খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeএক্সক্লুসিভকৃষকের বন্ধু গুইসাপ! ৫০ কেজির দানব কীভাবে পরিবেশ বাঁচাচ্ছে

কৃষকের বন্ধু গুইসাপ! ৫০ কেজির দানব কীভাবে পরিবেশ বাঁচাচ্ছে

প্রাণিবিজ্ঞানীদের মতে, গুইসাপ খুব শান্ত স্বভাবের প্রাণী। তারা সাধারণত মানুষের আক্রমণ এড়িয়ে চলে। তাদের বাসস্থানও বেশ সাধারণ—মাটির গর্ত, গাছের কোটর, পুরোনো দেয়ালের ফাটল বা পরিত্যক্ত ইটভাটা।

নড়াইলের কিছু এলাকায় এক অদ্ভুত কিন্তু সুন্দর দৃশ্য এখন প্রায় নিয়মিত। জলাশয়ের পাড়ে হঠাৎ তাকালে মনে হতে পারে কুমির ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু একটু কাছে গেলে বোঝা যায়, এগুলো আসলে কুমির নয়—বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী গুইসাপ। বিশাল আকৃতির এই প্রাণীগুলো গত দুই দশক ধরে দলবদ্ধভাবে মানুষের আশপাশেই বসবাস করছে। মানুষের সঙ্গে এদের এমন এক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, যা আমাদের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য দারুণ আশাব্যঞ্জক।

নড়াইলের বিভিন্ন জলাশয়ের পাড়জুড়ে প্রায় অর্ধশত গুইসাপ নির্ভয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এদের মধ্যে অনেকের ওজন ৪০ থেকে ৫০ কেজি পর্যন্ত। বড়সড় শরীর, লম্বা লেজ আর ধীর গতির চলাফেরা দেখে অনেকেই প্রথমে ভয় পেয়ে যায়। কিন্তু স্থানীয়রা জানেন—এই প্রাণীগুলো ক্ষতিকর নয়।

গুইসাপগুলো দলবেঁধে বাজার, বাড়ির উঠান, ঝোপঝাড় এমনকি ময়লার ভাগাড়েও চলে আসে। খাবারের খোঁজেই মূলত তাদের এই চলাফেরা। আশ্চর্যের বিষয় হলো, মানুষের এত কাছাকাছি থাকলেও তারা কখনো আক্রমণাত্মক আচরণ করে না।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মানুষ ও গুইসাপের মধ্যে এক ধরনের অদ্ভুত বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা এখন আর তাদের ভয় পান না। বরং অনেকেই তাদের এলাকার “অপরিচিত বন্ধু” হিসেবে দেখেন।

আরও পড়ুন :  ৫০০ বছর আগে বিলুপ্ত জায়ান্ট মোয়া ফিরতে পারে পৃথিবীতে! কৃত্রিম ডিম ফুটে জন্ম নিল ২৪টি ছানা

কারণটা সহজ। এই প্রাণীগুলো মানুষের কোনো ক্ষতি করে না। কারো গরু-ছাগল বা হাঁস-মুরগির ওপরও তারা আক্রমণ চালায় না। বরং আশপাশ পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। ফলে মানুষও তাদের বিরক্ত করে না, বরং সহাবস্থানে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।

একটু ভেবে দেখো—আমরা প্রতিদিন কত রকম আবর্জনা ফেলে দিই। বাজারের পচা মাছ, মরা মুরগি, জবাইয়ের নাড়িভুঁড়ি—এসব যদি পড়ে থাকে, তাহলে দুর্গন্ধ আর রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি বেড়ে যায়।

এখানেই গুইসাপের আসল কাজ। তারা এসব পচা-গলা জিনিস খেয়ে পরিবেশ পরিষ্কার রাখে। একভাবে বললে, তারা যেন প্রাকৃতিক “ক্লিনার”। ফলে বাজার কিংবা বাড়ির আশপাশে দুর্গন্ধ কমে এবং পরিবেশ তুলনামূলকভাবে স্বাস্থ্যকর থাকে।

প্রাণিবিজ্ঞানীদের মতে, গুইসাপ খুব শান্ত স্বভাবের প্রাণী। তারা সাধারণত মানুষের আক্রমণ এড়িয়ে চলে। তাদের বাসস্থানও বেশ সাধারণ—মাটির গর্ত, গাছের কোটর, পুরোনো দেয়ালের ফাটল বা পরিত্যক্ত ইটভাটা।

