুরি অথবা আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আগেই আশঙ্কা করা হয়েছিল।

শিক্ষামন্ত্রী জেফ্রে রোববার জানিয়েছিলেন, সোমবার প্রায় ৫০০ স্কুল পুরোপুরি অথবা আংশিকভাবে বন্ধ থাকতে পারে।

ফ্রান্সের বর্তমান স্কুল বিক্ষোভের সূত্রপাত গত মাসের শেষ দিকে প্যারিসের একটি উপশহরের উচ্চবিদ্যালয় থেকে। শিক্ষক সংকট এবং পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকার অভিযোগে শিক্ষার্থীরা সেখানে প্রতিবাদ শুরু করে।

পরে আন্দোলন দ্রুত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

প্যারিসে আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের কয়েকজন জানিয়েছেন, তাদের অনেক সময় গণিত ও ইংরেজির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের শিক্ষক পাওয়া যায় না। ফলে নিয়মিত ক্লাস ব্যাহত হয় এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় সমস্যা তৈরি হয়।

শিক্ষার্থীরা শুধু নিজেদের স্কুলের সমস্যার কথা বলছে না। তুলনামূলকভাবে দরিদ্র অঞ্চল এবং ফ্রান্সের বিদেশি ভূখণ্ডগুলোর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশের কথাও তারা জানিয়েছে।

তাদের মূল দাবি হলো, দেশের সব তরুণের জন্য সমান শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা।

বিক্ষোভের মধ্যে প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে। প্যারিসের ১৩তম জেলার লাইসি ভকেলিন স্কুলে হামলার ঘটনা ঘটে।

স্কুলটির প্রধান ক্যারোল জেরবিব জানিয়েছেন, মুখ ঢাকা ও হুড পরা একটি দল অত্যন্ত দ্রুত স্কুলে হামলা চালায়। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে স্কুল খালি করে দিতে হয় এবং ক্লাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

পুলিশ ও দমকল বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। স্কুল কর্তৃপক্ষের মতে, পুরো হামলার ঘটনা প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট স্থায়ী হয়েছিল।

এ ধরনের ঘটনায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

সোমবার ফ্রান্সের একাধিক শহরে শিক্ষার্থী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। লিল শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ছবি সম্প্রচার করেছে দেশটির বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তুলুজ শহরেও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের খবর পাওয়া গেছে। মধ্য প্যারিসে একটি স্কুলে ঢোকার চেষ্টা এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।

এসব ঘটনার কারণে আন্দোলনের মূল দাবি শিক্ষাব্যবস্থার সংকট ও শিক্ষক স্বল্পতা ছাপিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিই এখন আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে।

২৮ সেপ্টেম্বর থেকে দেশজুড়ে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে প্রায় ৫ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বড় অংশই কিশোর বা তরুণ।

বিক্ষোভে শিক্ষার্থী ছাড়াও শিক্ষক ও সাধারণ মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও কয়েক কোটি ইউরোতে পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে সরকার একদিকে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের মূল দাবিগুলো নিয়েও চাপের মুখে পড়েছে।

চলমান পরিস্থিতির মধ্যেই শিক্ষার্থী ইউনিয়নগুলো মঙ্গলবার দেশজুড়ে নতুন করে বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে। ফলে ফ্রান্সের স্কুলগুলোতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

লঁসে ১৫ বছর বয়সী কিশোরের গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা আন্দোলনকে নতুন একটি মাত্রা দিয়েছে। তদন্তে বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ এবং ঘটনাস্থলে পুলিশের ব্যবহৃত সরঞ্জামের ভূমিকা স্পষ্ট হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে সবাই।

একদিকে শিক্ষার্থীরা সমান শিক্ষার সুযোগ, শিক্ষক সংকটের সমাধান এবং উন্নত শিক্ষা পরিবেশের দাবি জানাচ্ছে। অন্যদিকে সরকার বলছে, সহিংসতা ও ভাঙচুর কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

তথ্য সূত্র: আল জাজিরা

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