খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeঅর্থ-বানিজ্যহরমুজ প্রণালী ঘিরে যুদ্ধের আশঙ্কা! আমেরিকার পাল্টা বার্তায় চাপে ইরান

হরমুজ প্রণালী ঘিরে যুদ্ধের আশঙ্কা! আমেরিকার পাল্টা বার্তায় চাপে ইরান

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী, গত সাত দিনে ১৪০টিরও বেশি জাহাজ নিরাপদে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে। শুধু তাই নয়, গত দুই মাসে মার্কিন বাহিনীর সহায়তায় ৮০০টিরও বেশি তেলবাহী জাহাজ এই রুট ব্যবহার করেছে, যেগুলো মিলিয়ে ৪০০ মিলিয়নেরও বেশি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহন করেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে আবারও মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যে ইরান এই কৌশলগত জলপথ বন্ধ করার ইঙ্গিত দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, হরমুজ প্রণালী কোনোভাবেই ইরানের একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এটি একটি উন্মুক্ত সামুদ্রিক পথ এবং বিশ্বের সব দেশের জাহাজের জন্য এখানে অবাধ নৌ চলাচল অব্যাহত থাকবে।

মার্কিন প্রশাসনের এই বার্তা শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

রবিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, হরমুজ প্রণালী আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। এই পথ দিয়ে জ্বালানি ও বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন সম্পূর্ণ বৈধ এবং বিশ্বের সব দেশের জাহাজের জন্য এটি উন্মুক্ত।

সেন্টকম আরও জানায়, ইরানের হুমকি, হয়রানি কিংবা একতরফা ঘোষণা আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল বন্ধ করতে পারবে না। নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী সব সময় প্রস্তুত রয়েছে এবং এই রুটে নিরাপত্তা বজায় রাখতে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত ও কৌশলগত সামুদ্রিক করিডর। পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানির বড় অংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়।

বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই সংকীর্ণ জলপথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এখানে সামান্য উত্তেজনাও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম, পরিবহন ব্যয় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী, গত সাত দিনে ১৪০টিরও বেশি জাহাজ নিরাপদে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে। শুধু তাই নয়, গত দুই মাসে মার্কিন বাহিনীর সহায়তায় ৮০০টিরও বেশি তেলবাহী জাহাজ এই রুট ব্যবহার করেছে, যেগুলো মিলিয়ে ৪০০ মিলিয়নেরও বেশি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহন করেছে।

এই পরিসংখ্যান তুলে ধরে ওয়াশিংটন বোঝাতে চেয়েছে যে, ইরানের হুমকি সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ কার্যকরভাবে সচল আছে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে প্রাথমিক সমঝোতা বা শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর তা কার্যত অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

হরমুজ প্রণালীতে জাহাজে হামলার ঘটনার পর দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আবারও তীব্র হয়ে ওঠে। এরই ধারাবাহিকতায় ইরান প্রণালী বন্ধ করার ঘোষণা দেয়, যা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

রবিবার ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ তোলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, একতরফা চুক্তির যুগ শেষ হয়ে গেছে। ইরান আগেই সতর্ক করেছিল—প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করলে তার মূল্য দিতে হবে।

তার এই মন্তব্যের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে যে, তেহরান বর্তমান পরিস্থিতিতে আরও কঠোর অবস্থান নিতে প্রস্তুত।

শনিবার হরমুজ প্রণালীতে সাইপ্রাসের পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

হামলার পর জাহাজে থাকা ১১ জন ভারতীয় নাবিকের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে উদ্ধারকারী দল ১০ জনকে নিরাপদে উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও একজন নাবিক এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।

এই ঘটনায় ভারত গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলেও এই ঘটনার পর সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

জাহাজে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রও কঠোর সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ১৪০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে।

এই অভিযানের একাধিক ভিডিও প্রকাশ করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। তাদের দাবি, এসব হামলা ছিল নির্দিষ্ট সামরিক অবকাঠামো ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট স্থাপনাকে লক্ষ্য করে পরিচালিত।

যদিও ইরান এই হামলার বিষয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, তবে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা যে আরও বাড়ছে, তা স্পষ্ট।

হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে প্রতিটি উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। কারণ বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল রপ্তানি এই পথের ওপর নির্ভরশীল।

যদি পরিস্থিতি আরও অবনতি হয় অথবা নৌ চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে পরিবহন ব্যয়, শিল্প উৎপাদন এবং বিভিন্ন দেশের অর্থনীতির ওপর।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে বর্তমান পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক কূটনীতির জন্য নতুন পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। একদিকে ইরান তার অবস্থান আরও কঠোর করছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।

বিশ্বের বড় অর্থনীতি, জ্বালানি আমদানিকারক দেশ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থাগুলো এখন পরিস্থিতির দিকে নিবিড় নজর রাখছে। কারণ এই জলপথে যেকোনো অস্থিতিশীলতা শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাই নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকেও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এখনও প্রশমিত হয়নি। ইরানের হুমকির জবাবে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছে এবং প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছে।

এদিকে জাহাজে হামলা, নিখোঁজ নাবিক এবং পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে। ফলে আগামী দিনে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে যে কোনো নতুন ঘটনার দিকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকবে।