খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeএক্সক্লুসিভআটলান্টিকে রহস্যময় ‘কোল্ড ব্লব’! গালফ স্ট্রিম ধসে পড়লে কী হবে পৃথিবীর?

আটলান্টিকে রহস্যময় ‘কোল্ড ব্লব’! গালফ স্ট্রিম ধসে পড়লে কী হবে পৃথিবীর?

একটি সাম্প্রতিক সংসদীয় প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, এই সিস্টেম ধসে পড়লে উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে ২ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা হ্রাস পেতে পারে। এর ফলে কৃষিকাজ পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে এবং খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।

উত্তর আটলান্টিকে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে রহস্যময় ঠান্ডা অঞ্চল

বিশ্বজুড়ে সমুদ্রের তাপমাত্রা যখন ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের একটি বিশেষ অঞ্চল বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। গ্রিনল্যান্ডের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত এই অস্বাভাবিক ঠান্ডা পানির অঞ্চল, যা ‘কোল্ড ব্লব’ নামে পরিচিত, ক্রমেই গবেষকদের নজরের কেন্দ্রে চলে এসেছে। পৃথিবীর অধিকাংশ সমুদ্র উষ্ণ হয়ে উঠলেও এই অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলকভাবে শীতল অবস্থায় রয়েছে।

বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই অস্বাভাবিক ঘটনাটি কেবল একটি সাময়িক আবহাওয়াগত পরিবর্তন নয়। বরং এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রস্রোত ব্যবস্থা Atlantic Meridional Overturning Circulation (AMOC)-এর দুর্বল হয়ে পড়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত হতে পারে।

AMOC কী এবং কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ?

AMOC হলো আটলান্টিক মহাসাগরজুড়ে বিস্তৃত এক বিশাল সমুদ্রস্রোত ব্যবস্থা, যা পৃথিবীর জলবায়ুকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই ব্যবস্থার একটি পরিচিত অংশ হলো গালফ স্ট্রিম, যা উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চল থেকে উষ্ণ পানি ইউরোপের দিকে নিয়ে যায়।

এই সমুদ্রস্রোত শুধু তাপ পরিবহনই করে না, বরং পুষ্টি উপাদান এবং কার্বনও পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানান্তর করে। ফলে বৈশ্বিক জলবায়ু স্থিতিশীল রাখতে AMOC-এর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গ্রিনল্যান্ডের আশপাশে ঠান্ডা ও লবণাক্ত পানি ভারী হয়ে সমুদ্রের গভীরে ডুবে যায়। এর ফলে দক্ষিণ থেকে উষ্ণ পানি উত্তর দিকে টেনে আনা হয় এবং একটি অবিরাম চক্র তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়াই AMOC-কে সচল রাখে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়ছে সংকট

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গ্রিনল্যান্ডের হিমবাহ দ্রুত গলছে। ফলে বিপুল পরিমাণ মিঠা পানি উত্তর আটলান্টিকে প্রবেশ করছে।

মিঠা পানি সমুদ্রের পানির লবণাক্ততা কমিয়ে দেয়, যার ফলে পানির ঘনত্ব হ্রাস পায়। এতে পানি গভীরে ডুবে যাওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। আর এই বাধাই AMOC-কে ধীরে ধীরে দুর্বল করে তুলছে।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে AMOC প্রায় ১৫ শতাংশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এই ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়তে পারে।

‘কোল্ড ব্লব’ কি AMOC দুর্বল হওয়ার প্রমাণ?

দীর্ঘদিন ধরে গবেষকরা ধারণা করছিলেন যে উত্তর আটলান্টিকের এই ঠান্ডা অঞ্চল AMOC-এর ধীরগতির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

কারণ AMOC-এর সরাসরি পর্যবেক্ষণ শুরু হয়েছে মাত্র দুই দশক আগে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা বিশ্লেষণ করা ছিল কঠিন।

অন্যদিকে কিছু গবেষক দাবি করেছিলেন, পরিবর্তিত বায়ুপ্রবাহ বা শক্তিশালী পশ্চিমা বাতাসের কারণে সমুদ্র থেকে বেশি তাপ বেরিয়ে যাচ্ছে, যা ‘কোল্ড ব্লব’ তৈরির জন্য দায়ী।

নতুন গবেষণায় মিলেছে শক্তিশালী প্রমাণ

জার্মানির পটসডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টেফান রাহমস্টর্ফের নেতৃত্বে একদল গবেষক সম্প্রতি নতুন বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন। তারা প্রচলিত জলবায়ু মডেলের পরিবর্তে স্যাটেলাইট, সমুদ্রবয়া এবং জাহাজ থেকে সংগৃহীত বাস্তব তথ্য ব্যবহার করেছেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯৫ সালের পর থেকে ওই অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে তাপ হারানোর পরিমাণ বরং কমেছে। অর্থাৎ বায়ুপ্রবাহ অতিরিক্ত তাপ সরিয়ে নিচ্ছে—এমন ধারণার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ নেই।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুধু সমুদ্রপৃষ্ঠেই নয়, প্রায় এক হাজার মিটার গভীরতাতেও তাপমাত্রা কমে যাওয়ার লক্ষণ পাওয়া গেছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে সমস্যার মূল কারণ বায়ু নয়, বরং সমুদ্রস্রোতের পরিবর্তন।

গবেষকদের মতে, এই তথ্য স্পষ্টভাবে দেখায় যে ‘কোল্ড ব্লব’ আসলে AMOC-এর দুর্বলতার ফল।

ধসে পড়লে কী হতে পারে?

