বিশ্বকাপ এলেই ফুটবলারদের ব্যক্তিগত জীবন, বিশেষ করে তাদের সঙ্গীদের নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ফুটবলের মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি দর্শক ও গণমাধ্যমের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন খেলোয়াড়দের স্ত্রী, বান্ধবী কিংবা পরিবারের সদস্যরা। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে কোনো ফুটবলারের সঙ্গী নন, বরং জার্মান জাতীয় দলের কোচ জুলিয়ান নাগেলসমানের প্রেমিকা লেনা উরজেনবার্গার।
জার্মানির বিশ্বকাপ অভিযানের মাঝেই লেনা উরজেনবার্গারের উপস্থিতি নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তিনি দলের শিবিরে এতটাই নিয়মিত উপস্থিত থাকছেন যে বিষয়টি খেলোয়াড়দের মধ্যেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিশ্বকাপের আগে ফ্রাঙ্কফুর্টে জার্মান দলের প্রস্তুতি ক্যাম্পে প্রথমবারের মতো তাকে দেখা যায়। তখন তিনি অন্যান্য ফুটবলারদের সঙ্গীদের সঙ্গে অনুশীলন পর্যবেক্ষণ করছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তার উপস্থিতি আরও বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে জার্মানির বড় জয়ের পর তিনি মাঠে থেকে খেলোয়াড়দের অনুশীলন-পরবর্তী কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। এরপর কোচ নাগেলসমানের সঙ্গে দলীয় হোটেলে ফেরার ঘটনাও আলোচনায় আসে। এমনকি পরদিন দুজনকে একসঙ্গে সাইকেলে করে অনুশীলনে যেতে দেখা যায়।
জার্মান গণমাধ্যমের একাংশের মতে, জাতীয় দলের কোচের সঙ্গীর এত ঘনঘন উপস্থিতি অতীতে খুব কমই দেখা গেছে। ফলে দলের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে।
অনেকের ধারণা, কোচের ঘনিষ্ঠ কেউ সবসময় আশপাশে থাকলে খেলোয়াড়রা হয়তো নিজেদের মতামত বা অনুভূতি খোলাখুলি প্রকাশ করতে অস্বস্তি বোধ করতে পারেন। যদিও এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ সামনে আসেনি, তবুও বিষয়টি নিয়ে জল্পনা থামছে না।
জার্মান ফুটবলের কিংবদন্তি লোথার ম্যাথাউসও এই বিষয়টি নিয়ে মত প্রকাশ করেছেন। তার মতে, কোচের সঙ্গীর উপস্থিতি স্বাভাবিক হলেও তা অতিরিক্ত দৃশ্যমান হওয়া আদর্শ পরিস্থিতি নয়।
ম্যাথাউস বলেন, খেলোয়াড়দের পরিবার বা সঙ্গীরা নির্দিষ্ট সময়ে দলের সঙ্গে দেখা করতে পারেন। লেনাও সেই সুযোগ পেয়েছেন। তবে কোচের ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্ন মানদণ্ড থাকা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, দলীয় শৃঙ্খলা ও পেশাদার পরিবেশ বজায় রাখতে কিছু সীমারেখা থাকা জরুরি।
লেনা উরজেনবার্গারের পরিচয় শুধুমাত্র নাগেলসমানের প্রেমিকা হিসেবে নয়। তিনি একসময় সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। জার্মান সংবাদমাধ্যম বিল্ডে কাজ করার সময় তিনি বায়ার্ন মিউনিখ ও জুলিয়ান নাগেলসমানকে নিয়মিত কভার করতেন।
২০২২ সালে নাগেলসমানের দীর্ঘদিনের বৈবাহিক সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর তাদের সম্পর্কের খবর প্রকাশ্যে আসে। সে সময় নাগেলসমান ছিলেন বায়ার্ন মিউনিখের প্রধান কোচ এবং লেনা সেই ক্লাব নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করতেন।
সম্পর্ক প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি জার্মান ফুটবল মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কারণ একজন সাংবাদিক এবং তার কাভার করা ক্লাবের কোচের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন উঠেছিল।
নাগেলসমানের বায়ার্ন মিউনিখ অধ্যায়ের শেষ দিকে ক্লাবের ড্রেসিংরুমের কিছু গোপন তথ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হতে শুরু করে। যদিও এসব তথ্য ফাঁসের সঙ্গে লেনার কোনো সম্পৃক্ততার প্রমাণ কখনো পাওয়া যায়নি, তবুও তার ওপর বাড়তি নজরদারি তৈরি হয়।
পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠায় তিনি পরে সাংবাদিকতার দায়িত্ব পরিবর্তন করেন। প্রথমে অন্য বিটে কাজ শুরু করেন এবং পরবর্তীতে সাংবাদিকতা ছেড়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন পেশায় যোগ দেন।
বর্তমানে তিনি জার্মানির শীর্ষ গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বিএমডব্লিউতে যোগাযোগ ও করপোরেট বিষয়ক কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করছেন।
গত কয়েক বছরে নাগেলসমান এবং লেনা জার্মান ক্রীড়াঙ্গনের অন্যতম আলোচিত জুটি হয়ে উঠেছেন। বিভিন্ন ম্যাচে জয়ের পর নাগেলসমানকে দর্শকসারিতে গিয়ে লেনাকে আলিঙ্গন বা চুম্বন করতে দেখা গেছে।
জার্মান জাতীয় দলের সমর্থকদের কাছেও লেনা এখন পরিচিত মুখ। অনেক সময় তাকে জার্মানির জার্সি পরে এবং মুখে জাতীয় পতাকার রঙ এঁকে দলকে সমর্থন করতে দেখা যায়।
জার্মানি যখন নকআউট পর্বে জায়গা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মাঠে নামছে, তখন লেনা উরজেনবার্গারের উপস্থিতিও সমানভাবে আলোচনায় রয়েছে। কেউ এটিকে স্বাভাবিক সম্পর্কের প্রকাশ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ মনে করছেন এটি অপ্রয়োজনীয় মনোযোগ তৈরি করছে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে শুধু খেলোয়াড় বা কোচই নয়, তাদের ব্যক্তিগত জীবনও অনেক সময় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।
জার্মানির ফলাফল যেমন মাঠে নির্ধারিত হবে, তেমনি লেনা উরজেনবার্গারকে ঘিরে চলা বিতর্কও নজরে থাকবে ফুটবলপ্রেমীদের। তিনি শেষ পর্যন্ত দলের জন্য সৌভাগ্যের প্রতীক হয়ে উঠবেন, নাকি সমালোচনার কেন্দ্রেই থাকবেন—সেটি সময়ই বলে দেবে।

