বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে শক্তিশালী ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার আগে বড় ধরনের সমস্যায় পড়েছে নরওয়ে। দলের একাধিক ফুটবলার অসুস্থতায় আক্রান্ত হওয়ায় প্রস্তুতিতে ব্যাঘাত ঘটেছে বলে নিশ্চিত করেছেন নরওয়ের গোলরক্ষক ওরিয়ান নিয়ল্যান্ড। তিনি জানিয়েছেন, দলের চিকিৎসক বর্তমানে অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছেন এবং পুরো স্কোয়াডকে সুস্থ রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
শনিবার রাতে মিয়ামিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে নরওয়ের জন্য এটি নিঃসন্দেহে বড় ধাক্কা। ম্যাচটির বিজয়ী দল সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা অথবা সুইজারল্যান্ডের মুখোমুখি হবে।
ওরিয়ান নিয়ল্যান্ড সংবাদমাধ্যমকে জানান, দলের মধ্যে অসুস্থতার খবর সত্য। তিনি বলেন, দলের কয়েকজন খেলোয়াড় শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন এবং চিকিৎসক প্রায় সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকছেন।
তার ভাষায়, ছুটির সময় হয়তো কেউ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, ম্যাচের আগেই সবাই সুস্থ হয়ে উঠবেন এবং পূর্ণ শক্তির দল নিয়েই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামতে পারবেন।
এই মন্তব্যের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে, নরওয়ের প্রস্তুতিতে স্বাস্থ্যগত সমস্যা বড় প্রভাব ফেলছে।
উত্তর আমেরিকায় বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর থেকেই নরওয়ে দলকে এক শহর থেকে আরেক শহরে দীর্ঘ ভ্রমণ করতে হয়েছে। তারা প্রথমে বোস্টনে ক্যাম্প শুরু করে। এরপর নিউ জার্সি, আবার বোস্টন, তারপর ডালাস এবং শেষ ষোলোর ম্যাচ খেলতে আবার নিউ জার্সিতে ফিরে যায়।
এত ঘন ঘন বিমানযাত্রা ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে খেলোয়াড়দের শারীরিক ক্লান্তি বেড়েছে বলে নরওয়ের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ ভ্রমণ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দিতে পারে, ফলে ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
নরওয়ের ফরোয়ার্ড ইয়র্গেন স্ট্র্যান্ড লারসেন অসুস্থতার কারণে টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচ খেলতে পারেননি। এছাড়া ডিফেন্ডার মার্কাস হোমগ্রেন পেডারসেনও ব্রাজিলের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে মাঠে নামতে পারেননি।
এতে বোঝা যাচ্ছে, অসুস্থতার সমস্যা নতুন নয়; পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই এটি নরওয়ের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুধু খেলোয়াড় নন, নরওয়ের প্রধান কোচ স্টালে সোলবাক্কেনও শারীরিক সমস্যায় ভুগেছেন। ফ্রান্সের বিপক্ষে ৪-১ ব্যবধানে হারের পর সংবাদ সম্মেলনে তাকে বারবার কাশতে দেখা যায়।
তিনি জানান, একজন খেলোয়াড়ের জ্বর ছিল। পাশাপাশি আরও কয়েকজনের মধ্যে কাশি ও গলার সমস্যার লক্ষণ দেখা গেছে।
সোলবাক্কেন মনে করেন, নিয়মিত বিমান ভ্রমণ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ এবং ড্রেসিংরুমের পরিবর্তিত আবহাওয়াও এ ধরনের সমস্যার কারণ হতে পারে। তার মতে, ৫০ জনের বেশি সদস্য নিয়ে একটি দলের মধ্যে দু-একজন অসুস্থ হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
বিশ্বকাপে এবারই প্রথম নরওয়ে গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে। এর আগে বড় কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে তারা কখনও গ্রুপ পর্বের বাধা অতিক্রম করতে পারেনি।
এবার সেই ইতিহাস বদলে দিয়েছে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দলটি। তবে সেমিফাইনালে উঠতে হলে তাদেরকে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে অনেক এগিয়ে থাকা ইংল্যান্ডকে হারাতে হবে।
