নিউজ বাংলা, আন্তর্জাতিক ডেক্স : তানজানিয়ায় প্রায় ২৪ কোটি বছর আগের ট্রায়াসিক যুগের একটি নতুন প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর সন্ধান পেয়েছেন আন্তর্জাতিক একদল গবেষক। নতুন প্রজাতিটির নাম দেওয়া হয়েছে Dinodontosaurus isiyavamanda। গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার ডাইনোসরের উৎপত্তি ও বিবর্তনের সময়কাল সম্পর্কে প্রচলিত ধারণায় পরিবর্তন আনতে পারে।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ব্রিস্টলের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে Journal of Vertebrate Palaeontology সাময়িকীতে।
গবেষকরা জানিয়েছেন, নতুন প্রজাতিটি ডাইকাইনোডন্ট নামে পরিচিত এক ধরনের তৃণভোজী সিন্যাপসিড প্রাণীর অন্তর্ভুক্ত। সিন্যাপসিডরা স্তন্যপায়ী প্রাণীদের বিবর্তনীয় ধারার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং ডাইনোসরের উত্থানের আগের সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের ব্যাপক বিস্তার ছিল।
প্রায় ছয় দশক আগে, ১৯৬৩ সালে ব্রিটিশ একটি অভিযানের সময় তৎকালীন তানজানিয়ার একটি এলাকায় বিপুল পরিমাণ সিন্যাপসিড জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হয়। পরে এসব জীবাশ্ম যুক্তরাজ্যের লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে সংরক্ষণ করা হয়।
তবে সংগ্রহে থাকা অনেক জীবাশ্মের বিস্তারিত গবেষণা হয়নি। ফলে কিছু নমুনার পরিচয় এবং সেগুলো থেকে প্রায় ২৪ কোটি বছর আগের পরিবেশ সম্পর্কে কী তথ্য পাওয়া যায়, তা দীর্ঘদিন অস্পষ্ট ছিল।
নতুন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা জাদুঘরে সংরক্ষিত একটি অসম্পূর্ণ কঙ্কালের পাশাপাশি সম্প্রতি পাওয়া একটি খণ্ডিত খুলির পরীক্ষা করেন। শারীরিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণের পর তারা দেখতে পান, নমুনাগুলো Dinodontosaurus গণের অন্তর্ভুক্ত।
এর আগে এই গণের জীবাশ্ম শুধু দক্ষিণ আমেরিকায় পাওয়া গেছে বলে জানা ছিল। ফলে তানজানিয়ায় একই গণের প্রাণীর সন্ধান গবেষকদের কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিস্তারিত শারীরিক বিশ্লেষণের পর গবেষকরা নিশ্চিত হন, তানজানিয়ার জীবাশ্মগুলো Dinodontosaurus গণের আগে অজানা একটি প্রজাতির। এর নাম রাখা হয়েছে Dinodontosaurus isiyavamanda।
নামটির একটি অংশ তানজানিয়ার ওই অঞ্চলে বসবাসকারী ওয়ামান্ডা জনগোষ্ঠীর ভূমির প্রতি সম্মান জানিয়ে রাখা হয়েছে।
গবেষকদের মতে, নতুন প্রজাতিটির আবিষ্কার শুধু প্রাণীটির পরিচয় নির্ধারণেই গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং তানজানিয়ার জীবাশ্মভূমির বয়স নির্ধারণের ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিচ্ছে।
যে ভূতাত্ত্বিক স্তর থেকে Dinodontosaurus isiyavamanda-এর জীবাশ্ম পাওয়া গেছে, একই স্তর থেকে এমন কিছু জীবাশ্মও পাওয়া গেছে, যেগুলোকে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন সম্ভাব্য ডাইনোসর জীবাশ্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এর মধ্যে রয়েছে Nyasasaurus এবং সাইলেসর Asilisaurus।
এতদিন ধারণা করা হতো, তানজানিয়ার এসব শিলাস্তর দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্য ট্রায়াসিক যুগের শিলাস্তরের সমবয়সী। কিন্তু নতুন গবেষণা সেই ধারণাকে পুনর্বিবেচনার সুযোগ তৈরি করেছে।
গবেষকরা বলছেন, Dinodontosaurus এখন তানজানিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকা দুই অঞ্চলেই পাওয়া গেছে। ফলে দুই অঞ্চলের জীবাশ্মবাহী শিলাস্তরের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র তৈরি হয়েছে।
দক্ষিণ আমেরিকায় সম্প্রতি করা রেডিওমেট্রিক বয়স নির্ধারণের ফলাফলে দেখা গেছে, ওই অঞ্চলের প্রাথমিক ডাইনোসর-সম্পর্কিত শিলাস্তরগুলো দক্ষিণ আফ্রিকার সংশ্লিষ্ট শিলাস্তরের তুলনায় প্রায় ১ কোটি বছর কম বয়সী হতে পারে।
