গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, অতিরিক্ত আর্দ্রতা এবং অস্বস্তিকর গরম শুধু ক্লান্তিই বাড়াচ্ছে না, বাড়িয়ে দিচ্ছে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকিও। বিশেষ করে হৃদ্রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য এই সময়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। অনেকেই গরমে অতিরিক্ত ঘাম, শ্বাসকষ্ট বা মাথা ঘোরার মতো উপসর্গকে হিট স্ট্রোক ভেবে অবহেলা করেন। কিন্তু এসব লক্ষণ অনেক ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাকেরও পূর্বাভাস হতে পারে।
তাই গরমের সময় শরীরের সংকেতগুলো সঠিকভাবে বোঝা অত্যন্ত জরুরি। সামান্য অসাবধানতাও বড় বিপদের কারণ হতে পারে।
কেন গরমে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়?
প্রচণ্ড গরমে শরীর নিজের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত কাজ করে। শরীরকে ঠান্ডা রাখতে ত্বকের রক্তনালিগুলো প্রসারিত হয় এবং ত্বকের মাধ্যমে তাপ বের করে দেওয়ার চেষ্টা করে। ফলে হৃদ্যন্ত্রকে স্বাভাবিক রক্তসঞ্চালন বজায় রাখতে আরও দ্রুত ও জোরে কাজ করতে হয়।
এদিকে অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীর থেকে প্রচুর পানি ও লবণ বেরিয়ে যায়। এর ফলে ডিহাইড্রেশন বা জলশূন্যতা দেখা দেয়, যা রক্তচাপের ওঠানামা, অনিয়মিত হৃদ্স্পন্দন এবং হৃদ্যন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এই পরিস্থিতি হৃদ্রোগীদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয়।
হৃদ্রোগীদের যেসব লক্ষণ কখনও অবহেলা করা উচিত নয়
১. ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া
শরীর থেকে দ্রুত পানি ও খনিজ লবণ বেরিয়ে গেলে রক্তসঞ্চালনে প্রভাব পড়ে। এর ফলে ত্বক স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা হারিয়ে ফ্যাকাশে দেখাতে পারে। এটি হৃদ্যন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
২. অতিরিক্ত ঘাম ও তীব্র শ্বাসকষ্ট
দরদর করে ঘাম হওয়ার পাশাপাশি যদি শ্বাস নিতে কষ্ট হয় বা মনে হয় দম বন্ধ হয়ে আসছে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। এটি শুধু গরমের প্রতিক্রিয়া নয়, হৃদ্রোগজনিত সমস্যারও লক্ষণ হতে পারে।
৩. মাথা ঘোরা ও জ্ঞান হারানোর প্রবণতা
ডিহাইড্রেশনের কারণে মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত রক্ত পৌঁছাতে না পারলে মাথা ঘোরা, তীব্র মাথাব্যথা কিংবা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। হৃদ্রোগীদের ক্ষেত্রে এই লক্ষণ বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।
৪. বুক ধড়ফড় করা ও অনিয়মিত হৃদ্স্পন্দন
হঠাৎ বুক ধড়ফড় করা বা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক দ্রুত হৃদ্স্পন্দন হওয়া হৃদ্যন্ত্রের অতিরিক্ত চাপের ইঙ্গিত দেয়। এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৫. অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও পেশিতে টান
অতিরিক্ত দুর্বলতা, শরীরে শক্তি না থাকা, হাত-পায়ের পেশিতে টান ধরা কিংবা পা অবশ হয়ে আসা অনেক সময় হৃদ্রোগের সতর্ক সংকেত হতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় গরমে থাকার পর এসব লক্ষণ দেখা দিলে সতর্ক হওয়া জরুরি।
৬. বুকে ব্যথা ও বমি বমি ভাব
হঠাৎ বুকে চাপ অনুভব করা, ব্যথা শুরু হওয়া, বমি বমি ভাব বা গলা ও বুকজুড়ে জ্বালাপোড়া অনুভূত হওয়া হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে। অনেকেই এসব উপসর্গকে গ্যাস বা অ্যাসিডিটির সমস্যা ভেবে ভুল করেন, যা মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
৭. অসংলগ্ন কথা বলা ও ঝাপসা দৃষ্টি
যদি কেউ হঠাৎ অসংলগ্ন কথা বলতে শুরু করেন, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যায় বা স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করতে না পারেন, তাহলে দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন। এটি গুরুতর শারীরিক সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।
হিট স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের মধ্যে পার্থক্য কী?
