রংপুরে কামাল কাছনা মাছুয়াপাড়ার একটি তিনতলা ভবন থেকে রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক শ্রী গনপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে এলাকাবাসীর কাছ থেকে সংবাদ পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশ চারজনের লাশ উদ্ধার করে।
একই পরিবারের ৪ জন নিহত হওয়ার ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ ও সিআইডি কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন, কয়েক দিন আগেই ওই পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে কি কারনে এদেরকে হত্যা করা হয়েছে বা ও ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, তা এখনো সঠিক ভাবে বলা যাচ্ছেনা।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহতরা হলেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী (১৪) এবং মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৮)।
শনিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে স্থানীয় বাসিন্দারা ওই বাড়ি থেকে দুর্গন্ধ পেতে শুরু করেন। বিষয়টি পুলিশকে জানানো হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। পরে ভবনের ভেতর থেকে চারজনের লাশ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, নিহত পরিবারের সদস্যদের লাশ বাড়ির বিভিন্ন স্থানে পাওয়া যায়। গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী ও মেয়ের লাশ ছাদের সিঁড়ির কাছে পাওয়া যায়। পরিবারের এক সদস্যের লাশ বিছানার নিচে এবং গণপতি চক্রবর্তীর লাশ ছাদের এক প্রান্তে পাওয়া যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
বাড়ির ভেতরে প্রবেশের পর পচন ধরার তীব্র দুর্গন্ধ পাওয়া যায়। বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। মেঝেতে কাপড়চোপড় ও গয়নার বাক্স পড়ে থাকতে দেখা যায়। এসব আলামত দেখে ঘটনাটি নিয়ে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে।
কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম নাজমুল কাদের জানিয়েছেন, ধারণা করা হচ্ছে, দুই থেকে তিন দিন আগে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে।
তবে সিআইডির কর্মকর্তাদের ধারণা, ঘটনাটি আরও কয়েক দিন আগে ঘটতে পারে। রংপুর সিআইডির দায়িত্বরত কর্মকর্তা ইনচার্জ সুমিত চৌধুরী ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর সাংবাদিকদের জানান, প্রাথমিকভাবে তাঁদের কাছে ঘটনাটি ডাকাতির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে হচ্ছে।
তিনি জানান, ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, বাড়ির বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। টাকা-পয়সা রাখা হতে পারে এমন জায়গাগুলো ভাঙচুর করা হয়েছে। ফলে ডাকাতির উদ্দেশ্যে দুর্বৃত্তরা বাড়িতে ঢুকে পরিবারের সদস্যদের হত্যা করেছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
সিআইডির কর্মকর্তা সুমিত চৌধুরী জানান, প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে নিহতদের গলায় রশি বা গামছা ব্যবহারের আলামত থাকতে পারে বলে মনে হয়েছে। তবে মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত করতে ময়নাতদন্ত ও অন্যান্য ফরেনসিক পরীক্ষা প্রয়োজন।
এ ঘটনায় পুলিশের পাশাপাশি সিআইডির সদস্যরা ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করছেন। ভবনের ভেতরে থাকা জিনিসপত্র, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয় এবং ভাঙচুরের চিহ্ন সবকিছু গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
চারজনের লাশ উদ্ধারের পর ভবনটি ঘিরে রেখেছে পুলিশ ও সিআইডি। ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান করছেন। তারা বাড়ির বিভিন্ন অংশ পরিদর্শন করে সম্ভাব্য আলামত সংগ্রহ করছেন।
রংপুর সিআইডি পুলিশের পরিদর্শক আবু হাসান কবির চারজনের লাশ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো ভবনে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল। পরিবারের সদস্যরা ভবনের দ্বিতীয় তলায় বসবাস করতেন।
একই পরিবারের চারজনের মৃত্যু কীভাবে হলো, তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে। পুলিশ ডাকাতির সম্ভাবনাকে সামনে রেখে তদন্ত শুরু করলেও অন্য কোনো কারণ আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বাড়ির জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা, গয়নার বাক্স পড়ে থাকা এবং বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন পাওয়ার বিষয়গুলো তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে নিহতদের সঙ্গে কারও পূর্বশত্রুতা ছিল কি না, সাম্প্রতিক সময়ে তাঁদের সঙ্গে কারও বিরোধ হয়েছিল কি না এবং ঘটনার আগে বাড়িতে কারা যাতায়াত করেছিলেন—এসব বিষয়ও তদন্তে গুরুত্ব পেতে পারে।
চারজনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্ত করা হবে। ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে মৃত্যুর সময়, মৃত্যুর কারণ এবং ঘটনাস্থলে পাওয়া বিভিন্ন আলামত সম্পর্কে আরও পরিষ্কার তথ্য পাওয়ার আশা করছে তদন্তকারী সংস্থা।
পুলিশ বলছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘটনাটিকে চূড়ান্তভাবে কোনো নির্দিষ্ট কারণের সঙ্গে যুক্ত করা যাচ্ছে না। বর্তমানে ঘটনাস্থলের আলামত সংগ্রহ, পরিবারের সদস্যদের পরিচিত জনদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং সম্ভাব্য সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করার কাজ চলছে।


