ভারতের মহারাষ্ট্রের ছত্রপতি সম্ভাজীনগরে একই পরিবারের ৩ সদস্যের নিহতের ঘটনায় তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে নতুন নতুন তথ্য। শুরুর দিকে ১৮ বছরের তরুণ কুণালের সাথে আইফোন কিনে দেয়া নিয়ে তাদের পরিবারের বিরোধকেই ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে দেখছিল। তবে তদন্ত রিপোর্টে উঠে এসেছে, পরিবারের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলা নানা অশান্তি ও সম্পর্কের টানাপোড়েনও এই ঘটনার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতে পারে।
পুলিশ সূত্রে বলছে, শুক্রবার তিসগাঁও এলাকার কোঢ্যা পাহাড়ে এ ঘটনাটি ঘটে। কোঢ্যা পাহাড়ে দুর্ঘটনায় কুণাল, তাঁর বাবা মুরলীধর এবং তার মা সঙ্গীতার মৃত্যু হয়। একই পরিবারের ৩ জন নিহতের ঘটনার পর থেকেই পুরো বিষয়টি তদন্ত করছে পুলিশ।কুণালের পরিবারের পুরনো পরিস্থিতি, কুণালের মানসিক অবস্থা এবং ঘটনার আগে কী ঘটেছিল সব দিকই পুলিশ তদন্তের আওতায় রয়েছে।
ঘটনার আগে কুণাল তাঁর বাবার কাছে আইফোন কেনার কিস্তির টাকা চেয়েছিলেন বলে জানা গেছে। টাকা নিয়ে বাবা-ছেলের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। এরপর শুক্রবার সকালে কুণাল বাড়ি থেকে বেরিয়ে পাহাড়ের দিকে চলে যান।
প্রাথমিকভাবে পুলিশ মনে করেছিল, আইফোন কেনার বিষয়টি থেকেই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তবে পরে তদন্তকারীরা জানতে পারেন, কুণালের পরিবারে এর আগেও নানা ধরনের সমস্যা চলছিল। ফলে শুধু আইফোনকে কেন্দ্র করেই পুরো ঘটনার ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।
ঘটনার সময় কুণালের বাবা-মাও ছেলেকে বোঝাতে পাহাড়ে পৌঁছেছিলেন। সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কথা হয়। স্থানীয় কয়েকজন মানুষও ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।
তদন্তে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। প্রায় এক বছর আগে কুণাল একই পাহাড়ের এলাকায় গিয়েছিলেন এবং তখনও তাঁকে বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল।
স্থানীয় মানুষ ও পুলিশের হস্তক্ষেপে সেবার তাঁকে নিরাপদে বাড়ি ফিরিয়ে নেওয়া হয়। পরে তাঁর জন্য কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
এই তথ্য সামনে আসার পর তদন্তকারীরা কুণালের আগের পরিস্থিতি এবং পরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়েও নতুন করে খোঁজ নিচ্ছেন। কেন তিনি ওই এলাকায় গিয়েছিলেন এবং সে সময় তাঁর পারিবারিক ও ব্যক্তিগত পরিস্থিতি কী ছিল, তা জানার চেষ্টা চলছে।
পুলিশের তদন্তে পরিবারের পুরনো ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জানা গেছে, প্রায় ছয় বছর আগে শারীরিক অসুস্থতার কারণে কুণালের বড় ভাইয়ের মৃত্যু হয়। এরপর থেকেই পরিবারের পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
কুণালের বাবা মুরলীধর পেশায় গাড়িচালক। বড় ছেলের মৃত্যুর পর তিনি পরিবারের সঙ্গে অনেকটাই দূরত্ব তৈরি করেছিলেন বলে জানা গেছে। কখনও কখনও দীর্ঘ সময় বাড়ির বাইরে থাকতেন এবং আলাদাভাবেও থাকতেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
ঘটনার কয়েক দিন আগে তিনি আবার বাড়িতে ফিরেছিলেন। এর পরেই কুণালের সঙ্গে আইফোনের কিস্তির টাকা নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়। পুলিশ এখন এই পারিবারিক পরিস্থিতির সঙ্গে শুক্রবারের ঘটনার কোনো যোগসূত্র ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে।
