বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেই নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতার আভাস মিলছে। সূত্রের দাবি, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী সপ্তাহে ভারত সফরে যেতে পারেন। সম্ভাব্য সফরের সময় ২১ থেকে ২৫ আগস্টের মধ্যে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত সফরের তারিখ নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি হয়েছে অন্য একটি বিষয়কে ঘিরে। আগামী সেপ্টেম্বরে ভারতে আয়োজিত ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর যোগ দেওয়ার কথা থাকলেও তার আগেই পৃথকভাবে নয়াদিল্লি সফরের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ফলে এই সফরের পেছনে শুধুই আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের একটি বড় কূটনৈতিক সমীকরণ কাজ করছে কি না, তা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে।
কূটনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, ব্রিকস সম্মেলনের মতো বহুপাক্ষিক মঞ্চের বাইরে ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে সরাসরি আলোচনা করতেই এই সফরের পরিকল্পনা হতে পারে।
বহুপাক্ষিক সম্মেলনে একাধিক দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধান উপস্থিত থাকেন। ফলে সেখানে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের সুযোগ থাকলেও আলোচনার পরিসর ও সময় অনেকটাই সীমিত থাকে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে হলে আলাদা দ্বিপাক্ষিক সফর তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর হতে পারে।
এই কারণেই ব্রিকস সম্মেলনের আগে নয়াদিল্লিতে পৃথক সফরকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নানা ক্ষেত্রে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। সীমান্ত পরিস্থিতি, রাজনৈতিক বক্তব্য, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে অভিযোগ এবং পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি—সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
এমন পরিস্থিতিতে নতুন সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরকে সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই দেখছেন অনেকে। দুই দেশের মধ্যে যেসব বিষয়ে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে, সেগুলো নিয়ে সরাসরি রাজনৈতিক নেতৃত্বের পর্যায়ে আলোচনা হলে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করা সহজ কাজ নয়। একাধিক ইস্যুতে দুই দেশের স্বার্থ ও অবস্থান ভিন্ন। ফলে একটি বৈঠকেই সব সমস্যার সমাধান হবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
সম্ভাব্য সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক।
দুই দেশের সরকারপ্রধানের সরাসরি বৈঠকে সীমান্ত, বাণিজ্য, পানি, নিরাপত্তা, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং পারস্পরিক রাজনৈতিক আস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
এ ধরনের আলোচনায় শুধু তাৎক্ষণিক সমস্যা নয়, ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্ক কোন পথে এগোবে, সেই বিষয়েও একটি রাজনৈতিক রূপরেখা তৈরি হতে পারে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সরাসরি যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগ থাকলেও শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক অনেক সময় জটিল বিষয়গুলো দ্রুত আলোচনার টেবিলে আনতে সাহায্য করে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারত ছাড়াও চিন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। ফলে তারেক রহমান সরকারের সামনে একাধিক দেশের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর চিনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়েও গুরুত্ব দেখা গেছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের সঙ্গেও ঢাকার যোগাযোগ ও সম্পর্কের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে এগিয়ে নেওয়া হবে, সেটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন।
ঢাকার জন্য একদিকে ভারতের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে চিনের সঙ্গে বাণিজ্য ও অবকাঠামোগত সম্পর্ক এবং পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগও রয়েছে। ফলে তিনটি দিক সামলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করাই সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরকে শুধু আন্তর্জাতিক কূটনীতির দৃষ্টিতে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও এই সফরের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী রাজনৈতিক বক্তব্য ও জনমত বিভিন্ন সময়ে জোরালো হয়েছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানও এক নয়।
এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর দেশের অভ্যন্তরে কীভাবে গ্রহণ করা হবে, সেটিও সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বিষয় হতে পারে।
বিশেষ করে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে জনমনে যে নানা প্রশ্ন রয়েছে, সফরের সময় সেগুলোর বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে ভারতের বিভিন্ন মহল থেকে সময়ে সময়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকারও বিভিন্ন সময়ে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে।
এই বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কে একটি সংবেদনশীল ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে সম্ভাব্য ভারত সফরে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা এবং পারস্পরিক অভিযোগের মতো বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
তবে এই ধরনের স্পর্শকাতর বিষয়ে দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব কী অবস্থান নেয়, সেটিই হতে পারে সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
আগামী সেপ্টেম্বরে ভারতে ব্রিকস সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলে সেখানে একাধিক দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতি থাকার কথা। এমন একটি বহুপাক্ষিক সম্মেলনের আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পৃথক ভারত সফর হলে সেটি কূটনৈতিকভাবে বিশেষ বার্তা বহন করতে পারে।
কারণ ব্রিকসের মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হলে তা বহুপাক্ষিক পরিবেশের মধ্যে হবে। কিন্তু তার আগে দ্বিপাক্ষিক সফর হলে দুই দেশের নিজেদের সমস্যাগুলো নিয়ে তুলনামূলকভাবে খোলামেলা আলোচনা করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ কারণেই সম্ভাব্য সফরকে ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত সফরের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সব তথ্য নিশ্চিত হয়নি। সূত্রের দাবি অনুযায়ী ২১ থেকে ২৫ আগস্টের মধ্যে তারেক রহমানের নয়াদিল্লি সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। সফর হলে সেখানে ভারতের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
দুই দেশের সম্পর্কের বরফ কতটা গলবে, তা অবশ্য নির্ভর করবে বৈঠকের ফল এবং পরবর্তী সময়ে নেওয়া সিদ্ধান্তের ওপর।
সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের পর যদি ঢাকা ও দিল্লি ফের নিয়মিত রাজনৈতিক যোগাযোগ বাড়াতে পারে, তাহলে সীমান্ত, বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ব্রিকস সম্মেলনের আগেই তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিছক একটি বিদেশ সফর নয়। এটি হলে তার নেপথ্যে থাকবে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ককে নতুনভাবে সাজানোর চেষ্টা, আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় রাখার প্রয়োজন এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা—এই তিনের সমীকরণ। এখন দেখার বিষয়, শেষ পর্যন্ত সফরটি হয় কি না এবং হলে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার প্রভাব কতটা গভীর হয়।


