বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রতিটি ম্যাচই ইতিহাস গড়ার সুযোগ। আর সেই ইতিহাসের পথে যাত্রা শুরুর আগে ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইন তার সতীর্থদের স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—ভয় নয়, আত্মবিশ্বাস নিয়েই খেলতে হবে। কোনো আফসোস যেন শেষে না থাকে। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচের আগে তিনি দলকে স্বাধীনভাবে এবং আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলার আহ্বান জানিয়েছেন।
ডালাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচকে ঘিরে ইতোমধ্যেই উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। হাজার হাজার ইংল্যান্ড সমর্থক এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামের আশপাশে জড়ো হয়েছেন, তাদের প্রত্যাশা এবার বিশ্বকাপ ট্রফি ঘরে ফেরানো।
হ্যারি কেইনের বার্তা: আফসোস নয়, সাহসী ফুটবল
ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইন মনে করেন, বড় টুর্নামেন্ট শেষে খেলোয়াড়দের সবচেয়ে বড় অনুশোচনা হয় তখনই, যখন তারা নিজেদের সর্বোচ্চটা দিতে পারেন না।
তার মতে, ভুল হওয়া স্বাভাবিক। পেনাল্টি মিস হতে পারে, সুযোগ হাতছাড়া হতে পারে। কিন্তু ভয়ের কারণে নিজের সামর্থ্য পুরোপুরি কাজে না লাগানোই সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।
কেইন বলেছেন, একজন খেলোয়াড় হিসেবে তিনি বরং নিজের সর্বস্ব দিয়ে লড়াই করে হারতে রাজি, কিন্তু সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ঝুঁকি না নিয়ে নিরাপদ খেলে বিদায় নিতে চান না। তার বিশ্বাস, ইংল্যান্ড যদি নির্ভীকভাবে খেলে, তাহলে বিশ্বকাপে অনেক দূর যাওয়ার সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
ট্রফির স্বপ্ন দেখছেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক
বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই সম্ভাব্য সাফল্যের ছবি কল্পনা করা থেকে নিজেকে পুরোপুরি বিরত রাখতে পারছেন না কেইন। তিনি স্বীকার করেছেন, আগামী মাসে ট্রফি হাতে তোলার স্বপ্ন তার মনেও ঘুরপাক খাচ্ছে।
তবে আগের তুলনায় তিনি এখন অনেক বেশি শান্ত এবং পরিণত। সাম্প্রতিক মৌসুমে ক্লাব পর্যায়ে শিরোপা জয়ের অভিজ্ঞতা তাকে আত্মবিশ্বাসী করেছে। শুধু তিনি নন, ইংল্যান্ড দলে এমন অনেক খেলোয়াড় রয়েছেন যারা গত এক বছরে বড় বড় ট্রফি জিতেছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে নিজেদের প্রমাণ করেছেন।
টমাস টুখেলের অধীনে বদলে যাচ্ছে ইংল্যান্ড
ইংল্যান্ডের প্রধান কোচ টমাস টুখেল বিশ্বকাপ শুরুর আগে দলের মানসিকতা পরিবর্তনের ওপর জোর দিচ্ছেন। হ্যারি কেইনের মতে, প্রস্তুতি শিবিরের শুরুতে টুখেল চাপ কম রেখে কাজ করলেও টুর্নামেন্ট যত এগিয়ে এসেছে, ততই তার বক্তব্য ও আচরণে আবেগ এবং তীব্রতা বেড়েছে।
টুখেল এমন একজন কোচ, যিনি নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে দ্বিধা করেন না। তিনি খেলোয়াড়দের মধ্যে জয়ের ক্ষুধা তৈরি করতে চান এবং তাদের মানসিকভাবে আরও শক্তিশালী করে তুলতে কাজ করছেন।
কেইন মনে করেন, বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে এই আবেগ এবং কঠোর মানসিকতা দলকে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।
ধৈর্যের আহ্বান জানালেন কেইন
ইংল্যান্ডের অধিনায়ক সমর্থকদেরও ধৈর্য ধরার অনুরোধ জানিয়েছেন। তার মতে, বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ সবসময় প্রত্যাশামতো নাও হতে পারে।
তিনি বলেছেন, সবাই জয় দিয়ে শুরু করতে চায়, গোল করতে চায় এবং দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখাতে চায়। কিন্তু ফুটবল সবসময় পরিকল্পনা অনুযায়ী চলে না। একটি ম্যাচের ফল বা পারফরম্যান্স দেখে পুরো টুর্নামেন্ট সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া ঠিক হবে না।
বিশ্বকাপে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হলে ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস এবং ধারাবাহিকতা জরুরি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
