খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeস্পোটস ওয়ার্ল্ডফিফা বিশ্বকাপ স্পেশালআইএসএল থেকে বিশ্বকাপ: হাইতির ডিউকেন্স নাজনের ঐতিহাসিক যাত্রা

আইএসএল থেকে বিশ্বকাপ: হাইতির ডিউকেন্স নাজনের ঐতিহাসিক যাত্রা

কিন্তু ভারতের মাটিতে খেলার পর বিশ্বকাপে অভিষেক করার নজির খুব কম। দীর্ঘদিন ধরে এই তালিকায় একমাত্র নাম ছিল নাইজেরিয়ার ডিফেন্ডার এমেকা এজুগো। ১৯৮৬ সালে ইস্টবেঙ্গলের হয়ে খেলার পর তিনি ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে নাইজেরিয়ার প্রতিনিধিত্ব করেন।

ভারতের ইন্ডিয়ান সুপার লিগ (আইএসএল) বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় প্রতিযোগিতা না হলেও, এখান থেকে বিশ্বকাপের মঞ্চে পৌঁছানোর গল্প খুবই বিরল। সেই বিরল ইতিহাসের নতুন নাম ডিউকেন্স নাজন। একসময় কেরালা ব্লাস্টার্সের হয়ে আইএসএলে খেলা এই হাইতিয়ান ফরোয়ার্ড এবার বিশ্বকাপে দেশের জার্সি গায়ে মাঠে নেমে নতুন এক অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছেন। তাঁর এই যাত্রা শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং আইএসএলের ইতিহাসেও এক স্মরণীয় সংযোজন।

আইএসএলের শুরু থেকেই বিশ্বের অনেক তারকা ফুটবলার ভারতের মাঠে খেলেছেন। বিশ্বকাপজয়ী থেকে শুরু করে ইউরোপিয়ান ফুটবলের বহু পরিচিত মুখ বিভিন্ন মৌসুমে ভারতীয় ক্লাবগুলোর হয়ে খেলেছেন। তবে তাঁদের অধিকাংশই আইএসএলে আসার আগেই বিশ্বকাপ খেলে ফেলেছিলেন।

কিন্তু ভারতের মাটিতে খেলার পর বিশ্বকাপে অভিষেক করার নজির খুব কম। দীর্ঘদিন ধরে এই তালিকায় একমাত্র নাম ছিল নাইজেরিয়ার ডিফেন্ডার এমেকা এজুগো। ১৯৮৬ সালে ইস্টবেঙ্গলের হয়ে খেলার পর তিনি ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে নাইজেরিয়ার প্রতিনিধিত্ব করেন।

এবার সেই তালিকায় যোগ হলো ডিউকেন্স নাজনের নাম। প্রায় এক দশক আগে কেরালা ব্লাস্টার্সের জার্সিতে আইএসএলে খেলেছিলেন তিনি। এরপর কঠোর পরিশ্রম, ধারাবাহিক পারফরম্যান্স এবং আন্তর্জাতিক ফুটবলে সাফল্যের মাধ্যমে বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়ে ইতিহাস গড়লেন এই ফরোয়ার্ড।

২০১৫ মৌসুমে কেরালা ব্লাস্টার্সের হয়ে খেলতে এসে নাজন ১৩ ম্যাচে দুটি গোল করেছিলেন। পরিসংখ্যান হয়তো খুব বড় কিছু নয়, কিন্তু তাঁর অবদান ছিল দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুন :  বিশ্বরেকর্ড ভেঙেও নির্লিপ্ত মেসি! আর্জেন্টিনার নকআউট নিশ্চিত করেই সবচেয়ে খুশি লিও

বিশেষ করে দিল্লি ডায়নামোজের বিপক্ষে সেমিফাইনালের দ্বিতীয় লেগে করা তাঁর গুরুত্বপূর্ণ গোল ম্যাচকে টাইব্রেকারে নিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত সেই ম্যাচ জিতে কেরালা ব্লাস্টার্স ফাইনালে জায়গা করে নেয়। ফলে ক্লাবটির সফল অভিযানে নাজনের অবদান আজও সমর্থকদের স্মৃতিতে রয়ে গেছে।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে বিশ্বকাপের মঞ্চে পা রাখেন ডিউকেন্স নাজন। মরক্কোর বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে মাঠে নেমে বিশ্বকাপে অভিষেক হয় তাঁর।

চোটের কারণে প্রথম দুই ম্যাচে খেলতে না পারলেও শেষ ম্যাচে সুযোগ পান তিনি। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ৪৪ গোল করে ইতোমধ্যেই হাইতির সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার স্বীকৃতি অর্জন করেছেন নাজন। বিশ্বকাপে তাঁর উপস্থিতি হাইতির ফুটবলের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আইএসএলের জন্যও এটি গর্বের মুহূর্ত।

