ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই আবেগ, উন্মাদনা এবং বর্ণিল আয়োজনের এক অনন্য সমন্বয়। ২০২৬ বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক দেশ কানাডা এবার সেই ঐতিহ্যকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। টরন্টোতে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কানাডার দুই কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী অ্যালানিস মরিসেট ও মাইকেল বুবলের পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। কানাডার গ্রুপ বি-র উদ্বোধনী ম্যাচে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে মাঠে নামার আগে এই জমকালো আয়োজন বিশ্বকাপের উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রথমেই মঞ্চে আসেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কানাডিয়ান শিল্পী মাইকেল বুবলে। ৫০ বছর বয়সী এই গায়ক কিংবদন্তি স্যাম কুকের জনপ্রিয় গান “Bring It On Home to Me” পরিবেশন করে দর্শকদের আবেগাপ্লুত করে তোলেন।
স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজারো সমর্থক তাঁর সুরেলা কণ্ঠে মুগ্ধ হন। ম্যাচ শুরুর আগে এই পারফরম্যান্স দর্শকদের উচ্ছ্বাসকে নতুন মাত্রা দেয় এবং কানাডার বিশ্বকাপ অভিযানের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে।
নব্বইয়ের দশকের সাংস্কৃতিক আইকনে পরিণত হওয়া অ্যালানিস মরিসেট উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন। দুই দলের খেলোয়াড় যখন মাঠে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তখন তিনি কানাডার জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন।
তাঁর শক্তিশালী ও আবেগঘন পরিবেশনা পুরো স্টেডিয়ামকে এক আবেগময় পরিবেশে আবদ্ধ করে। দর্শকরা করতালির মাধ্যমে তাঁকে সম্মান জানান এবং সেই মুহূর্তটি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের অন্যতম স্মরণীয় দৃশ্যে পরিণত হয়।
কানাডার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হয় দেশটির আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে। খ্যাতিমান শিল্পী উইলিয়াম প্রিন্স ঐতিহ্যবাহী সংগীত ও নৃত্য পরিবেশনার বর্ণনা দেন।
এই অংশটি শুধু বিনোদনই নয়, বরং কানাডার ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জনপ্রিয় গায়িকা আলেসিয়া কারা লাল রঙের ট্র্যাকস্যুট পরে মঞ্চে উঠে তাঁর জনপ্রিয় গান “Wild Things” এবং “Fire” পরিবেশন করেন। অসংখ্য নৃত্যশিল্পী ও কানাডার পতাকা হাতে পারফর্মারদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
এরপর মঞ্চ মাতান নোরা ফাতেহি, ভেজিড্রিম এবং সঞ্জয়। তাঁদের উচ্চ-শক্তির পরিবেশনা দর্শকদের উচ্ছ্বাসে ভাসিয়ে দেয়। এছাড়াও এলিয়ানা এবং জেসি রেয়েজের পরিবেশনাও দর্শকদের ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল বিশাল আকৃতির কানাডিয়ান পতাকা, যা পুরো মাঠজুড়ে বিস্তৃত ছিল। মাঠের কেন্দ্রে স্থাপন করা হয় একটি বিশাল সোনালি ফুটবলের প্রতিরূপ, যা অনুষ্ঠানের নান্দনিকতা বাড়িয়ে তোলে।
স্টেডিয়ামের গ্যালারি কানাডার ঐতিহ্যবাহী লাল ও সাদা রঙে সজ্জিত হয়ে এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের সৃষ্টি করে।
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে কানাডা তাদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করে। গ্রুপ বি-তে কানাডার সঙ্গে রয়েছে সুইজারল্যান্ড ও কাতার।
