বাংলাদেশের গণমাধ্যম জগতে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শীর্ষস্থানীয় দৈনিক জনকণ্ঠ কার্যালয়ে একদল অব্যাহতিপ্রাপ্ত কর্মচারীর উগ্র আচরণ এবং তথাকথিত ‘মব সংস্কৃতি’ পুরো প্রতিষ্ঠানকে কার্যত অচল করে দিয়েছে। এই পরিস্থিতির কারণে শুধু অফিস কার্যক্রমই বন্ধ হয়নি, বরং সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন সেই সাধারণ কর্মীরা, যারা তাদের ন্যায্য পাওনা পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন।
ঘটনাটি ঘটে গত ০৫ জুলাই, রবিবার। সেদিন একদল উগ্র আন্দোলনকারী জনকণ্ঠ কার্যালয়ের মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেয়। এর ফলে ভেতরে কর্মরত নারীসহ প্রায় ৭০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় অন্ধকার ভবনের ভেতরে, তীব্র গরমে এবং দমবন্ধ করা পরিবেশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকা কর্মীদের জন্য এটি ছিল এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা।
এই ধরনের আচরণ শুধু আইনবিরুদ্ধ নয়, মানবিকতারও পরিপন্থী। কিছু উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে পড়লে পুরো অফিসজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কর্মীরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় ভুগতে থাকেন।
জনকণ্ঠ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা অব্যাহতিপ্রাপ্ত কর্মচারীদের পাওনা দ্রুত পরিশোধের জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করছিল। ইতোমধ্যে ২৬ জন কর্মচারীর সম্পূর্ণ পাওনা পরিশোধ করা হয়েছে। আরও প্রায় ৪০ জনের পাওনা দেওয়ার সব প্রস্তুতিও সম্পন্ন ছিল।
কিন্তু এই অপ্রত্যাশিত মব পরিস্থিতির কারণে পুরো প্রক্রিয়াটি থমকে যায়। অডিট ও অ্যাকাউন্টস বিভাগের কর্মীরা এতটাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন যে, তারা অফিসে আসতেই ভয় পাচ্ছেন। ফলে অর্থ পরিশোধের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে।
এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে—এই উগ্র আচরণের ফলে আসলে কার ক্ষতি হচ্ছে? উত্তরটা খুব সহজ। যারা শান্তভাবে তাদের পাওনা পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন, তারাই এখন সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী।
একটু ভেবে দেখুন, একজন কর্মচারী মাসের পর মাস কাজ করার পর তার প্রাপ্য টাকার জন্য অপেক্ষা করছে। সব প্রস্তুতি শেষ, শুধু টাকা হাতে পাওয়ার অপেক্ষা। ঠিক তখনই এমন একটি ঘটনা ঘটল, যার কারণে পুরো প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেল।
এটা ঠিক যেন ব্যাংকে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় হঠাৎ ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাওয়া। আপনার টাকা আছে, পাওয়ার অধিকার আছে, কিন্তু পরিস্থিতির কারণে তা পাচ্ছেন না। জনকণ্ঠের অনেক কর্মচারীর অবস্থা এখন ঠিক এমনই।
এই উগ্রতার ফলে নিরীহ কর্মীরা শুধু মানসিক চাপেই ভুগছেন না, আর্থিক দিক থেকেও ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
অভিযোগ রয়েছে, এই গোষ্ঠীটি আগেও প্রতিষ্ঠান দখলের চেষ্টা করেছিল। এবারও তারা সংগঠিতভাবে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করেছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, তারা নাকি নির্বাচিত সরকারের নাম ব্যবহার করে নিজেদের কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
এ ধরনের আচরণ শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, পুরো গণমাধ্যম খাতের জন্যই হুমকি। সাংবাদিকতা যেখানে সত্য প্রকাশের প্রতীক, সেখানে এমন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সেই আদর্শকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এই ঘটনার পর জনকণ্ঠের সম্পাদক গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন, যেন দ্রুত এই পরিস্থিতির সমাধান করা হয় এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
গণমাধ্যম একটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। এখানে কর্মরত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। যদি সাংবাদিক ও কর্মচারীরাই নিরাপদ না থাকেন, তাহলে তারা কীভাবে স্বাধীনভাবে কাজ করবেন?
এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো আইন প্রয়োগ। যারা এই উগ্র কর্মকাণ্ডে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে অফিস কার্যক্রম আবার চালু করা দরকার।
এছাড়া, কর্মচারীদের পাওনা দ্রুত পরিশোধের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। কারণ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা একজন মানুষের জীবনে বড় প্রভাব ফেলে।
পুরো ঘটনাটি বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে ওঠে—উগ্রতা কখনোই সমাধান নয়। বরং এটি সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে। এখানে যাদের জন্য আন্দোলন করা হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
একটি প্রতিষ্ঠানের ভেতরের সমস্যা সমাধানের জন্য সংলাপ, আলোচনা এবং আইনি পথই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। মব সংস্কৃতি শুধু ভীতি তৈরি করে, সমাধান নয়।
জনকণ্ঠের এই ঘটনা আমাদের জন্য একটি শিক্ষা—যে কোনো দাবি আদায়ের ক্ষেত্রে শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মত পথই দীর্ঘমেয়াদে সবার জন্য ভালো।
সূত্র: দৈনিক জনকন্ঠ পত্রিকার ফেসবুক পেজ।