Images 10000 01

এরা দিবাচর প্রাণী, মানে দিনে বেশি সক্রিয় থাকে। দিনের আলোতেই তারা খাবারের খোঁজে বের হয়। আর রাতে বিশ্রাম নেয় নিরাপদ জায়গায়।

খাবারের তালিকায় রয়েছে মৃত প্রাণী, ব্যাঙ, কাঁকড়া, শামুক, এমনকি সাপ ও সাপের ডিমও। এই খাদ্যাভ্যাসই তাদের পরিবেশের জন্য এত উপকারী করে তুলেছে।

আরও পড়ুন :  লুক্সেমবার্গে রোমান যুগের বিরল স্বর্ণমুদ্রার খোঁজ, ইতিহাসবিদদের মধ্যে তুমুল উচ্ছ্বাস

বাংলাদেশে সাধারণত তিন ধরনের গুইসাপ দেখা যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো রামগদি বা কালো গুইসাপ। এটি দৈর্ঘ্যে ৮ থেকে ৯ ফুট পর্যন্ত হতে পারে এবং ওজন প্রায় ৪০ কেজি।

এই বিশাল আকৃতির কারণে অনেকেই প্রথমে ভয় পেয়ে যান। কিন্তু বাস্তবে তারা মানুষের জন্য হুমকি নয়। বরং প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

গুইসাপ কমে গেলে কী হতে পারে, সেটা একটু ভাবো। তখন ইঁদুরের সংখ্যা বেড়ে যাবে, ফসলের ক্ষতি বাড়বে। একই সঙ্গে বিষাক্ত সাপের সংখ্যাও বাড়তে পারে।

কারণ গুইসাপ এসব প্রাণী খেয়ে তাদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখে। তাই কৃষকদের জন্য তারা এক ধরনের অদৃশ্য সহায়ক। অনেকেই গুইসাপকে “কৃষকের বন্ধু” বলেও ডাকেন।

গুইসাপ সাঁতারে দারুণ দক্ষ। তাই তাদের বেশিরভাগ সময় জলাভূমির আশপাশেই দেখা যায়। নদী, খাল, বিল কিংবা পুকুর—এসব জায়গা তাদের প্রিয় আবাসস্থল।

জলাশয়ের কাছাকাছি থাকায় তারা সহজেই খাবার পায় এবং নিরাপদে থাকতে পারে। তাই যেখানে জলাভূমি আছে, সেখানেই গুইসাপের উপস্থিতি বেশি দেখা যায়।

গুইসাপকে বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। কোথাও বলা হয় তারবেল, কোথাও গুইল, আবার কোথাও ঘইড়াল। নাম আলাদা হলেও প্রাণীটি একই।

আরও পড়ুন :  মানুষ কি ১৭ লক্ষ বছর আগেই আগুন ব্যবহার করত? নতুন গবেষণায় চাঞ্চল্যকর দাবি!

এই ভিন্ন নামগুলোই প্রমাণ করে, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গুইসাপের উপস্থিতি অনেক পুরোনো এবং মানুষের সঙ্গে তাদের সম্পর্কও দীর্ঘদিনের।

যদিও নড়াইলে গুইসাপ এখনো দেখা যায়, কিন্তু দেশের অনেক জায়গায় তাদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। বন উজাড়, আবাসস্থল ধ্বংস এবং মানুষের অজ্ঞতার কারণে তারা বিলুপ্তির পথে।

প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার জন্য গুইসাপকে বাঁচিয়ে রাখা খুবই জরুরি। তারা না থাকলে পরিবেশে অনেক সমস্যা তৈরি হবে—যেমন রোগজীবাণুর বিস্তার, ফসলের ক্ষতি এবং প্রাণবৈচিত্র্যের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া।

নড়াইলের গুইসাপগুলো আমাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। মানুষ আর বন্যপ্রাণী চাইলে একসঙ্গে শান্তিতে থাকতে পারে। শুধু দরকার একটু সচেতনতা আর সহনশীলতা।

ভাবো তো, আমরা যদি সব প্রাণীর সঙ্গে এমন সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারতাম, তাহলে আমাদের পরিবেশ কত সুন্দর হতো! গুইসাপ শুধু একটি প্রাণী নয়—এটা প্রকৃতির এক নীরব রক্ষক, যে আমাদের অজান্তেই প্রতিদিন কাজ করে যাচ্ছে।

তাই তাদের রক্ষা করা মানে আমাদের নিজেদের ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আর্কাইভ