সহ-আয়োজক হিসেবে কানাডার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আসর। এর আগে দেশটি ১৯৮৬ এবং ২০২২ সালে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করেছিল। এবার নিজেদের মাটিতে সমর্থকদের সামনে ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন দেখছে উত্তর আমেরিকার এই দেশ।
২০২৬ বিশ্বকাপের তিনটি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সৃজনশীল পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন ইতালিয়ান ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর মার্কো বালিচ।
তিনি এর আগে কাতার বিশ্বকাপ ২০২২ এবং মিলানো-কোর্তিনা শীতকালীন গেমসের বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের নেপথ্যে কাজ করেছেন। তাঁর অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীলতা এবারের বিশ্বকাপ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানগুলোকে অনন্য মাত্রা দিয়েছে।
বিশ্বকাপের তৃতীয় এবং শেষ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামে।
এই অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করবেন জনপ্রিয় অভিনেতা জেসন সুদেকিস, যিনি “টেড লাসো” চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করবেন আন্তর্জাতিক তারকা কেটি পেরিও।
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে মেক্সিকো দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২-০ গোলে হারিয়ে দুর্দান্ত সূচনা করে। উত্তেজনাপূর্ণ এই ম্যাচটি ফুটবলপ্রেমীদের দারুণ বিনোদন দেয়।
মেক্সিকো সিটিতে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কলম্বিয়ান সুপারস্টার শাকিরা ও নাইজেরিয়ান র্যাপার বার্না বয় যৌথ পরিবেশনা করেন। শাকিরার প্রাণবন্ত নৃত্য ও শক্তিশালী মঞ্চ উপস্থিতি দর্শকদের উন্মাতাল করে তোলে।
মঞ্চের কেন্দ্রে স্থাপিত বিশাল সোনালি বিশ্বকাপ ট্রফির প্রতিরূপকে ঘিরে নৃত্যশিল্পীদের সঙ্গে তাঁদের পরিবেশনা ছিল অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ। আতশবাজির ঝলকানিতে পুরো স্টেডিয়াম উৎসবমুখর পরিবেশে পরিণত হয়।
এছাড়া মেক্সিকান রক ব্যান্ড মানা, পপ তারকা বেলিন্দা এবং কলম্বিয়ান শিল্পী জে বালভিন ও রায়ান কাস্ত্রোর পরিবেশনা অনুষ্ঠানকে আরও বর্ণিল করে তোলে।
এদিকে বিশ্বকাপ শুরুর আগেই ঘানার জন্য দুঃসংবাদ এসেছে। সাবেক আর্সেনাল তারকা থমাস পার্টে কানাডায় প্রবেশের অনুমতি না পাওয়ায় দলের উদ্বোধনী ম্যাচে অংশ নিতে পারবেন না।
৩২ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডারের ভিসা আবেদন কানাডা সরকার প্রত্যাখ্যান করায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে অবস্থিত ঘানার বেস ক্যাম্প থেকে দলের সঙ্গে টরন্টোতে যেতে পারেননি।
এই অনুপস্থিতি ঘানার বিশ্বকাপ পরিকল্পনায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্বকাপ এখন আর শুধু ফুটবল প্রতিযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বিশ্ব সংস্কৃতি, সংগীত এবং বিনোদনের এক বৈশ্বিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। কানাডার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সেটিরই উজ্জ্বল উদাহরণ।
অ্যালানিস মরিসেট ও মাইকেল বুবলের আবেগঘন পরিবেশনা, আন্তর্জাতিক তারকাদের উপস্থিতি এবং দর্শকদের অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সূচনাকে স্মরণীয় করে তুলেছে।
অন্যদিকে মেক্সিকোর বর্ণাঢ্য আয়োজনও প্রমাণ করেছে যে এই আসর কেবল মাঠের লড়াই নয়, বরং বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতির এক মিলনমেলা।
ফুটবলপ্রেমীরা এখন অপেক্ষা করছেন পরবর্তী ম্যাচগুলোতে কোন দল মাঠে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করবে এবং এই মহাযজ্ঞে আর কী কী চমক অপেক্ষা করছে।

