ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র বিরাট কোহলি এবং রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর (আরসিবি) সম্পর্ক যেন এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন। আইপিএলের প্রথম আসর থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত কোহলি শুধু একজন ক্রিকেটার নন, বরং আরসিবির পরিচয়ের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। তাই যখন তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়, তখন ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই জল্পনা বাড়তে থাকে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিরাট কোহলির অবসর নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে আগামী ওয়ানডে বিশ্বকাপে তাঁর অংশগ্রহণ এবং আইপিএলে খেলা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে কৌতূহল তুঙ্গে। তবে এই পরিস্থিতিতে আরসিবির সিইও রাজেশ মেননের মন্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু এবং বিরাট কোহলির সম্পর্ক শুধুমাত্র একজন খেলোয়াড় ও ফ্র্যাঞ্চাইজির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘ ১৮ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি এই দলের মুখ হয়ে উঠেছেন। মাঠের ভেতরে তাঁর অসাধারণ পারফরম্যান্স যেমন দলকে শক্তিশালী করেছে, তেমনি মাঠের বাইরেও তাঁর জনপ্রিয়তা আরসিবির ব্র্যান্ড মূল্যকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
রাজেশ মেনন এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “বিরাট কোহলি এবং আরসিবি একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। আইপিএলের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত বিরাটই এই দলের সবচেয়ে বড় পরিচয়। তাঁকে ছাড়া আরসিবির অস্তিত্ব কল্পনা করা কঠিন।”
এই মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট যে, কোহলির প্রতি আরসিবির আবেগ এবং সম্মান কতটা গভীর।
কোহলির অবসর নিয়ে যখন জল্পনা চলছে, তখন রাজেশ মেনন পরিষ্কার জানিয়েছেন যে ক্রিকেট থেকে বিদায় নেওয়ার পরও আরসিবির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অটুট থাকবে।
মেননের মতে, “বিরাট কোহলি একদিন ক্রিকেট থেকে অবসর নেবেন, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু অবসরের পরও তাঁকে আরসিবি থেকে দূরে রাখা সম্ভব নয়। তাঁর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক শুধুমাত্র একজন ক্রিকেটারের নয়, বরং পরিবারের সদস্যের মতো।”
এই বক্তব্য সমর্থকদের জন্য স্বস্তির খবর। কারণ অনেকেই মনে করেন, কোহলির অবদান আরসিবির ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এবং ভবিষ্যতেও তিনি কোনও না কোনও ভূমিকায় দলের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন।
রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রথমবার আইপিএল শিরোপা জিতেছিল। সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে দলটি আবারও চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।
ফাইনালে গুজরাট টাইটান্সকে ৫ উইকেটে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার আইপিএল ট্রফি নিজেদের করে নিয়েছে আরসিবি। এই জয়ে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছেন বিরাট কোহলি।
চাপের ম্যাচে তিনি ৪২ বলে ৭৫ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন এবং দলকে জয়ের পথে এগিয়ে নিয়ে যান। অধিনায়ক না হয়েও তিনি দলের প্রাণভোমরা হিসেবে কাজ করেছেন। কঠিন পরিস্থিতিতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতাই তাঁকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে।
আজও সমর্থকদের কাছে তিনি ‘কিং কোহলি’, যিনি ম্যাচের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করে দলের জয় নিশ্চিত করতে পারেন।
বিরাট কোহলির ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী আরসিবি সিইও। তাঁর মতে, কোহলির ফিটনেস, মানসিক দৃঢ়তা এবং ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা এখনও আগের মতোই অটুট রয়েছে।
রাজেশ মেনন বলেন, “আমি নিশ্চিত, বিরাট আগামী তিন থেকে চার বছর অনায়াসে খেলতে পারবে। ওর ফিটনেস অসাধারণ। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ওর জয়ের ক্ষুধা কখনও কমে না। এবারের আইপিএলেও আমরা সেটা দেখেছি। ও দারুণ ছন্দে ছিল এবং ধারাবাহিকভাবে রান করেছে।”
এই মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, আরসিবি কর্তৃপক্ষ এখনও কোহলিকে দলের ভবিষ্যতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবেই দেখছে।
২০২৬ মরশুম শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন একটি বার্তা শেয়ার করেছিলেন বিরাট কোহলি। সেখানে তিনি লিখেছিলেন যে মৌসুমের শুরুতে দল বিশ্বাস নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল এবং শেষ পর্যন্ত টানা দুটি শিরোপা জিতে সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রেখেছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, দলটি নানা বাধা, চাপ এবং প্রতিকূলতা অতিক্রম করে সাফল্যের শিখরে পৌঁছেছে। সেই কারণেই আরসিবিকে তিনি নিজের “বাড়িঘর” বলে মনে করেন।
কোহলির এই মন্তব্য তাঁর এবং ফ্র্যাঞ্চাইজিটির মধ্যকার গভীর আবেগের সম্পর্ককে আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরে।
শুধু আবেগ নয়, পারফরম্যান্সের দিক থেকেও বিরাট কোহলি এখনও বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যাটার। সর্বশেষ আইপিএল মৌসুমে তিনি ১৬ ম্যাচে ৬৭৫ রান সংগ্রহ করেন।
তাঁর গড় ছিল ৫৬.২৫ এবং স্ট্রাইক রেট ছিল প্রায় ১৬৬। আধুনিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এই পরিসংখ্যান যে কোনও ব্যাটারের জন্য ঈর্ষণীয়।
শুধু আইপিএল নয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও তিনি দুর্দান্ত ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন। গত বছরে ১৩টি একদিনের ম্যাচে তিনি ৬৫১ রান করেন। এই সময়ে তাঁর ব্যাট থেকে আসে তিনটি সেঞ্চুরি এবং চারটি অর্ধশতক।
এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে বয়স বাড়লেও তাঁর ব্যাটিং দক্ষতা বা ম্যাচ জেতানোর ক্ষমতা এতটুকু কমেনি।
বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করলে বিরাট কোহলির অবসর নিয়ে জল্পনা এখনও অনেকটাই অনুমাননির্ভর। তাঁর ফিটনেস, পারফরম্যান্স এবং খেলার প্রতি আবেগ দেখলে মনে হয়, তিনি এখনও কয়েক বছর শীর্ষ পর্যায়ে ক্রিকেট খেলে যেতে পারবেন।
আরসিবি সিইওর বক্তব্যও সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। পাশাপাশি কোহলির নিজের কথাতেও স্পষ্ট, আরসিবির প্রতি তাঁর ভালোবাসা এবং প্রতিশ্রুতি এখনও অটুট।
বিরাট কোহলি এবং রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর সম্পর্ক ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম আবেগঘন অধ্যায়। অবসর নিয়ে জল্পনা থাকলেও বাস্তবতা হলো, কোহলি এখনও ফিট, ফর্মে আছেন এবং দলের জন্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আরসিবি কর্তৃপক্ষও বিশ্বাস করে, আগামী কয়েক বছর তিনি মাঠে নিজের সেরাটা উপহার দেবেন।
তাই আপাতত আইপিএল থেকে কোহলির বিদায়ের সম্ভাবনার চেয়ে তাঁর আরও সাফল্যের গল্প দেখার অপেক্ষায় রয়েছে কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমী। তাঁর ব্যাটে ভর করেই হয়তো আরসিবি ভবিষ্যতেও নতুন ইতিহাস রচনা করবে।

