খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img

শাপলা চত্বর থেকে পরীমণি কাণ্ড! বেনজীর আহমেদের আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায়

বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ইতিহাসে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের নাম দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। ক্ষমতা, প্রভাব, বিতর্ক এবং সাম্প্রতিক দুর্নীতির অভিযোগ—সবকিছু মিলিয়ে...
Homeফুটবলফিফা বিশ্বকাপ স্পেশালশরণার্থী শিবির থেকে বিশ্বকাপের নায়ক! নেস্টোরি ইরানকুন্ডার অবিশ্বাস্য জীবনকাহিনি

শরণার্থী শিবির থেকে বিশ্বকাপের নায়ক! নেস্টোরি ইরানকুন্ডার অবিশ্বাস্য জীবনকাহিনি

শরণার্থী জীবনের সীমাবদ্ধতা এবং অনিশ্চয়তার মধ্যেই নেস্টোরির জন্ম। এমন একটি পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুর জন্য আন্তর্জাতিক ফুটবলের মঞ্চে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হয়। কিন্তু নেস্টোরি সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছেন।

অস্ট্রেলিয়ার ফুটবল ইতিহাসে অনেক তারকা এসেছেন, কিন্তু নেস্টোরি ইরানকুন্ডার গল্প অন্য সবার চেয়ে আলাদা। তানজানিয়ার একটি শরণার্থী শিবিরে জন্ম নেওয়া এই তরুণ আজ বিশ্বমঞ্চে আলো ছড়াচ্ছেন। কঠিন শৈশব, সংগ্রাম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে সঙ্গী করে তিনি এমন এক যাত্রা সম্পন্ন করেছেন, যা বিশ্বের লাখো তরুণ ফুটবলারের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে।

শরণার্থী শিবির থেকে শুরু হওয়া জীবন

২০০৬ সালে তানজানিয়ার কিগোমা অঞ্চলের একটি শরণার্থী শিবিরে জন্মগ্রহণ করেন নেস্টোরি ইরানকুন্ডা। তার বাবা-মা গিডিয়ন ও ডাফরোজা ছিলেন বুরুন্ডির নাগরিক। গৃহযুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তারা নিজ দেশ ছেড়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হন।

শরণার্থী জীবনের সীমাবদ্ধতা এবং অনিশ্চয়তার মধ্যেই নেস্টোরির জন্ম। এমন একটি পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুর জন্য আন্তর্জাতিক ফুটবলের মঞ্চে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হয়। কিন্তু নেস্টোরি সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছেন।

অস্ট্রেলিয়ায় নতুন জীবনের সূচনা

শৈশবের শুরুতেই তার পরিবার অস্ট্রেলিয়ার পার্থ শহরে পাড়ি জমায়। পরে তারা অ্যাডিলেডের উত্তরাঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। সেখানেই ফুটবলের প্রতি তার ভালোবাসা জন্ম নেয়।

খুব অল্প বয়স থেকেই তার অসাধারণ গতি, ড্রিবলিং দক্ষতা এবং আক্রমণাত্মক খেলার ধরণ নজর কেড়ে নেয় কোচদের। স্থানীয় পর্যায়ে খেলার পর তিনি যোগ দেন অ্যাডিলেড ইউনাইটেডের যুব একাডেমিতে। সেখানে নিজের প্রতিভার প্রমাণ দিয়ে দ্রুত প্রথম দলে জায়গা করে নেন।

অ্যাডিলেড ইউনাইটেড থেকে ইউরোপের বড় মঞ্চে

অস্ট্রেলিয়ান ফুটবলে আলোড়ন সৃষ্টি করার পর ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর নজরে আসেন ইরানকুন্ডা। শেষ পর্যন্ত জার্মান জায়ান্ট বায়ার্ন মিউনিখ তাকে দলে ভেড়ায়।

বায়ার্নে যোগ দেওয়া ছিল তার ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় অর্জন। যদিও প্রথম দলে নিয়মিত সুযোগ পাওয়া সহজ ছিল না। তিনি রিজার্ভ দলে খেলেছেন, অনুশীলনে নিজেকে আরও পরিণত করেছেন এবং বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন।

এই সময়ে তিনি ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইনের পাশে অনুশীলন করেছেন, তার জন্য ক্রস দিয়েছেন এবং আন্তর্জাতিক মানের ফুটবলের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। একই সঙ্গে এরিক ডায়ারের মতো অভিজ্ঞ ডিফেন্ডারদের বিপক্ষে খেলে নিজের দক্ষতা আরও বাড়িয়েছেন।

ওয়াটফোর্ডে নতুন অধ্যায়

বায়ার্ন মিউনিখে সীমিত সুযোগ পাওয়ার পর ইরানকুন্ডা উপলব্ধি করেন যে নিয়মিত খেলার সুযোগই তার উন্নতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই তিনি সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে ইংল্যান্ডের ক্লাব ওয়াটফোর্ডে যোগ দেন।

এই সিদ্ধান্ত অনেককে অবাক করলেও নেস্টোরির লক্ষ্য ছিল পরিষ্কার—২০২৬ বিশ্বকাপে খেলার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা।

ওয়াটফোর্ডে এসে তিনি দ্রুত নিজের প্রতিভার পরিচয় দেন। মাত্র ২০ বছর বয়সে চারটি গোল ও পাঁচটি অ্যাসিস্ট করে তিনি দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ে পরিণত হন। তার গতি, সৃজনশীলতা এবং গোল করার ক্ষমতা সমর্থকদের মুগ্ধ করে।