যদি AMOC সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়ে, তাহলে এর প্রভাব হবে বিশ্বব্যাপী এবং অত্যন্ত গুরুতর।

উত্তর ইউরোপের তাপমাত্রা দ্রুত কমে যেতে পারে, যা অনেক বিশেষজ্ঞের ভাষায় এক ধরনের “নতুন ক্ষুদ্র বরফ যুগ”-এর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। কৃষি উৎপাদন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে।

একই সঙ্গে আফ্রিকা ও এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ধরণও পরিবর্তিত হতে পারে। এর ফলে খরা, দুর্ভিক্ষ এবং পানিসংকটের ঝুঁকি বাড়বে।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আবহাওয়ার চরম পরিবর্তন আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে, যা অর্থনীতি, কৃষি এবং জনজীবনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে।

নতুন ঝুঁকি: সাবপোলার জায়ার

গবেষণাটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে—‘সাবপোলার জায়ার’ নামে পরিচিত উত্তর আটলান্টিকের বিশাল ঘূর্ণায়মান সমুদ্রস্রোত।

এই স্রোত লবণাক্ত পানি পৃষ্ঠে নিয়ে আসে এবং AMOC-এর কার্যক্রম সচল রাখতে সহায়তা করে। কিন্তু যদি সাবপোলার জায়ার নিজেই দুর্বল হয়ে পড়ে বা ধসে যায়, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাবপোলার জায়ারের পতন হলে যুক্তরাজ্য ও উত্তর ইউরোপে তাপমাত্রা AMOC-এর সম্পূর্ণ পতনের চেয়েও দ্রুত কমে যেতে পারে।

একটি সাম্প্রতিক সংসদীয় প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, এই সিস্টেম ধসে পড়লে উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে ২ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা হ্রাস পেতে পারে। এর ফলে কৃষিকাজ পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে এবং খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।

২০৪০-এর দশকেই দেখা দিতে পারে বড় প্রভাব

অধ্যাপক স্টেফান রাহমস্টর্ফ সতর্ক করেছেন যে সাবপোলার জায়ার যদি তার ‘টিপিং পয়েন্ট’ অতিক্রম করে, তাহলে ২০৪০-এর দশক থেকেই পশ্চিম ইউরোপে গুরুতর জলবায়ুগত প্রভাব দেখা দিতে পারে।

বিজ্ঞানীদের ভাষায়, ‘কোল্ড ব্লব’ কেবল একটি ঠান্ডা সমুদ্রাঞ্চল নয়; এটি পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থার গভীরে চলমান পরিবর্তনের একটি সম্ভাব্য সতর্ক সংকেত।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও AMOC-এর ভবিষ্যৎ

গবেষকরা মনে করেন, ছোট বরফ যুগের শেষ দিকে উত্তর আটলান্টিক উষ্ণ হতে শুরু করার পর থেকেই মিঠা পানির প্রবাহ এই ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে থাকে। আর্কটিক অঞ্চলের বরফ, হিমবাহ এবং বরফস্তর গলতে গলতে বিপুল পরিমাণ মিঠা পানি সমুদ্রে মিশেছে।

এই প্রক্রিয়া সমুদ্রপৃষ্ঠের পানিকে হালকা করে তুলেছে এবং গভীরে ডুবে যাওয়ার ক্ষমতা কমিয়েছে। ফলস্বরূপ, AMOC ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েছে।

সাম্প্রতিক বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে ১৯৫০ সালের পর থেকে এই দুর্বলতা আরও দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

উত্তর আটলান্টিকের রহস্যময় ‘কোল্ড ব্লব’ এখন আর শুধু একটি বৈজ্ঞানিক ধাঁধা নয়। ক্রমবর্ধমান প্রমাণ ইঙ্গিত করছে যে এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রস্রোত ব্যবস্থা AMOC-এর দুর্বল হয়ে পড়ার সতর্কবার্তা হতে পারে। যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে ইউরোপ থেকে এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে জলবায়ু, কৃষি এবং মানবজীবনের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে। তাই বিজ্ঞানীরা এখন এই সংকেতকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন, কারণ এটি ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিবর্তনের একটি বড় পূর্বাভাস হয়ে উঠতে পারে।