এই তথ্য তানজানিয়ার জীবাশ্ম নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
গবেষকদের মতে, তানজানিয়ার ট্রায়াসিক শিলাস্তরগুলোকে এখন আর পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো সম্ভাব্য ডাইনোসর জীবাশ্ম সংরক্ষণকারী স্তর হিসেবে আগের মতো বিবেচনা করা যাবে না। এর ফলে ডাইনোসর কখন এবং কোথায় প্রথম বিবর্তিত হয়েছিল, সেই প্রশ্নের উত্তরও নতুন করে খুঁজতে হবে।
গবেষণার প্রধান লেখক ও ইউনিভার্সিটি অব ব্রিস্টলের স্কুল অব আর্থ সায়েন্সেসের পিএইচডি গবেষক হ্যাডি জর্জ বলেন, তানজানিয়ায় পাওয়া Dinodontosaurus গণের নমুনাটি দক্ষিণ আমেরিকার বাইরে এই গণের প্রথম নিশ্চিত রেকর্ড।
তার মতে, এই আবিষ্কার তানজানিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার জীবাশ্মবাহী শিলাস্তরের বয়সের মধ্যে সম্পর্ক স্পষ্ট করেছে। একই সঙ্গে তানজানিয়ায় পাওয়া সবচেয়ে প্রাচীন ডাইনোসর-প্রার্থী জীবাশ্মগুলোর বয়স সম্ভবত দক্ষিণ আমেরিকার নমুনার চেয়ে বেশি পুরোনো নয় বলেও ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।
এই আবিষ্কারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রায় তিন দশকের একটি গবেষণার গল্প। গবেষণার সহলেখক ও জীবাশ্মবিদ নাইজেল লারকিন ১৯৯৪ সালে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে মাস্টার্সের গবেষণার সময় তানজানিয়ার ওই ডাইকাইনোডন্ট কঙ্কালটি পরীক্ষা করেছিলেন।
তখনই তার ধারণা হয়েছিল, এটি বিজ্ঞানের জন্য নতুন একটি প্রজাতি হতে পারে। তবে গবেষণাটি প্রকাশের জন্য প্রস্তুত করতে প্রায় ৩০ বছর সময় লাগে।
এর মধ্যে জীবাশ্ম বিশ্লেষণের প্রযুক্তিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে মাইক্রো-সিটি স্ক্যানিং প্রযুক্তির মাধ্যমে এখন জীবাশ্মের অভ্যন্তরীণ গঠন আরও বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে।
লারকিনের মতে, আধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কারণে কয়েক দশক আগে পরীক্ষা করা একটি জীবাশ্ম থেকেও এখন অনেক বেশি তথ্য পাওয়া সম্ভব।
লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের কিউরেটর মাইক ডে বলেন, তানজানিয়ার এই জীবাশ্মটি ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে জাদুঘরের সংগ্রহে ছিল। এত বছর পর এর পরিচয় স্পষ্ট হওয়া গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা।
তিনি বলেন, Dinodontosaurus দক্ষিণ আমেরিকা ও পূর্ব আফ্রিকা দুই অঞ্চলে বসবাস করত এমন তথ্য প্রায় ২৪ কোটি বছর আগের পৃথিবীর একটি চিত্র তুলে ধরে।
গবেষকদের মতে, এই ঘটনা প্রমাণ করে জাদুঘরে সংরক্ষিত পুরোনো জীবাশ্মও নতুন গবেষণার মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। নতুন জীবাশ্ম আবিষ্কারের পাশাপাশি পুরোনো সংগ্রহ পুনরায় পরীক্ষা করাও তাই জীবাশ্মবিজ্ঞানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তানজানিয়ায় পাওয়া Dinodontosaurus–এর আরও অনেক জীবাশ্ম এখনো বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করা হয়নি। বিশেষ করে প্রাণীটির শরীরের অন্যান্য কঙ্কাল অংশ নিয়ে গবেষণা বাকি রয়েছে।
পরবর্তী পর্যায়ে এসব জীবাশ্ম দক্ষিণ আমেরিকায় পাওয়া একই গণের নমুনার সঙ্গে তুলনা করা হবে। পাশাপাশি প্রাণীটির শারীরিক গঠন, চলাফেরা এবং বাস্তুতন্ত্রে ভূমিকা নিয়েও গবেষণা চালানো হবে।
ট্রায়াসিক যুগে একই পরিবেশে একাধিক বড় আকারের তৃণভোজী প্রাণী কীভাবে পাশাপাশি বসবাস করত, সেই বিষয়টিও গবেষকদের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে।
গবেষকদের আশা, এসব গবেষণা শেষ হলে প্রায় ২৪ কোটি বছর আগের পৃথিবীর প্রাণীজগৎ এবং ডাইনোসরের উত্থানের আগের বাস্তুতন্ত্র সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে ডাইনোসরের উৎপত্তি ও বিবর্তনের সময়কাল নিয়েও নতুন তথ্য সামনে আসতে পারে


