ব্রাজিল ফুটবলের ইতিহাসে অনেক কিংবদন্তির জন্ম হয়েছে। পেলে, রোনাল্ডো, রোনালদিনহো কিংবা কাকার মতো তারকারা বিশ্ব ফুটবলে দেশটির আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। সেই ধারাবাহিকতায় একসময় যে নামটিকে ব্রাজিলের ভবিষ্যৎ হিসেবে দেখা হয়েছিল, তিনি হলেন নেইমার। কিন্তু প্রতিভা, জনপ্রিয়তা ও রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও বিশ্বকাপের মঞ্চে বারবার দুর্ভাগ্য যেন তার পথ আটকে দিয়েছে।
বর্তমানে ৩২ বছর বয়সী এই ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টার আবারও আলোচনায়। মাঠে না থেকেও তিনি শিরোনাম দখল করে রেখেছেন। একদিকে চোটের কারণে জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ মিস করছেন, অন্যদিকে ব্যক্তিগত জীবনে সুখবরের কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভক্তদের শুভেচ্ছায় ভাসছেন।
সম্প্রতি নেইমারের দীর্ঘদিনের সঙ্গী ব্রুনা বিয়ানকার্ডি ঘোষণা দিয়েছেন যে তারা তাদের তৃতীয় কন্যা সন্তানের অপেক্ষায় আছেন। ইতোমধ্যে নেইমারের দুটি পুত্রসন্তান রয়েছে। ফলে খুব শিগগিরই পাঁচ সন্তানের বাবা হতে চলেছেন ব্রাজিলের এই তারকা ফুটবলার।
এই ঘোষণার পর ভক্তদের পাশাপাশি ফুটবল বিশ্বেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। মাঠের বাইরের এই সুখবর নেইমারের জীবনে নতুন আনন্দ যোগ করলেও মাঠের ভেতরে তার সামনে রয়েছে আরও বড় চ্যালেঞ্জ।
সাম্প্রতিক সময়ে চোট যেন নেইমারের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। পায়ের মাংসপেশির সমস্যার কারণে তিনি ব্রাজিলের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে অংশ নিতে পারেননি। ধারণা করা হচ্ছে, গ্রুপ পর্বের শেষ দুটি ম্যাচেও তাকে দেখা যাবে না।
তবে ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলোত্তি এখনও তাকে দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করছেন। নকআউট পর্বে যদি তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ফিরতে পারেন, তাহলে দলের আক্রমণভাগে নতুন প্রাণ সঞ্চার হতে পারে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে উরুগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে বাম হাঁটুর অ্যান্টেরিয়র ক্রুসিয়েট লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়ার পর থেকে জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামতে পারেননি নেইমার।
গুরুতর এই ইনজুরির কারণে দীর্ঘ সময় পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো আর আগের মতো ফিরে আসা সম্ভব হবে না। কিন্তু নেইমার হাল ছাড়েননি। কঠোর পরিশ্রম করে তিনি আবারও জাতীয় দলের দরজায় কড়া নাড়ছেন।
বর্তমান ব্রাজিল দলে প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের অভাব নেই। ভিনিসিয়াস জুনিয়র, রাফিনিয়া, ব্রুনো গুইমারেস, লুকাস পাকেতা, এন্ড্রিক এবং ম্যাথিউস কুনহার মতো ফুটবলাররা ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোতে নিয়মিত ভালো খেলছেন।
তবে সমস্যা হলো, তাদের মধ্যে এখনও কেউ নেইমারের মতো বিশ্বব্যাপী প্রভাব তৈরি করতে পারেননি। একজন ম্যাচজয়ী নেতা হিসেবে নেইমারের অভিজ্ঞতা এবং বড় ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দেওয়ার ক্ষমতা এখনও ব্রাজিলের জন্য অমূল্য।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে ব্রাজিলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। আগের মতো আর তাদের টুর্নামেন্টের প্রধান ফেভারিট হিসেবে দেখা হয় না। এমন বাস্তবতায় নেইমার যেন অতীতের গৌরবময় ব্রাজিলের শেষ প্রতিনিধি।