শক্তিশালী ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে বড় পরীক্ষা
বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ সারির দলগুলোর একটি ক্রোয়েশিয়া। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় টুর্নামেন্টে ধারাবাহিকভাবে ভালো পারফরম্যান্স করে আসছে তারা।
তাই উদ্বোধনী ম্যাচেই ইংল্যান্ডের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। তবে টমাস টুখেল মনে করেন, তার দল এই পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত।
দায়িত্ব নেওয়ার পর এখন পর্যন্ত শীর্ষ ২০ দলের বিপক্ষে ইংল্যান্ড খুব একটা সফল হতে পারেনি। সেনেগাল এবং জাপানের বিপক্ষে পরাজয়ের পাশাপাশি উরুগুয়ের সঙ্গে ড্র করতে হয়েছে তাদের।
তবে টুখেলের দাবি, প্রতিযোগিতামূলক টুর্নামেন্ট শুরু হলে তার দলের প্রকৃত শক্তি দেখা যাবে।
আক্রমণাত্মক একাদশ নিয়ে মাঠে নামার প্রস্তুতি
ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে আক্রমণাত্মক কৌশল গ্রহণ করতে যাচ্ছেন টুখেল। ধারণা করা হচ্ছে, আক্রমণভাগে হ্যারি কেইন, জুড বেলিংহ্যাম, অ্যান্থনি গর্ডন এবং ননি মাদুয়েকে একসঙ্গে খেলবেন।
কোচের বিশ্বাস, তার খেলোয়াড়রা ক্লাব পর্যায়ে যে ধরনের সাহসী এবং গতিময় ফুটবল খেলে, জাতীয় দলেও একই ধরনের ফুটবল খেলতে পারবে।
তিনি মনে করেন, খেলোয়াড়দের স্বাভাবিক শক্তিকে কাজে লাগাতে পারলেই ইংল্যান্ড আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। বিশেষ করে ইউরোপের শীর্ষ লিগ এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলার অভিজ্ঞতা তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে।
সমর্থকদের সঙ্গে সংযোগ গড়তে চান টুখেল
টমাস টুখেলের মতে, বড় সাফল্য অর্জনের জন্য শুধু মাঠের খেলাই যথেষ্ট নয়। সমর্থকদের সঙ্গে আবেগের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বিশ্বাস করেন, স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজারো সমর্থক এবং দেশের কোটি কোটি দর্শকের সমর্থন খেলোয়াড়দের বাড়তি অনুপ্রেরণা জোগাবে। বড় ম্যাচের পরিবেশ এবং দর্শকদের উচ্ছ্বাস দলকে নিজেদের সেরাটা দিতে সাহায্য করবে।
ইনজুরিতে ধাক্কা, ছিটকে গেলেন টিনো লিভরামেন্তো
বিশ্বকাপ শুরুর আগেই ইংল্যান্ড শিবিরে এসেছে একটি দুঃসংবাদ। অনুশীলনের সময় কাফ মাসলে চোট পেয়েছেন ফুল-ব্যাক টিনো লিভরামেন্তো।
স্ক্যানে তার পেশিতে মৃদু চিড় ধরা পড়েছে। ফলে অন্তত কয়েক সপ্তাহ মাঠের বাইরে থাকতে হবে তাকে। চিকিৎসার জন্য তিনি ক্লাবে ফিরে যাবেন।
তার পরিবর্তে দলে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে চেলসির ডিফেন্ডার ট্রেভোহ চালোবার।
ইংল্যান্ডের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক অনুভব করেন টুখেল
জার্মান কোচ টমাস টুখেল জানিয়েছেন, তিনি নিজেকে অনেকটাই “দত্তক ইংরেজ” মনে করেন।
চেলসির কোচ হিসেবে ইংল্যান্ডে আসার পর থেকেই দেশটির সংস্কৃতি, ফুটবল পরিবেশ এবং মানুষের প্রতি তার আলাদা ভালোবাসা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, লন্ডন এখন তার কাছে বাড়ির মতোই মনে হয়।
ইংল্যান্ড জাতীয় দলের কোচ হওয়াকে তিনি জীবনের অন্যতম বড় সম্মান হিসেবে দেখছেন এবং এই দায়িত্বকে সফল করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন।
বিশ্বকাপ মিশনের শুরুতেই নজর থাকবে ইংল্যান্ডের দিকে
ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে এই ম্যাচ শুধু একটি গ্রুপ পর্বের লড়াই নয়, বরং পুরো বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের সম্ভাবনার প্রথম বড় পরীক্ষা। হ্যারি কেইনের নেতৃত্ব, টমাস টুখেলের কৌশল এবং প্রতিভাবান স্কোয়াড নিয়ে থ্রি লায়ন্স এবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখছে।
এখন দেখার বিষয়, উদ্বোধনী ম্যাচে তারা সেই আত্মবিশ্বাসী ও আক্রমণাত্মক ফুটবল উপহার দিতে পারে কি না, যার কথা কেইন ও টুখেল বারবার বলেছেন। যদি পারে, তাহলে বিশ্বকাপের অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে খুব বেশি সময় লাগবে না।