মজার বিষয় হলো, নাজনের আইএসএলে আসাটা আগে থেকে পরিকল্পিত ছিল না। কেরালা ব্লাস্টার্সের তৎকালীন কোচিং স্টাফের সদস্য ইসফাক আহমেদ অন্য এক হাইতিয়ান ফুটবলারের ভিডিও বিশ্লেষণ করতে গিয়ে নাজনের প্রতিভা আবিষ্কার করেন।

প্রথমে ক্লাবের লক্ষ্য ছিলেন অন্য একজন ফুটবলার। কিন্তু ভিডিও দেখার সময় নাজনের গতি, দক্ষতা এবং আক্রমণাত্মক ফুটবল কোচিং স্টাফের নজর কাড়ে। এরপরই তাঁকে দলে নেওয়ার উদ্যোগ শুরু হয়।

আরও পড়ুন :  বিশ্বকাপ ফাইনালে ইতিহাস! প্রথমবার ৩০ মিনিটের হাফটাইম শো, ক্ষুব্ধ ফুটবল বিশ্ব

তবে তাঁকে রাজি করানো সহজ ছিল না। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২২ বছর। ফ্রান্সে খেলছিলেন এবং পর্তুগালের শীর্ষ লিগে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল। কিছু মেডিক্যাল জটিলতার কারণে সেই সুযোগ স্থগিত হলে কেরালা ব্লাস্টার্স তাঁকে চার মাসের জন্য দলে ভেড়ায়।

কেরালার কোচিং স্টাফের মতে, নাজনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর অসাধারণ গতি এবং দলগত মানসিকতা।

তিনি শুধু নিজে গোল করার চেষ্টা করতেন না, বরং সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করতেন। প্রতিপক্ষের ডিফেন্সে চাপ সৃষ্টি করে পুরো দলের আক্রমণকে আরও কার্যকর করে তুলতেন। মাঠে তাঁর পরিশ্রম ও ইতিবাচক মনোভাব তাঁকে দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ে পরিণত করেছিল।

কেরালা ব্লাস্টার্স ছাড়ার পর নাজনের ক্যারিয়ার নতুন মোড় নেয়। তিনি ইংল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব উলভারহ্যাম্পটন ওয়ান্ডারার্সে যোগ দেন। সে সময় ক্লাবটি ইংল্যান্ডের চ্যাম্পিয়নশিপে খেলছিল।

ইউরোপীয় ফুটবলে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দেখাতে থাকেন। সেই ধারাবাহিকতাই শেষ পর্যন্ত তাঁকে বিশ্বকাপের মঞ্চে পৌঁছে দেয়।

বিশ্বকাপের আগে নাজনের জন্য বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়ায় আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি। সে সময় তিনি ইরানের ক্লাব ইস্তেঘলালের হয়ে খেলছিলেন।

হাইতির খেলোয়াড়দের ভিসা কার্যক্রম চলছিল ফ্রান্সের প্যারিসে। নাজন ইরান থেকে বিমানে রওনা দেওয়ার প্রস্তুতি নিলেও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সেই ফ্লাইট বাতিল হয়ে যায়। এতে সময়মতো প্যারিসে পৌঁছানো নিয়ে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

আরও পড়ুন :  মিশরকে হারিয়েও কেন কেঁদেছিলেন মেসি? পেনাল্টি মিসের পর বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি!

শেষ পর্যন্ত তিনি সড়কপথে আজারবাইজান হয়ে দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে প্যারিসে পৌঁছান এবং জাতীয় দলের সঙ্গে যোগ দেন। সেই সংগ্রামের পর বিশ্বকাপে মাঠে নামার মুহূর্তটি তাঁর জন্য আরও আবেগঘন হয়ে ওঠে।

মরক্কোর কাছে ৪-২ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় হাইতি। ৫২ বছর পর বিশ্বকাপের আসরে ফিরে দলটি প্রত্যাশিত সাফল্য না পেলেও ডিউকেন্স নাজনের গল্প ফুটবলপ্রেমীদের মনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে।

আইএসএল থেকে উঠে এসে বিশ্বকাপের মঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা সহজ বিষয় নয়। সেই কঠিন পথ পেরিয়ে নাজন প্রমাণ করেছেন, প্রতিভা, অধ্যবসায় এবং সুযোগ একসঙ্গে মিললে যে কোনো ফুটবলারের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে পারে।

ডিউকেন্স নাজনের বিশ্বকাপ অভিষেক শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি ভারতীয় ফুটবল এবং আইএসএলের জন্যও এক গর্বের অধ্যায়। কেরালা ব্লাস্টার্সের হয়ে খেলা এক তরুণ ফুটবলারের বিশ্বকাপে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা দেখিয়ে দিয়েছে, ভারতীয় লিগ আন্তর্জাতিক ফুটবলের সঙ্গেও ধীরে ধীরে শক্তিশালী সংযোগ তৈরি করছে।

ভবিষ্যতে আরও অনেক প্রতিভাবান ফুটবলার যদি আইএসএলকে নিজেদের ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে ব্যবহার করে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছাতে পারেন, তবে ডিউকেন্স নাজনের নাম সেই পথের অন্যতম অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আর্কাইভ