বিশ্বকাপের মতো আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসর শুধুমাত্র ফুটবলের প্রতিযোগিতা নয়, বরং এটি বিশ্বব্যাপী সংযোগ, ঐক্য এবং ক্রীড়াসুলভ চেতনার প্রতীক। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অভিবাসন নীতিকে ঘিরে একের পর এক বিতর্ক সামনে আসছে। এর আগে ইরান জাতীয় ফুটবল দলকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, এবার একই ধরনের সমস্যায় পড়েছে দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম শক্তিশালী দল উরুগুয়ে।
সৌদি আরবের বিপক্ষে নিজেদের প্রথম ম্যাচের মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগে পর্যন্তও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি পায়নি উরুগুয়ে দল। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতি।
ম্যাচের আগ মুহূর্তেও মেক্সিকোতে আটকে উরুগুয়ে
মঙ্গলবার ভারতীয় সময় রাত ৩টা ৩০ মিনিটে ফ্লোরিডায় সৌদি আরবের বিপক্ষে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করার কথা ছিল উরুগুয়ের। কিন্তু ম্যাচের একদিন আগেও দলটি মেক্সিকোতেই অবস্থান করছিল। প্রয়োজনীয় অনুমোদন না পাওয়ায় তারা যুক্তরাষ্ট্রে যাত্রা করতে পারেনি।
উরুগুয়ে ফুটবল ফেডারেশন এক বিবৃতিতে জানায়, পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। প্রশাসনিক জটিলতার কারণে দল এখনও মেক্সিকোতে অবস্থান করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে রওনা দেওয়ার কোনো চূড়ান্ত নির্দেশনা পায়নি।
সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফ হোটেলেই অবস্থান করছেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। নতুন ভ্রমণসূচি নিশ্চিত হওয়ার পরই দলটি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে।
নথিপত্রের জটিলতাই মূল কারণ
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, উরুগুয়ে ফুটবল দল যে নথিপত্র জমা দিয়েছিল, তাতে কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঘাটতি ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অভিবাসন নীতির আওতায় নির্ধারিত সব নথি জমা না দিলে দেশটিতে প্রবেশের অনুমতি পাওয়া যায় না।
এই প্রশাসনিক ত্রুটির কারণেই উরুগুয়ে দলের ভিসা ও প্রবেশ অনুমোদন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়েছে বলে জানা গেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে এবং বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে দলটিকে দ্রুত ফ্লোরিডায় পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তবে ম্যাচের এত কাছাকাছি সময়ে এমন অনিশ্চয়তা খেলোয়াড়দের মানসিক প্রস্তুতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন ক্রীড়া বিশ্লেষকরা।
ইরান দলকেও ভোগাতে হয়েছিল একই সমস্যা
উরুগুয়ের ঘটনা এই প্রথম নয়। এর আগেও বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতি নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছিল।
ইরান জাতীয় ফুটবল দলের প্রাথমিক ক্যাম্প যুক্তরাষ্ট্রে আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির কারণে সেই পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয় দলটি। শেষ পর্যন্ত তাদের প্রস্তুতি শিবির মেক্সিকোতে স্থানান্তর করা হয়।
শুধু তাই নয়, যুক্তরাষ্ট্রে ম্যাচ খেলার পর ইরান দলকে স্বল্প সময়ের মধ্যেই দেশ ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলেও বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ ওঠে।
সোমালিয়ার রেফারিকেও প্রবেশে বাধা
এই বিতর্কের তালিকায় রয়েছে সোমালিয়ার আন্তর্জাতিক রেফারি ওমার আর্টানের ঘটনাও। মায়ামি বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তাঁকে প্রায় ১১ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
পরবর্তীতে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি না দিয়ে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়। যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, কয়েকটি জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ থাকতে পারে।
তবে ওমার আর্টান এসব অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেন এবং এগুলোকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন। এই ঘটনাও আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি নিয়ে বাড়ছে সমালোচনা
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনিক সময়কাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতি বিশ্বজুড়ে বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে। নিরাপত্তার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বললেও সমালোচকদের মতে, এসব নীতি অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক ক্রীড়া আয়োজনের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
বিশ্বকাপের মতো বহুজাতিক টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণকারী দল, কর্মকর্তা এবং রেফারিদের জন্য সহজ ও সমন্বিত প্রবেশ ব্যবস্থা থাকা জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। অন্যথায় প্রতিযোগিতার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
উরুগুয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি দল ম্যাচের ঠিক আগ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রবেশ অনুমতি না পাওয়ায় সেই উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে।
বিশ্বকাপ আয়োজনে নতুন প্রশ্ন
বিশ্বকাপ আয়োজনের ক্ষেত্রে আয়োজক দেশের অন্যতম দায়িত্ব হলো অংশগ্রহণকারী সব দল ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্বিঘ্ন প্রবেশ নিশ্চিত করা। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই সক্ষমতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছে।
ইরান, সোমালিয়ার রেফারি ওমার আর্টান এবং সর্বশেষ উরুগুয়ের ঘটনাগুলো প্রমাণ করছে যে অভিবাসন নীতির কঠোর প্রয়োগ আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার জন্যও বিষয়টি উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে আয়োজক দেশগুলোর সঙ্গে আরও কার্যকর সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
উরুগুয়ে দলের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বিলম্ব শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে অভিবাসন নীতির প্রভাব নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসরে খেলোয়াড়দের মনোযোগ মাঠের খেলায় সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। কিন্তু বারবার ভিসা জটিলতা ও প্রবেশ বাধা সেই স্বাভাবিক পরিবেশকে বিঘ্নিত করছে।
এখন দেখার বিষয়, উরুগুয়ে দ্রুত এই জটিলতা কাটিয়ে মাঠে নামতে পারে কি না এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

