জেলা প্রতিনিধি,নিউজ বাংলা : ফেনীতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন ও সেচব্যবস্থার উন্নয়নে বড় ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলার মুহুরী ও কহুয়া নদী ঘিরে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ সুবিধা বাড়াতে ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্পের উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
‘মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্প পুনর্বাসন (১ম পর্যায়)’ নামের এই প্রকল্পের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের পানি নিষ্কাশন সমস্যা, নদীভাঙন ও বন্যার ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি কৃষিকাজে সেচ সুবিধা বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
দুপুরে ফেনীর পরশুরাম উপজেলার উপকণ্ঠে খোয়াইঘাট মুহুরী ব্রিজ এলাকায় প্রকল্পটির ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। পরে তিনি সেখানে একটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেন।
প্রকল্পটির আওতায় ফেনীর বন্যাপ্রবণ এলাকাগুলোর পানি ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করতে বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামোগত কাজ করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে পুরোনো বাঁধ পুনর্বাসন, নদীতীর সংরক্ষণ, নদী ও জলাধার পুনঃখনন এবং সেচ অবকাঠামো সংস্কার।
প্রকল্পের আওতায় মোট ৬৭ দশমিক ৯২ কিলোমিটার বাঁধ পুনর্বাসন করা হবে। একই সঙ্গে ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণের কাজ করা হবে। নদী ও জলাধারের ৮৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার অংশ পুনঃখননের পরিকল্পনাও রয়েছে।
এ ছাড়া ২৭টি সেচ অবকাঠামো পুনর্বাসন এবং ৭৭টি ইনলেট নির্মাণ করা হবে। এসব কাজ বাস্তবায়িত হলে বর্ষা মৌসুমে পানি নিয়ন্ত্রণ এবং শুষ্ক মৌসুমে কৃষিজমিতে সেচের সুযোগ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
ফেনীর এই বড় পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্পটি গত ১৬ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পায়। সভায় প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকা।
প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে মুহুরী ও কহুয়া নদীসংলগ্ন এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করার পাশাপাশি বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে প্রয়োজনীয় সেচ অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পটির সম্ভাব্য বাস্তবায়নকাল ২০৩০ সাল পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ আগামী কয়েক বছরে ধাপে ধাপে এর বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রথম পর্যায়ের কাজের পাশাপাশি পরবর্তী পর্যায়েও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে মুহুরী ও কহুয়া নদীতে নতুন বাঁধ নির্মাণের বিষয়টি রয়েছে।
এ ছাড়া সিলোনিয়া নদীতেও বাঁধ নির্মাণ, নদী খনন এবং সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ফেনীর বিভিন্ন নদী ও জলাধারকে ঘিরে পানি ব্যবস্থাপনা আরও সমন্বিত করার সুযোগ তৈরি হবে।
বিশেষ করে বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ক্ষেত্রে নদী ও বাঁধের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ফেনীর বিভিন্ন এলাকা বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকির মুখে পড়ে। ফলে বসতবাড়ি, কৃষিজমি, সড়ক এবং স্থানীয় অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা দুর্বল হলে বন্যার পানি দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থাকতে পারে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের বাঁধ পুনর্বাসন, নদী পুনঃখনন ও পানি প্রবাহ ব্যবস্থাপনার কাজ এসব সমস্যার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি সেচ অবকাঠামো উন্নত হলে কৃষকেরা প্রয়োজন অনুযায়ী পানি ব্যবহারের সুযোগ পাবেন।
ফলে প্রকল্পটি শুধু বন্যা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; কৃষি, পানি নিষ্কাশন এবং স্থানীয় অবকাঠামোর সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
ছাগলনাইয়া , পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলার সরকারি ভবনগুলোতে মোট ৯৬২.৫ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ বসানো হয়েছে।
এর মধ্যে ছাগলনাইয়া উপজেলায় ৪১৫ কিলোওয়াট, পরশুরামে ২৯৮ কিলোওয়াট এবং ফুলগাজীতে ২৪৯ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচিতে সামাজিক সুরক্ষা ও কৃষকদের সহায়তা সংক্রান্ত কর্মসূচিও রয়েছে। ফুলগাজী সরকারি পাইলট হাইস্কুল মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বিতরণ করার কথা রয়েছে।
ফুলগাজীতে মোট ৫১০ জন ফ্যামিলি কার্ড পাবেন। একই সঙ্গে পুরো ফেনী জেলায় ৭ হাজার ৬৪৩ জন কৃষক কার্ড পাওয়ার কথা রয়েছে।
এ ছাড়া ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যেও সম্মানী প্রদান করা হবে। ফুলগাজীতে মোট ২৩৮ জন ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম ও পুরোহিতকে এই সম্মানী দেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী সকালে ঢাকার গুলশানে তাঁর বাসভবন থেকে সড়কপথে পরশুরামের উদ্দেশে রওনা হন। পরে দুপুরের দিকে তিনি ফেনীতে পৌঁছান।
মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের কাজ ২০৩০ সালের মধ্যে শেষ করার সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী বাঁধ পুনর্বাসন, নদীতীর সংরক্ষণ, নদী ও জলাধার পুনঃখনন এবং সেচ অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।



