বলিউডের বড় বাজেটের সিনেমা মানেই দর্শকদের মধ্যে আলাদা উত্তেজনা। আর সেখানে যদি থাকেন অক্ষয় কুমার, তাহলে প্রত্যাশা একটু বেশি থাকেই। এই বছর তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছবি ‘ওয়েলকাম টু দ্য জঙ্গল’ মুক্তির আগেই বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে। মূল কারণ, সেন্সর বোর্ডের একাধিক আপত্তি এবং কাটের নির্দেশ। ফলে ছবির মুক্তির আগে নির্মাতাদের বেশ কিছু বড় পরিবর্তন আনতে হচ্ছে।
ছবিটি ইতিমধ্যেই সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পেলেও তা সহজে আসেনি। মোট চোদ্দটি পরিবর্তনের শর্তে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো একটি টানা দশ সেকেন্ডের দৃশ্য সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার নির্দেশ।
বিশেষ করে দিশা পটানি ও জ্যাকলিন ফার্নান্ডেজের কিছু দৃশ্য নিয়ে আপত্তি তুলেছে বোর্ড। তাদের বিকিনি পরা দৃশ্য এবং শরীরের নির্দিষ্ট অংশকে ফোকাস করে তোলা কিছু ক্লোজ শটকে ‘অশ্লীল’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ধরনের দৃশ্য দর্শকদের কাছে অস্বস্তিকর হতে পারে বলে মনে করেছে কর্তৃপক্ষ। তাই এসব অংশে কাঁচি চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শুধু দৃশ্য নয়, ছবির সংলাপ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সেন্সর বোর্ড। কিছু সংলাপকে অশালীন বা বিতর্কিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে সেই সংলাপগুলো হয় বাদ দিতে বলা হয়েছে, নয়তো পরিবর্তন করতে বলা হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কিছু সংলাপের ভাষা এমন ছিল যা সমাজের একটি অংশকে আঘাত করতে পারে। তাই সেই শব্দগুলো পরিবর্তন করে তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ ভাষা ব্যবহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ছবির একটি সংলাপে বর্ণবৈষম্যের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ ওঠে। এই ধরনের বিষয় খুবই সংবেদনশীল হওয়ায় সেন্সর বোর্ড তা নিয়ে বিশেষভাবে সতর্ক হয়েছে। “কালো হয়ে জন্মেছে, সে তো কয়লা” ধরনের সংলাপ পুরোপুরি বাদ দিতে বলা হয়েছে।
এর পরিবর্তে এমন সংলাপ ব্যবহার করতে বলা হয়েছে, যা কাউকে ছোট না করে বা আঘাত না দেয়। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বোর্ড মূলত সমাজে ইতিবাচক বার্তা বজায় রাখতে চেয়েছে।
ছবিতে আরও কিছু সংলাপ পরিবর্তনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেমন:
- “ইজ্জত লে লো” সংলাপের জায়গায় অপেক্ষাকৃত নমনীয় ভাষা ব্যবহার করতে বলা হয়েছে
- “গোর্খা রেজিমেন্ট” শব্দবন্ধের পরিবর্তে সাধারণীকৃত “তুমি আর্মি থেকে এসেছ” ধরনের সংলাপ ব্যবহার করতে বলা হয়েছে
- সাবটাইটেলে “জেনারেল” শব্দের বদলে “অফিসার” বা “স্যার” ব্যবহার করার নির্দেশ এসেছে
এই পরিবর্তনগুলো মূলত সংবেদনশীলতা বজায় রাখা এবং কোনো গোষ্ঠীকে আঘাত না করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে।
ছবির একটি সংলাপে “কাশ্মীর” প্রসঙ্গ উল্লেখ ছিল, যা সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে সেন্সর বোর্ড। কারণ এই ধরনের বিষয় রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হতে পারে।
একইভাবে “কুরবানি” শব্দ ব্যবহার নিয়েও আপত্তি ওঠে। সংশ্লিষ্ট সংলাপটি পরিবর্তন করে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে বলা হয়েছে, যাতে তা কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক বিতর্ক তৈরি না করে।
শুধু সংলাপ বা পোশাক নয়, কিছু দৃশ্যে অঙ্গভঙ্গিকেও আপত্তিকর বলে মনে করেছে বোর্ড। একটি বিশেষ দৃশ্যে এমন কিছু ভঙ্গি ছিল, যা অশোভন হিসেবে ধরা হয়েছে। সেই দৃশ্য সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এতে বোঝা যায়, সেন্সর বোর্ড এখন শুধুমাত্র ভাষা নয়, ভিজ্যুয়াল উপস্থাপন নিয়েও বেশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
অক্ষয় কুমারের জন্য এই ছবিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক বছরে তাঁর বেশ কিছু ছবি মুক্তি পেলেও সবগুলোই প্রত্যাশা অনুযায়ী ব্যবসা করতে পারেনি। তাই ‘ওয়েলকাম টু দ্য জঙ্গল’ তাঁর জন্য একরকম প্রত্যাবর্তনের সুযোগ।
এই ছবিটি অ্যাকশন ও কমেডির মিশেলে তৈরি, যা সাধারণত দর্শকদের কাছে জনপ্রিয় হয়। তবে এতগুলো কাট ও পরিবর্তনের পর ছবির মূল মজা বা গতি কতটা বজায় থাকবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
একদিকে দর্শকরা নতুন কিছু দেখতে চান, অন্যদিকে সেন্সর বোর্ড চায় বিষয়বস্তু যেন সবার জন্য গ্রহণযোগ্য হয়। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সবসময় সহজ নয়।
এই ঘটনাটি আবারও সেই চিরচেনা বিতর্ক সামনে এনে দিল—সৃজনশীল স্বাধীনতা বনাম সামাজিক দায়িত্ব। নির্মাতারা যেখানে নিজেদের মতো করে গল্প বলতে চান, সেখানে সেন্সর বোর্ড নিশ্চিত করতে চায় যেন কোনো অংশ বিতর্ক বা ক্ষোভ তৈরি না করে।
সব মিলিয়ে ‘ওয়েলকাম টু দ্য জঙ্গল’ এখন শুধু একটি সিনেমা নয়, বরং সেন্সরশিপ নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এত পরিবর্তনের পর ছবিটি দর্শকদের কতটা মন জিততে পারে, সেটাই দেখার বিষয়।
তবে একটা কথা নিশ্চিত—বিতর্ক যত বাড়ে, কৌতূহলও তত বাড়ে। আর সেই কৌতূহলই হয়তো শেষ পর্যন্ত দর্শকদের হলমুখী করবে।

