বিশ্বকাপের মঞ্চে অবশেষে দেখা মিলল সেই পরিচিত, ভয়ঙ্কর ও আত্মবিশ্বাসী স্পেনের। প্রথম ম্যাচে হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পর সমর্থকদের মনে অনেক প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচেই যেন সব উত্তর একসঙ্গে দিয়ে দিল স্প্যানিশরা। তরুণ তারকা ইয়ামালের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স এবং মিকেল ওয়ারজাবালের জোড়া গোলে সৌদি আরবকে ৪-০ ব্যবধানে হারিয়ে শক্তিশালী প্রত্যাবর্তনের বার্তা দিল স্পেন।
প্রথম ম্যাচে কাবো ভার্দের বিপক্ষে স্পেন নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দ খুঁজে পায়নি। বলের দখল ও আক্রমণে আধিপত্য থাকলেও গোলের সামনে ছিল অসহায় অবস্থা। ফলে সমর্থকদের হতাশা ছিল তুঙ্গে।
তবে দ্বিতীয় ম্যাচে মাঠে নেমেই এক ভিন্ন স্পেনকে দেখা গেল। শুরু থেকেই তারা আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে। দ্রুত পাস, উইং ব্যবহার এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণে নিরন্তর চাপ—সবকিছু মিলিয়ে শুরু থেকেই ম্যাচ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় স্পেন।
স্পেন কোচ লুই দে লা ফুয়েন্তে এ ম্যাচে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনেন। আর সেই সিদ্ধান্তই যেন বদলে দেয় ম্যাচের চিত্র।
তরুণ ফুটবলার ইয়ামালকে প্রথম একাদশে সুযোগ দেওয়া হয়। ম্যাচের শুরু থেকেই তিনি নিজের উপস্থিতি জানান দিতে শুরু করেন। ডান দিক থেকে দ্রুত গতিতে এগিয়ে এসে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের বারবার সমস্যায় ফেলেন।
ম্যাচের মাত্র ১০ মিনিটে আসে প্রথম গোল। আলেক্স বায়েনার তৈরি করা আক্রমণ থেকে মিকেল ওয়ারজাবাল একটি নিখুঁত ক্রস দেন। সঠিক জায়গায় অবস্থান নেওয়া ইয়ামাল দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে বল জালে পাঠান।
গোলের পরেও থামেননি তিনি। তাঁর প্রতিটি আক্রমণেই মনে হচ্ছিল যে স্পেন আবার গোল পেতে পারে। এমনকি সৌদির গোলরক্ষকও তাঁর একটি চমৎকার শট দুর্দান্ত দক্ষতায় প্রতিহত করেন।
এই ম্যাচ ওয়ারজাবালের জন্যও ছিল নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ।
আগের ম্যাচে তিনি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। কিন্তু সৌদি আরবের বিপক্ষে একেবারে অন্য রূপে দেখা গেল তাঁকে। প্রথম ৩০ মিনিটেই দুটি গোল করার পাশাপাশি একটি অ্যাসিস্টও করেন তিনি।
আক্রমণে তাঁর গতি, বল নিয়ন্ত্রণ এবং গোলের সামনে ঠাণ্ডা মাথার সিদ্ধান্ত স্পেনের জন্য বড় শক্তি হয়ে দাঁড়ায়। কিছুটা ভাগ্য সহায় হলে তিনি সহজেই হ্যাটট্রিকও করতে পারতেন।
শুরু থেকেই স্পেন যে গতিতে আক্রমণ করছিল, তাতে গোল আসাটা ছিল সময়ের অপেক্ষা।
প্রথম গোলের পর স্পেনের আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে যায়। দ্রুত আরও দুটি গোল করে প্রথমার্ধেই কার্যত ম্যাচ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় তারা।
সৌদি আরবও চেষ্টা করেছে পাল্টা আক্রমণে যাওয়ার। তবে স্পেনের সংগঠিত রক্ষণভাগ তাদের কোনো সুযোগই তৈরি করতে দেয়নি।
দ্বিতীয়ার্ধে আরও একটি গোল যোগ হলে স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৪-০।
কোচ লুই দে লা ফুয়েন্তের পরিবর্তনগুলো ম্যাচে বড় ভূমিকা রাখে।
পেদ্রো পোরো, দানি অলমো এবং আলেক্স বায়েনাকে মাঠে নামানো স্পেনের আক্রমণে নতুন গতি নিয়ে আসে। বিশেষ করে মাঝমাঠ থেকে দ্রুত বল সরবরাহের কারণে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স বারবার ভেঙে পড়ে।
যে দল আগের ম্যাচে আক্রমণে ব্যর্থ হয়েছিল, সেই দলই এবার প্রতিপক্ষকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে।
এই জয় স্পেনের জন্য শুধু তিন পয়েন্ট নয়, আত্মবিশ্বাস ফেরানোরও বড় উপলক্ষ।
প্রথম ম্যাচের পর দলটির ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই কমে গেছে। যদিও নকআউট পর্ব নিশ্চিত করতে এখনও অপেক্ষা করতে হবে পরবর্তী ম্যাচ পর্যন্ত।
পরের ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ উরুগুয়ে, যাদের গ্রুপের সবচেয়ে কঠিন দল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে ফুটবল ইতিহাস বলছে, ধীরে শুরু করেও বড় সাফল্য পাওয়া সম্ভব। ২০১০ বিশ্বকাপেও স্পেন প্রথম ম্যাচে হেরে শুরু করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ট্রফি জিতেছিল।
এবারও যদি সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
স্পেনের এই জয় শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়, বরং শক্তিশালী প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা। ইয়ামালের মতো তরুণ প্রতিভার উত্থান এবং দলের সামগ্রিক উন্নতি স্পেনকে নতুন আশা দেখাচ্ছে।
এখন দেখার বিষয়, তারা কি এই ধারাবাহিকতা ধরে রেখে বিশ্বকাপের শিরোপার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারে।

