আর্জেন্টিনার সামনে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের গুরুত্বপূর্ণ লড়াই। প্রতিপক্ষ সুইৎজ়ারল্যান্ড। তবে ম্যাচ শুরুর আগেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন একজনপর্তুগিজ রেফারি জোয়াও পিনেইরো। আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এই ম্যাচে তাঁকেই প্রধান রেফারির দায়িত্ব দিয়েছে। ঘোষণার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ফুটবল মহলে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। বিশেষ করে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের একাংশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, কারণ অতীতে তাঁর কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে প্রতিটি ম্যাচই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমন ম্যাচে রেফারির একটি সিদ্ধান্তও ফলাফল বদলে দিতে পারে। তাই ফিফা যখন ঘোষণা করে যে আর্জেন্টিনা বনাম সুইৎজ়ারল্যান্ড ম্যাচ পরিচালনা করবেন পর্তুগালের অভিজ্ঞ রেফারি জোয়াও পিনেইরো, তখন থেকেই বিষয়টি আলোচনায় আসে।
পিনেইরো আন্তর্জাতিক ফুটবলে পরিচিত নাম হলেও তাঁর কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত অতীতে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ফলে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, ম্যাচ পরিচালনায় নিরপেক্ষতা ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
জোয়াও পিনেইরোর ক্যারিয়ারে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটে গত মৌসুমের উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে। প্যারিস সেন্ট-জার্মেই (পিএসজি) ও বায়ার্ন মিউনিখের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
সেই ম্যাচে পিএসজি ১-০ গোলে এগিয়ে থাকার সময় নিজেদের পেনাল্টি বক্সে বল হাতে লাগে পিএসজির মিডফিল্ডার জোয়াও নেভেসের। বায়ার্ন মিউনিখের খেলোয়াড়রা সঙ্গে সঙ্গে হ্যান্ডবলের দাবি জানিয়ে প্রবল আপত্তি করেন। কিন্তু পিনেইরো খেলা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন।
সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয় তখন, যখন ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR) থেকেও তাঁকে মনিটরে গিয়ে ঘটনাটি পুনরায় দেখার আহ্বান জানানো হয়নি। জার্মান গণমাধ্যম এবং বায়ার্ন সমর্থকদের অনেকেই এই সিদ্ধান্তকে ভুল বলে আখ্যা দেন। সেই ঘটনার পর থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে পিনেইরোর সিদ্ধান্ত নিয়ে বাড়তি নজর থাকে।
চলমান বিশ্বকাপেও ইতোমধ্যে দুটি ম্যাচ পরিচালনা করেছেন জোয়াও পিনেইরো।
প্রথম ম্যাচে সুইৎজ়ারল্যান্ড ও বসনিয়ার লড়াইয়ে তিনি বেশ কঠোর অবস্থান নেন। বসনিয়ার তারিক মুহারেমোভিচকে লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ ছাড়তে বাধ্য করেন। ম্যাচটি শৃঙ্খলাপূর্ণ রাখতে তিনি কঠোর রেফারিংয়ের পরিচয় দেন।
অন্যদিকে, শেষ ষোলোতে কানাডা ও দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচে তাঁর রেফারিং ছিল তুলনামূলক শান্ত। পুরো ম্যাচে মাত্র দুটি হলুদ কার্ড দেখাতে হয় তাঁকে। ফলে অনেকে মনে করছেন, পরিস্থিতি অনুযায়ী ম্যাচ পরিচালনার ধরন বদলাতে সক্ষম এই পর্তুগিজ কর্মকর্তা।
বিশেষ একটি বিষয় হলো, এটি হবে জোয়াও পিনেইরোর পরিচালনায় আর্জেন্টিনার প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। ফলে লিওনেল মেসিদের সঙ্গে তাঁর মাঠের অভিজ্ঞতা আগে নেই।
এমন পরিস্থিতিতে ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, ম্যাচের শুরু থেকেই তিনি দুই দলের প্রতি সমান কঠোর ও নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করবেন। কারণ নকআউট পর্বে একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত পুরো টুর্নামেন্টের চিত্র পাল্টে দিতে পারে।
ফিফার ঘোষণায় জানা গেছে, কানসাস সিটির এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে প্রধান রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন জোয়াও পিনেইরো।
তাঁকে সহায়তা করবেন দুই সহকারী রেফারি ব্রুনো জেসুস এবং লুসিয়ানো মাইয়া। চতুর্থ রেফারির দায়িত্ব পালন করবেন কানাডার ড্রু ফিশার। পাশাপাশি ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR) টিমও ম্যাচের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।
বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে রেফারিং সবসময়ই আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। আর্জেন্টিনার সমর্থকদের একাংশের উদ্বেগের মূল কারণ পিনেইরোর অতীতের কয়েকটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত। যদিও শুধুমাত্র অতীতের ঘটনাকে ভিত্তি করে বর্তমান ম্যাচ নিয়ে নিশ্চিত কোনো ধারণা করা সম্ভব নয়।
ফুটবল বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিজ্ঞ রেফারিরা বড় ম্যাচে সাধারণত আরও সতর্ক থাকেন। ফিফাও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে রেফারিদের পারফরম্যান্স নিয়মিত মূল্যায়ন করে থাকে। ফলে পিনেইরোও এই ম্যাচে বিতর্ক এড়িয়ে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করবেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্বকাপে রেফারি নিয়োগ নিয়ে এটিই প্রথম আলোচনা নয়। এর আগে ফ্রান্স ও মরক্কোর একটি ম্যাচে পাঁচজন আর্জেন্টিনীয় ম্যাচ কর্মকর্তা নিয়োগ পাওয়ার ঘটনায় বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছিল।
তবে সেই ম্যাচে রেফারিরা এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেননি, যা বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দেয়। ফলে শেষ পর্যন্ত সেই আলোচনা মাঠের পারফরম্যান্সেই থেমে যায়।
এখন সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু আর্জেন্টিনা বনাম সুইৎজ়ারল্যান্ডের কোয়ার্টার ফাইনাল। একদিকে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে শিরোপার স্বপ্নে এগিয়ে যেতে চায় আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে চমক দেখানোর লক্ষ্য সুইৎজ়ারল্যান্ডের।
এই ম্যাচে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রেফারির প্রতিটি সিদ্ধান্তও আলোচনার বিষয় হতে পারে। ফুটবলপ্রেমীরা আশা করছেন, ম্যাচটি হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, স্বচ্ছ এবং বিতর্কমুক্ত। সবশেষে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হবে শুধুমাত্র মাঠের খেলায়, কোনো বিতর্কিত সিদ্ধান্তে নয়।