২০১৪ সালে নিজ দেশের মাটিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে নেইমারের ওপর ছিল পুরো জাতির প্রত্যাশা। ব্রাজিল সমর্থকরা বিশ্বাস করতেন, তিনিই দেশকে আবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করবেন।
কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে ভয়াবহ চোটে পড়েন তিনি। হুয়ান জুনিগার হাঁটুর আঘাতে তার মেরুদণ্ডের একটি কশেরুকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই চোট তাকে পুরো টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দেয়।
নেইমারকে হারানোর ধাক্কা সামলাতে পারেনি ব্রাজিল। সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের ঐতিহাসিক পরাজয় এখনও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় ট্র্যাজেডি হিসেবে বিবেচিত হয়।
রাশিয়া বিশ্বকাপের আগে চোট থেকে ফিরলেও নেইমার ছিলেন নিজের সেরা ছন্দের বাইরে। শেষ পর্যন্ত ব্রাজিল কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের কাছে হেরে বিদায় নেয়।
চার বছর পর কাতার বিশ্বকাপেও একই চিত্র দেখা যায়। সার্বিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেই গোড়ালির লিগামেন্টে আঘাত পান তিনি। পরে নকআউট পর্বে ফিরলেও দলকে শেষ আটের বাধা পেরিয়ে নিতে পারেননি। ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয় ব্রাজিলের।
নেইমারকে নিয়ে সমালোচনারও শেষ নেই। অনেক ফুটবল বিশ্লেষকের মতে, তিনি নিজের ফিটনেস এবং ক্যারিয়ার ব্যবস্থাপনায় আরও যত্নবান হতে পারতেন।
তুলনামূলকভাবে লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো দীর্ঘ সময় ধরে নিজেদের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। নেইমারের ক্ষেত্রেও সেই প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু ঘনঘন চোট ও নানা বিতর্ক তার ক্যারিয়ারকে বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে।
তবুও ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের বিশ্বাস এখনো অটুট। কারণ তারা জানেন, পুরোপুরি ফিট নেইমার এখনও ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেকেই মনে করছেন, এটি হয়তো নেইমারের শেষ বিশ্বকাপ। যদিও বয়সের হিসেবে তার সামনে আরও কয়েক বছর খেলার সুযোগ রয়েছে, তবুও বারবার চোট পাওয়ার ইতিহাস ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
যদি তিনি এবার সুস্থ হয়ে মাঠে ফিরতে পারেন এবং ব্রাজিলকে সাফল্যের পথে নিয়ে যেতে পারেন, তাহলে হয়তো তার বিশ্বকাপ ক্যারিয়ার নতুন অর্থ পাবে। অন্যথায় তিনি থেকে যাবেন এমন এক প্রতিভাবান ফুটবলার হিসেবে, যিনি অসাধারণ প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের পূর্ণ সামর্থ্য দেখানোর সুযোগ পাননি।
দেশের হয়ে ৭৯ গোল করা নেইমার শুধু একজন গোলদাতা নন; তিনি একজন সৃজনশীল প্লেমেকার, নেতা এবং অনুপ্রেরণার উৎস। তার উপস্থিতি পুরো দলের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়।
ব্রাজিলের বর্তমান স্কোয়াডে প্রতিভার অভাব নেই, কিন্তু এমন একজন খেলোয়াড়ের অভাব রয়েছে যিনি এক মুহূর্তে ম্যাচের চিত্র বদলে দিতে পারেন। সেই কারণেই সব সমালোচনা, চোট এবং বিতর্কের মাঝেও নেইমার এখনও ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় আশা।
এখন দেখার বিষয়, বিশ্বকাপের এই অধ্যায়ে তিনি কি অবশেষে দুর্ভাগ্যের অভিশাপ ভেঙে দেশের জন্য নায়ক হয়ে উঠতে পারেন, নাকি বিশ্বকাপের সঙ্গে তার অসমাপ্ত গল্প আরেকবার অপূর্ণই থেকে যাবে।

