বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর সংক্রামক রোগগুলোর মধ্যে অন্যতম ইবোলা ভাইরাস। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে নতুন করে এই ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকায় বিশ্বের বহু দেশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এরই মধ্যে ভারতের রাজস্থান রাজ্যের জয়পুরে উগান্ডা থেকে আসা এক তরুণী পর্যটকের শরীরে ইবোলার মতো উপসর্গ দেখা যাওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে ইবোলা সংক্রমণের আশঙ্কা থাকলেও পরীক্ষার রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। তবে সতর্কতার অংশ হিসেবে ওই তরুণীকে দ্রুত আইসোলেশনে রাখা হয়েছে এবং তাঁর শারীরিক অবস্থার ওপর নিবিড় নজরদারি চালানো হচ্ছে।
সূত্রের খবর, ১৯ বছর বয়সী ওই উগান্ডার নাগরিক শারজা থেকে এয়ার আরাবিয়ার একটি উড়ানে জয়পুরে পৌঁছান। বিমানবন্দরে স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় কর্তব্যরত মেডিক্যাল টিম তাঁর শারীরিক অবস্থায় কিছু অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করে। এরপরই তাঁকে আরও বিস্তারিত পর্যবেক্ষণের জন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তাঁকে পৃথক কক্ষে আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর শরীরের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পুণের বিশেষায়িত গবেষণাগারে পাঠানো হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, প্রথম দফার পরীক্ষার পাশাপাশি ৪৮ ঘণ্টা পর আরও নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হবে। চূড়ান্ত রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে তিনি আদৌ ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত কিনা।
চিকিৎসা সূত্রে জানা গেছে, ওই তরুণী পেটে ব্যথা, ক্ষুধামন্দা এবং মাথাব্যথার মতো সমস্যার কথা জানিয়েছেন। এই লক্ষণগুলো ইবোলা সংক্রমণের সম্ভাব্য উপসর্গের মধ্যে পড়ে। তবে একই ধরনের উপসর্গ অন্য অনেক রোগের ক্ষেত্রেও দেখা যেতে পারে।
সেই কারণে শুধুমাত্র উপসর্গের ভিত্তিতে ইবোলা সংক্রমণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। পরীক্ষার ফলাফলই এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে।
ইবোলা একটি মারাত্মক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মানুষের শরীরে দ্রুত সংক্রমণ ঘটাতে পারে। সংক্রমিত ব্যক্তির রক্ত, শরীরের তরল পদার্থ বা আক্রান্ত প্রাণীর সংস্পর্শের মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায়। জ্বর, তীব্র দুর্বলতা, মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা, বমি, ডায়রিয়া এবং গুরুতর ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রক্তক্ষরণ ইবোলার প্রধান লক্ষণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো চিকিৎসা না পেলে এই রোগ প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। তাই সন্দেহজনক উপসর্গ দেখা দিলেই দ্রুত পরীক্ষা ও আইসোলেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আফ্রিকার কয়েকটি দেশে ইবোলা সংক্রমণের খবর সামনে আসার পর থেকেই ভারতীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক বিভিন্ন রাজ্যকে বিশেষ নির্দেশনা পাঠিয়েছে, যাতে বিদেশফেরত যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা আরও জোরদার করা হয়।
বিশেষ করে আফ্রিকার দেশগুলো থেকে আগত যাত্রীদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিমানবন্দরগুলোতে স্বাস্থ্য পরীক্ষার পাশাপাশি সন্দেহভাজন যাত্রীদের পর্যবেক্ষণে রাখার ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে।
দেশের একাধিক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইতিমধ্যেই বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের দমদম বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন প্রবেশপথে স্বাস্থ্যকর্মীদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিদেশ থেকে আগত যাত্রীদের মধ্যে যদি কারও জ্বর, মাথাব্যথা, পেটের সমস্যা বা অন্য কোনো সন্দেহজনক উপসর্গ দেখা যায়, তাহলে তাঁদের স্বঘোষণাপত্র জমা দিতে বলা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে তাঁদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী সংক্রমণ রোধে World Health Organization (ডব্লিউএইচও) ইতিমধ্যেই বিভিন্ন দেশের জন্য স্বাস্থ্যবিষয়ক নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। সেই নির্দেশিকা অনুসরণ করে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য দপ্তরও রাজ্যগুলোর কাছে প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ পাঠিয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক ভ্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় সংক্রামক রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে। তাই আগাম সতর্কতা এবং দ্রুত শনাক্তকরণই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
জয়পুরের এই ঘটনাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা শুরু হলেও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ সাধারণ মানুষকে গুজবে কান না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। চিকিৎসকদের বক্তব্য, উপসর্গ থাকলেই কেউ ইবোলায় আক্রান্ত— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
বর্তমানে সমস্ত নজর পরীক্ষার ফলাফলের দিকে। রিপোর্ট পজিটিভ হলে নির্ধারিত স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী ২১ দিনের কোয়ারান্টাইন ও চিকিৎসা প্রক্রিয়া শুরু হবে। আর রিপোর্ট নেগেটিভ এলে ইবোলা সংক্রমণের আশঙ্কা সম্পূর্ণভাবে উড়িয়ে দেওয়া যাবে।
জয়পুরে উগান্ডার এক তরুণী পর্যটকের শরীরে ইবোলার মতো উপসর্গ ধরা পড়ায় সাময়িক উদ্বেগ তৈরি হলেও এখনও পর্যন্ত সংক্রমণের কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ মেলেনি। তবে ঘটনাটি দেখিয়ে দিল, আন্তর্জাতিক সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় সতর্কতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষার রিপোর্ট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে স্বাস্থ্য প্রশাসন। একই সঙ্গে বিমানবন্দর ও স্বাস্থ্যব্যবস্থায় জোরদার করা হয়েছে নজরদারি, যাতে সম্ভাব্য যে কোনো ঝুঁকি দ্রুত মোকাবিলা করা যায়।

