ফুটবল মানেই উত্তেজনা, আবেগ আর অনিশ্চয়তার খেলা। আর যখন মাঠে নামেন লিওনেল মেসির মতো বিশ্বসেরা তারকা, তখন প্রত্যাশার মাত্রা আরও বেড়ে যায়। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক মেসির সামনে ছিল নতুন এক ইতিহাস গড়ার সুযোগ। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি তিনি। পেনাল্টি পেয়েও গোল করতে ব্যর্থ হওয়ায় বিশ্বকাপের রেকর্ডের অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হলো আর্জেন্টাইন মহাতারকার।
ম্যাচের ৩৮ মিনিটে আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত এগিয়ে যায় এবং সমর্থকদের মাঝে স্বস্তি ফিরে আসে। তবে ম্যাচের শুরুতে মেসির পেনাল্টি মিস পুরো ফুটবল বিশ্বেই আলোচনার জন্ম দেয়।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে শুরু করে আর্জেন্টিনা। প্রতিপক্ষ অস্ট্রিয়ার রক্ষণভাগে চাপ তৈরি করে একের পর এক আক্রমণ চালায় দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। বল দখল, পাসিং এবং আক্রমণের গতি—সব দিক থেকেই শুরুতে এগিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা।
ম্যাচের সপ্তম মিনিটে বড় সুযোগ আসে আর্জেন্টিনার সামনে। অস্ট্রিয়ার পেনাল্টি বক্সের ভেতরে লাউতারো মার্তিনেজকে ফাউল করেন প্রতিপক্ষের দুই ডিফেন্ডার। প্রথমে রেফারি খেলা চালিয়ে গেলেও পরে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (VAR) পরামর্শে সিদ্ধান্ত বদলানো হয়। আর্জেন্টিনা পায় পেনাল্টি।
গুরুত্বপূর্ণ সেই মুহূর্তে বল হাতে এগিয়ে আসেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। স্টেডিয়ামের হাজারো দর্শক অপেক্ষায় ছিলেন তাঁর বাঁ পায়ের জাদুর জন্য। এই গোলটি করতে পারলে বিশ্বকাপের ইতিহাসে নতুন মাইলফলক স্পর্শ করতে পারতেন তিনি।
কিন্তু এবার ভাগ্য সহায় হলো না। মেসির নেওয়া শটটি ডান পোস্টের দিকে গেলেও তাতে ছিল না আগের মতো গতি ও নিখুঁততা। অস্ট্রিয়ার গোলরক্ষক আলেকজান্ডার শ্লেগার সহজেই সেটি আটকে দেন।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে একটি গোল করতে পারলেই মেসির বিশ্বকাপ গোলসংখ্যা বেড়ে যেত ১৭-তে। একই সঙ্গে তিনি ছাড়িয়ে যেতে পারতেন জার্মানির কিংবদন্তি ফুটবলার মিরোস্লাভ ক্লোজেকে।
বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় নিজের অবস্থান আরও শক্ত করার সুযোগ ছিল মেসির সামনে। কিন্তু পেনাল্টি মিসের কারণে সেই অপেক্ষা আবারও বেড়ে গেল।
তবে ফুটবলে এমন ঘটনা নতুন কিছু নয়। বিশ্বের বড় বড় তারকারাও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সুযোগ হারিয়েছেন। কিন্তু মেসির মতো খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রে একটি ব্যর্থতাও বড় খবর হয়ে ওঠে, কারণ তাঁর কাছ থেকে সমর্থকদের প্রত্যাশা সবসময়ই আকাশছোঁয়া।
পেনাল্টি মিসের পরও মেসি চেষ্টা চালিয়ে যান। ম্যাচের ১৯তম মিনিটে আবারও গোল করার দারুণ সুযোগ তৈরি হয়। অস্ট্রিয়ার গোলরক্ষককে প্রায় একা পেয়েও এবারও সফল হতে পারেননি আর্জেন্টিনার অধিনায়ক।
সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে মেসি তাঁর ঠান্ডা মাথার ফিনিশিং দিয়ে সবাইকে মুগ্ধ করেন। কিন্তু এই ম্যাচে শুরুতে তাঁর ভাগ্য কিছুটা প্রতিকূলে ছিল।
অস্ট্রিয়ার ডিফেন্ডাররাও মেসিকে আটকাতে বিশেষ পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামে। তারা মেসির সামনে জায়গা কমিয়ে দিয়ে আক্রমণের গতি থামানোর চেষ্টা করে।
ম্যাচের প্রথম মিনিট থেকেই আর্জেন্টিনা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। মাঝমাঠ থেকে দ্রুত পাস দিয়ে তারা অস্ট্রিয়ার রক্ষণ ভাঙার চেষ্টা করে।
মেসি, লাউতারো মার্তিনেজ এবং থিয়াগো আলমাদাকে নিয়ে আক্রমণভাগ বারবার প্রতিপক্ষের ডিফেন্সে চাপ তৈরি করে। তবে অস্ট্রিয়ার রক্ষণভাগও ছিল বেশ সংগঠিত।
তারা শেষ মুহূর্তে আর্জেন্টিনার বেশ কয়েকটি আক্রমণ প্রতিহত করে। ফলে শুরুতে গোল না পেলেও আর্জেন্টিনা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে।
মেসির পেনাল্টি রুখে দেওয়ার পর অস্ট্রিয়ার খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। তারা ধীরে ধীরে আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করে।
দ্রুত পাল্টা আক্রমণের মাধ্যমে আর্জেন্টিনার রক্ষণ পরীক্ষা করতে থাকে তারা। যদিও ম্যাচের সেই পর্যায় পর্যন্ত বড় কোনো গোলের সুযোগ তৈরি করতে পারেনি অস্ট্রিয়া।
তবুও তাদের পাল্টা আক্রমণের কারণে আর্জেন্টিনাকে সতর্ক থাকতে হয়।
ম্যাচ দেখতে আসা দর্শকদের বড় একটি অংশ ছিল আর্জেন্টিনার সমর্থক। পুরো গ্যালারি যেন নীল-সাদা রঙে ভরে যায়।
মেসিকে ঘিরে সমর্থকদের প্রত্যাশাও ছিল অনেক বেশি। অনেক দর্শক প্রিয় খেলোয়াড়ের নাম লেখা জার্সি পরে মাঠে উপস্থিত হন। তাদের বিশ্বাস ছিল, মেসি যেকোনো সময় ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন।
গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি শক্তিশালী দল নিয়ে মাঠে নামেন।
গোলরক্ষক হিসেবে ছিলেন এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। রক্ষণভাগে দায়িত্ব পালন করেন নাহুয়েল মোলিনা, ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্তিনেজ ও ফাকুন্দো মেদিনা।
মাঝমাঠে ছিলেন রদ্রিগো ডি পল, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার এবং এনজো ফার্নান্দেজ। আক্রমণভাগে মেসির সঙ্গে ছিলেন লাউতারো মার্তিনেজ ও থিয়াগো আলমাদা।
পেনাল্টি মিস করলেও মেসির মতো অভিজ্ঞ ফুটবলার কখনোই ম্যাচ থেকে হারিয়ে যান না। একটি ভুল দিয়ে তাঁর পুরো পারফরম্যান্স বিচার করা কঠিন।
বিশ্বকাপের মঞ্চে মেসির লড়াই শুধু দলের জয়ের জন্য নয়, নিজের রেকর্ডের জন্যও। একটি গোলই তাঁকে নিয়ে যেতে পারে নতুন ইতিহাসের আরও কাছে।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে শুরুটা প্রত্যাশামতো না হলেও আর্জেন্টিনার সামনে ছিল ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ। আর মেসি ভক্তরা অপেক্ষায় ছিলেন সেই মুহূর্তের, যখন আবারও দেখা যাবে তাঁর অসাধারণ ফুটবল জাদু।

