বিশ্বকাপ মানেই চাপ, প্রত্যাশা আর সমালোচনার ঝড়। প্রথম ম্যাচে হতাশার পর অনেকেই ধরে নিয়েছিল স্পেন হয়তো এবার ছন্দ খুঁজে পাবে না। কিন্তু ফুটবল এমনই খেলা—এক ম্যাচেই গল্প বদলে যায়। আর সেই গল্পটাই যেন লিখে দিল ১৯ বছরের এক তরুণ—লামিনে ইয়ামাল।
প্রথম ম্যাচে ড্র করার পর যে দলটা সমালোচনায় ডুবে ছিল, সেই স্পেনই দ্বিতীয় ম্যাচে পুরো অন্য রূপে হাজির হলো। প্রতিপক্ষ সৌদি আরব যেন শুরু থেকেই বুঝে গেল, তারা ভুল সময় ভুল জায়গায় এসে পড়েছে। শেষ পর্যন্ত ৪-০ গোলের জয়ে শুধু তিন পয়েন্টই পেল না স্পেন, ফিরে পেল আত্মবিশ্বাসও।
ম্যাচের শুরুতেই বোঝা গেল, আজ স্পেন অন্য কিছু করতে এসেছে। আর সেই আক্রমণের কেন্দ্রেই ছিল ইয়ামাল। ম্যাচের মাত্র ১০ মিনিটে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন তিনি। মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ তৈরি হয়, বল ঘুরে যায় উইংয়ে, আর নিখুঁত পাস পেয়ে এক ঝটকায় জালে বল জড়িয়ে দেন এই তরুণ তারকা।
দেখে মনে হচ্ছিল, পুরো ডিফেন্স লাইন যেন তার গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। যদিও পুরোপুরি ফিট না, তবুও মাঠে নামার পর তার উপস্থিতিই খেলার গতি বদলে দেয়। এটা এমন—যেমন তুমি খেলায় একজন ভালো খেলোয়াড় নামালেই পুরো টিম হঠাৎ আত্মবিশ্বাস পেয়ে যায়।
প্রথম ম্যাচের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছিলেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। তিনি বুঝেছিলেন, শুধু বল দখলে রাখলেই হবে না, দরকার গতি আর আক্রমণে বৈচিত্র্য। তাই একাধিক পরিবর্তন আনেন তিনি।
উইংয়ে গতিশীলতা বাড়াতে নতুন মুখ আনা হয়। মাঝমাঠে এমন খেলোয়াড় রাখা হয়, যারা একাধিক পজিশনে খেলতে পারে। এর ফলে খেলার ধরণ বদলে যায় পুরোপুরি। আগের ধীরগতির পাসিংয়ের বদলে আসে দ্রুত আক্রমণ।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হয় ইয়ামালের জন্য। তিনি উইং থেকে বারবার ডিফেন্ডারদের টেনে আনেন। ফলে বক্সের ভেতরে জায়গা তৈরি হয়। আর সেই ফাঁকা জায়গা কাজে লাগিয়ে গোলের সুযোগ তৈরি হতে থাকে একের পর এক।
ইয়ামালের তৈরি করা জায়গা সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগান মিকেল ওয়ারজাবাল। ২১ মিনিটে কর্নার থেকে গোল করে ব্যবধান বাড়ান তিনি। এরপর মাত্র তিন মিনিটের ব্যবধানে আবারও গোল।
এখানে একটা জিনিস পরিষ্কার ছিল—আগের ম্যাচে যাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না, আজ সে পুরো খেলার কেন্দ্রবিন্দু। কারণ এবার তার চারপাশে জায়গা ছিল, সময় ছিল, আর ছিল আত্মবিশ্বাস।
ওয়ারজাবালের খেলাটা অনেকটা এমন—যখন তুমি ভিড়ের মধ্যে আটকে থাকো, তখন কিছুই করতে পারো না। কিন্তু একটু জায়গা পেলেই তুমি নিজের মতো খেলতে পারো। ঠিক সেটাই হয়েছে এখানে।
প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগেই স্কোরলাইন ৩-০। তখনই বোঝা যাচ্ছিল, ম্যাচ স্পেনের পকেটে চলে গেছে। সৌদি আরব চেষ্টা করছিল, কিন্তু তাদের ডিফেন্স বারবার ভেঙে পড়ছিল।
স্পেনের আক্রমণ থামানোর মতো কোনো পরিকল্পনা যেন তাদের ছিল না। আর যখনই ইয়ামাল বল পেতেন, তখনই দুই-তিনজন ডিফেন্ডার তাকে ঘিরে ধরত। এতে অন্য জায়গা ফাঁকা হয়ে যেত, আর সেখান থেকেই আক্রমণ হতো।
দ্বিতীয়ার্ধ শুরুতেই কোচ ইয়ামালকে তুলে নেন। কারণ তিনি পুরোপুরি ফিট ছিলেন না। ঝুঁকি না নিয়ে তাকে বিশ্রাম দেওয়া হয়। ওয়ারজাবালও হ্যাটট্রিকের সুযোগ না নিয়েই মাঠ ছাড়েন।
তবুও স্পেনের আক্রমণ থামেনি। ৪৯ মিনিটে আসে চতুর্থ গোল। একটি হেড ক্লিয়ার করতে গিয়ে সৌদির ডিফেন্ডার নিজের জালেই বল পাঠিয়ে দেন। এতে ব্যবধান দাঁড়ায় ৪-০।
এরপরও স্পেন একের পর এক আক্রমণ চালায়। কিন্তু আর গোল আসেনি। কয়েকটি সুযোগ নষ্ট হয়, একটি গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হয়।
এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় আলোচনার জায়গা হলো—স্পেন কতটা ইয়ামালের উপর নির্ভর করছে। তিনি মাঠে থাকলে দল একরকম, না থাকলে আরেকরকম।
এটা একটু চিন্তার বিষয়ও। কারণ বড় টুর্নামেন্টে শুধু একজনের উপর নির্ভর করলে ঝুঁকি থাকে। তবে ইতিবাচক দিক হলো—এই তরুণ ইতিমধ্যেই প্রমাণ করে দিয়েছে, সে বড় মঞ্চে পারফর্ম করতে পারে।
ভাবো, ১৯ বছর বয়সে তুমি যদি এমন চাপের মধ্যে থেকেও ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতে পারো—তাহলে সেটা কত বড় ব্যাপার!
এই জয়ের পর স্পেন অবশ্যই আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে। কিন্তু সামনে আরও কঠিন ম্যাচ আসবে। সেখানে শুধু একজন নয়, পুরো দলকে ভালো খেলতে হবে।
বিশেষ করে আক্রমণে ধারাবাহিকতা দরকার। কারণ এই ম্যাচে সুযোগ তৈরি হলেও সবগুলো কাজে লাগানো যায়নি। বড় দলের বিরুদ্ধে এই ভুলগুলো মারাত্মক হতে পারে।
একটা খারাপ ম্যাচের পর কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয়, তার দারুণ উদাহরণ দেখাল স্পেন। আর সেই গল্পের নায়ক নিঃসন্দেহে লামিনে ইয়ামাল।
এই ম্যাচ শুধু একটা জয় নয়, এটা একটা বার্তা—স্পেন এখনো ফুরিয়ে যায়নি। বরং নতুন প্রজন্ম নিয়ে তারা আবারও বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখছে।
এখন দেখার বিষয়, এই ছন্দ তারা ধরে রাখতে পারে কি না। কারণ বিশ্বকাপে এক ম্যাচে নয়, ধারাবাহিক পারফরম্যান্সই শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন বানায়।