কুণালের মা সঙ্গীতার একটি ইউটিউব চ্যানেল রয়েছে। সেখানে তিনি নিয়মিত ভিডিও প্রকাশ করতেন। ঘটনার ঠিক আগের দিন প্রকাশিত একটি ভিডিওতেও তিনি পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যে দূরত্ব নিয়ে কথা বলেছিলেন বলে জানা গেছে।
ভিডিওতে তিনি কারও নাম উল্লেখ না করলেও তাঁর বক্তব্যে পারিবারিক অশান্তির ইঙ্গিত পাওয়া যায় বলে পুলিশ মনে করছে। ওই ভিডিওর বিষয়বস্তু এবং পরিবারের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির মধ্যে কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
তদন্তকারীরা মনে করছেন, পরিবারের দীর্ঘদিনের সমস্যা, সম্পর্কের অবনতি এবং কুণালের ব্যক্তিগত চাপ সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করেই ঘটনার কারণ বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন।
শুক্রবার সকালে কুণাল বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর তাঁর বাবা-মা বিষয়টি জানতে পারেন। পরে তাঁরা তাঁকে খুঁজতে পাহাড়ের এলাকায় যান। সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে ছেলেকে বোঝানোর চেষ্টা করেন তাঁরা।
স্থানীয় কয়েকজনও ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছিল। কুণালের বাবা তাঁর কাছে এগিয়ে গিয়ে তাঁকে নিরাপদ জায়গায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন।
সেই সময়ই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। কুণাল ও তাঁর বাবা পাহাড় থেকে পড়ে যান। এরপর ঘটনাটি দেখে সঙ্গীতাও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন এবং তিনজনেরই মৃত্যু হয়। পুলিশ ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে।
ঘটনার পর সামাজিক মাধ্যমে এবং বিভিন্ন প্রতিবেদনে আইফোন কেনার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেলেও তদন্তকারীরা এখন আরও বিস্তৃতভাবে বিষয়টি দেখছেন। কারণ, পরিবারের পুরনো অশান্তি, বড় সন্তানের মৃত্যু, বাবা-মায়ের সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং কুণালের আগের সংকট এসব তথ্যও সামনে এসেছে।
তদন্তে এখন মূল প্রশ্ন হলো, ঘটনার দিন ঠিক কী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল এবং তার আগে পরিবারের মধ্যে কী ধরনের সমস্যা চলছিল। কুণালের সঙ্গে তাঁর বাবা-মায়ের সম্পর্ক কেমন ছিল, পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ কেমন ছিল এবং ঘটনার আগে কারও সঙ্গে তাঁর কোনো গুরুত্বপূর্ণ কথাবার্তা হয়েছিল কি না এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ কুণালের মায়ের ইউটিউব ভিডিওসহ পরিবারের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করছে। পাশাপাশি প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যও নেওয়া হচ্ছে।
একই পরিবারের তিন সদস্যের এই মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় এখনো তদন্ত চলছে। তাই আইফোনকে একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। পুলিশের হাতে আসা নতুন তথ্য বরং ইঙ্গিত দিচ্ছে, পরিবারের দীর্ঘদিনের নানা সমস্যা ঘটনাটির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তদন্ত শেষ হওয়ার পরই জানা যাবে, শুক্রবারের ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি কী ছিল এবং এর পেছনে কোন কোন বিষয় কাজ করেছিল। আপাতত পুলিশ পারিবারিক সম্পর্ক, আগের ঘটনাপ্রবাহ এবং ঘটনার দিনের পরিস্থিতি সবকিছু মিলিয়ে তদন্ত এগিয়ে নিচ্ছে।
তথ্য সূত্র: আনন্দবাজার ডট কম