গরমের সময় অনেক উপসর্গ একই রকম হওয়ায় মানুষ প্রায়ই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
হিট স্ট্রোকের লক্ষণ
হিট স্ট্রোক হলে শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে ১০৩ থেকে ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তারও বেশি হতে পারে। শরীর অত্যন্ত গরম অনুভূত হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে ঘাম হওয়া বন্ধ হয়ে যায়। রোগী বিভ্রান্ত হয়ে পড়তে পারেন এবং দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ
হার্ট অ্যাটাকের সময় সাধারণত অতিরিক্ত ঘাম হয় এবং বুকের মাঝখানে ভারী চাপ বা চেপে বসার মতো ব্যথা অনুভূত হয়। এই ব্যথা ধীরে ধীরে চোয়াল, ঘাড়, পিঠ বা হাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। শ্বাসকষ্ট, ঝাপসা দৃষ্টি, হাত-পা অবশ হয়ে যাওয়া এবং তীব্র অস্বস্তিও দেখা দিতে পারে।
যদিও দুই ক্ষেত্রেই মাথা ঘোরা, বিভ্রান্তি ও মাথাব্যথা দেখা দিতে পারে, তবুও বুকের চাপ, তীব্র শ্বাসকষ্ট এবং ব্যথা ছড়িয়ে পড়া হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়।
গরমে হৃদ্রোগীরা কীভাবে নিরাপদ থাকবেন?
রোদের তীব্র সময় এড়িয়ে চলুন
সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সূর্যের তাপ সবচেয়ে বেশি থাকে। এই সময় অপ্রয়োজনীয় বাইরে যাওয়া এড়িয়ে চলা উচিত।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন
শরীরকে জলশূন্যতা থেকে রক্ষা করতে নিয়মিত পানি পান করা জরুরি। তবে যাঁদের আগে হার্ট অ্যাটাক হয়েছে বা বিশেষ ওষুধ সেবন করতে হয়, তাঁরা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পানি গ্রহণ করবেন।
হালকা ও আরামদায়ক পোশাক পরুন
হালকা রঙের ঢিলেঢালা সুতির পোশাক শরীরকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। বাইরে বের হলে ছাতা, টুপি বা ক্যাপ ব্যবহার করা উচিত।
ভারী কাজ থেকে বিরত থাকুন
দুপুরের প্রচণ্ড গরমে ভারী শারীরিক পরিশ্রম করা উচিত নয়। নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস থাকলে ভোরবেলা বা সন্ধ্যার পরে হাঁটা ভালো।
শরীর ঠান্ডা রাখুন
অস্বস্তি অনুভব করলে দ্রুত ঠান্ডা জায়গায় যান, স্নান করুন বা প্রয়োজনে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে থাকুন। এতে শরীরের অতিরিক্ত তাপ কমে যায়।
জরুরি পরিস্থিতিতে কী করবেন?
যদি গরমে কারও বুকে ব্যথা শুরু হয়, তীব্র শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় বা তিনি অজ্ঞান হয়ে যান, তাহলে দ্রুত তাঁকে ঠান্ডা পরিবেশে নিয়ে যেতে হবে। আঁটসাঁট পোশাক আলগা করে দিতে হবে এবং ভেজা তোয়ালে দিয়ে মুখ ও ঘাড় মুছে দিতে হবে।
অবস্থা যদি ৩০ মিনিটের মধ্যে উন্নতি না হয় বা উপসর্গ আরও বাড়তে থাকে, তাহলে সময় নষ্ট না করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। কারণ হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গরমের সময় অতিরিক্ত ঘাম, শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা বা বুকে অস্বস্তিকে কখনও হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে হৃদ্রোগীদের জন্য এসব লক্ষণ হিট স্ট্রোকের পাশাপাশি হার্ট অ্যাটাকেরও সতর্কবার্তা হতে পারে। তাই শরীরের প্রতিটি অস্বাভাবিক পরিবর্তনের দিকে নজর রাখা, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং প্রয়োজনে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াই নিরাপদ থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