সোলবাক্কেন বলেন, ইংল্যান্ডের খেলা তারা বিশ্লেষণ করছেন। প্রতিপক্ষ অত্যন্ত শক্তিশালী হলেও তিনি বিশ্বাস করেন ম্যাচটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে।
অন্যদিকে, ইংল্যান্ড কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে মেক্সিকোর বিপক্ষে স্মরণীয় ৩-২ গোলের জয় নিয়ে। আজটেকা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচটি এক ঘণ্টার বেশি বিলম্বে শুরু হলেও ইংল্যান্ড শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছে।
মিডফিল্ডার জুড বেলিংহ্যাম মাত্র ৯৮ সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি গোল করে দলকে দারুণ সূচনা এনে দেন। প্রথম গোলটি আসে বুকায়ো সাকার দারুণ ক্রস থেকে, আর দ্বিতীয় গোলেও তিনি প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে বল জালে পাঠান।
তবে প্রথমার্ধের শেষ দিকে জুলিয়ান কিনিওনেস গোল করে মেক্সিকোকে ম্যাচে ফিরিয়ে আনেন।
দ্বিতীয়ার্ধে ডিফেন্ডার জ্যারেল কোয়ানসাহ লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে ইংল্যান্ড ১০ জনের দলে পরিণত হয়। তবুও দলটি ভেঙে পড়েনি।
হ্যারি কেন পেনাল্টি থেকে গোল করে ব্যবধান বাড়ান। পরে রাউল হিমেনেজও পেনাল্টি থেকে গোল করলেও শেষ পর্যন্ত জয় ধরে রাখতে সক্ষম হয় ইংল্যান্ড।
সংখ্যায় পিছিয়ে থেকেও জয় পাওয়ায় দলটির আত্মবিশ্বাস এখন তুঙ্গে।
ইংল্যান্ডের প্রধান কোচ থমাস টুখেল ম্যাচ শেষে খেলোয়াড়দের মানসিক দৃঢ়তার ভূয়সী প্রশংসা করেন।
তার মতে, এটি ছিল অসাধারণ সাহসিকতার একটি ম্যাচ। কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও খেলোয়াড়রা বিশ্বাস হারাননি এবং নিজেদের ইচ্ছাশক্তির জোরে জয় ছিনিয়ে এনেছেন।
টুখেল বলেন, দলের হৃদয় ও আত্মবিশ্বাসই ছিল এই জয়ের মূল শক্তি। এমন ঐতিহাসিক স্টেডিয়ামে এমন লড়াকু পারফরম্যান্স দীর্ঘদিন মনে রাখার মতো।
যদিও আত্মবিশ্বাসে এগিয়ে রয়েছে ইংল্যান্ড, তবুও দলটি পুরোপুরি স্বস্তিতে নেই।
মেক্সিকোর বিপক্ষে লাল কার্ড পাওয়ায় কোয়ার্টার ফাইনালে খেলতে পারবেন না জ্যারেল কোয়ানসাহ।
এছাড়া জর্ডান হেন্ডারসনও ইনজুরির কারণে ছিটকে গেছেন। বিজ্ঞাপন বোর্ডে পড়ে গিয়ে তার কব্জিতে গুরুতর চোট লাগে। চিকিৎসকদের ধারণা, তার কব্জির হাড় ভেঙে গেছে। ফলে তিনি দলের সঙ্গে ফিরে আসতে পারেননি।
ডিফেন্ডার রিস জেমসও চোট থেকে পুরোপুরি সেরে উঠবেন কি না, তা ম্যাচের আগে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
দুই দলের বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করলে ইংল্যান্ড কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স, শক্তিশালী আক্রমণভাগ এবং বড় ম্যাচে অভিজ্ঞতা তাদের এগিয়ে রাখছে।
অন্যদিকে, নরওয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের এই পর্যায়ে উঠে ইতিহাস গড়েছে। কিন্তু অসুস্থতা, ক্লান্তি এবং স্কোয়াডের অনিশ্চয়তা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবুও নকআউট ফুটবলে যেকোনো মুহূর্তে চিত্র পাল্টে যেতে পারে। যদি নরওয়ে তাদের মূল খেলোয়াড়দের সুস্থ অবস্থায় মাঠে নামাতে পারে, তাহলে ইংল্যান্ডকে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হতে পারে।
বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ড ও নরওয়ের লড়াই এখন শুধুই দুই দলের ফুটবল দক্ষতার নয়, বরং শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক দৃঢ়তা এবং কৌশলগত প্রস্তুতিরও পরীক্ষা। একদিকে অসুস্থতার ধাক্কা সামলে ইতিহাস গড়তে চায় নরওয়ে, অন্যদিকে ধারাবাহিক জয়ের আত্মবিশ্বাস নিয়ে সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করতে চায় ইংল্যান্ড। তাই ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এই ম্যাচটি হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণীয় ও উত্তেজনাপূর্ণ লড়াই।