বিশ্বকাপে নায়ক হয়ে ওঠার গল্প

বিশ্বকাপের মঞ্চে নেস্টোরি ইরানকুন্ডা নিজের সেরা পারফরম্যান্স উপহার দেন। তুরস্কের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তিনি দলের প্রথম গোলটি করেন এবং অস্ট্রেলিয়াকে ২-০ ব্যবধানে জয় এনে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

ম্যাচের ২৭তম মিনিটে দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণ থেকে করা তার গোলটি দর্শকদের উচ্ছ্বসিত করে তোলে। গোলের পর তার উদযাপনও নজর কাড়ে। হাঁটু গেড়ে স্লাইড করার পর তিনি কর্নার ফ্ল্যাগের পাশে বক্সিং ভঙ্গিতে উদযাপন করেন।

এই উদযাপন ছিল অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি ফুটবলার টিম কাহিলের প্রতি শ্রদ্ধা। ছোটবেলা থেকেই কাহিলকে নিজের আদর্শ হিসেবে দেখে এসেছেন ইরানকুন্ডা।

টিম কাহিল: শৈশবের নায়ক

নেস্টোরি কখনও লুকাননি যে টিম কাহিল তার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে কাহিলের অসাধারণ অবদান তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

তুরস্কের বিপক্ষে গোল করার পর তিনি জানান, গোল উদযাপনের সময় কাহিলের বিখ্যাত স্টাইল অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত আগেই নিয়েছিলেন। কারণ তার বিশ্বাস, অস্ট্রেলিয়ান ফুটবলের ইতিহাসে কাহিল অন্যতম সেরা খেলোয়াড়।

মাইকেল জ্যাকসনের অনুরাগী এক ফুটবলার

ফুটবলের বাইরে নেস্টোরির আরেকটি পরিচয় রয়েছে। তিনি জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী মাইকেল জ্যাকসনের বড় ভক্ত।

মাঠে গোল করার পর মাঝে মাঝে তিনি মাইকেল জ্যাকসনের নাচের ভঙ্গি অনুকরণ করেন। এমনকি একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচে গোল করার সময় তিনি সাদা গ্লাভস পরে মাঠে নেমেছিলেন, যা মাইকেল জ্যাকসনের বিখ্যাত স্টাইলের প্রতি তার ভালোবাসার প্রতীক।

‘অস্ট্রেলিয়ার জুড বেলিংহ্যাম’ উপাধি

নেস্টোরির প্রতিভা দেখে অনেক ফুটবল বিশ্লেষক এবং সাবেক খেলোয়াড় তাকে “অস্ট্রেলিয়ার জুড বেলিংহ্যাম” বলে আখ্যায়িত করেছেন।

তার শৈশবের বন্ধু এবং সহখেলোয়াড় মোহাম্মদ তোরে বিশ্বাস করেন, ইরানকুন্ডার সম্ভাবনা এখনও পুরোপুরি প্রকাশ পায়নি। তোরের মতে, কঠোর পরিশ্রম ও বিনয় বজায় রাখতে পারলে তিনি বর্তমান প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বড় তারকা হয়ে উঠতে পারেন।

তোরে আরও বলেন, তিনি জীবনে অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় দেখেছেন, কিন্তু নেস্টোরির মধ্যে এমন কিছু বিশেষ গুণ রয়েছে যা খুব কম ফুটবলারের মধ্যে দেখা যায়।

বিশ্বজুড়ে তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণা

আজ নেস্টোরি ইরানকুন্ডা শুধু একজন ফুটবলার নন; তিনি আশা, সাহস এবং অধ্যবসায়ের প্রতীক। শরণার্থী শিবিরে জন্ম নেওয়া একটি শিশু যে একদিন বিশ্বকাপের নায়ক হতে পারে, তার জীবন্ত প্রমাণ তিনি।

তার গল্প প্রমাণ করে যে জন্মস্থান বা আর্থিক অবস্থা নয়, বরং কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস এবং স্বপ্ন দেখার সাহসই একজন মানুষকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ইতোমধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গোল করা এই তরুণ তারকা এখনও ক্যারিয়ারের শুরুতেই আছেন। ফুটবলবিশ্বের অনেকের বিশ্বাস, আগামী বছরগুলোতে নেস্টোরি ইরানকুন্ডা শুধু অস্ট্রেলিয়ার নয়, বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় নাম হয়ে উঠবেন।

নেস্টোরি ইরানকুন্ডার জীবনকাহিনি আধুনিক ফুটবলের অন্যতম অনুপ্রেরণামূলক গল্প। শরণার্থী শিবির থেকে শুরু করে ইউরোপীয় ফুটবলের মঞ্চ এবং বিশ্বকাপের আলো ঝলমলে পরিবেশ—প্রতিটি ধাপেই তিনি সংগ্রাম ও প্রতিভার অসাধারণ সমন্বয় দেখিয়েছেন।

আজ তিনি লাখো তরুণের স্বপ্নের প্রতীক। তার যাত্রা শুধু ফুটবলের গল্প নয়, বরং মানবিক সাহস, অধ্যবসায় এবং অসম্ভবকে সম্ভব করার এক অনন্য উদাহরণ।