এবারের বিশ্বকাপ যেন একেবারে গোলের উৎসব। ম্যাচ শুরু মানেই গোল, আর শেষ পর্যন্ত দর্শকদের জন্য রোমাঞ্চের শেষ নেই। মাত্র ১০ দিনের মধ্যেই ১০০ গোল—ভাবা যায়? এমন নজির শেষ দেখা গিয়েছিল প্রায় ৭০ বছর আগে। তাই স্বাভাবিকভাবেই সবার মনে একটাই প্রশ্ন—কেন এবারের বিশ্বকাপে এত বেশি গোল হচ্ছে?
চল একটু সহজভাবে পুরো ব্যাপারটা বুঝে নিই।
এবারের আসরে গোল যেন থামছেই না। মাত্র ৩৩টি ম্যাচেই হয়ে গেছে ১০০ গোল। যেখানে অতীতে এমন সংখ্যা ছুঁতে অনেক বেশি ম্যাচ লেগেছে। ১৯৫৪ সালের পর এই প্রথম এত দ্রুত গোলের সেঞ্চুরি।
আরও মজার ব্যাপার হলো, ৪০টি ম্যাচ শেষ হওয়ার আগেই গোলের সংখ্যা পৌঁছে গেছে ১২০-এর বেশি। গড়ে প্রতি ম্যাচে প্রায় ৩টি গোল হচ্ছে। মানে, একটা ম্যাচ দেখলে গোল না দেখে ওঠা প্রায় অসম্ভব!
যদি এই গতি বজায় থাকে, তাহলে পুরো টুর্নামেন্টে ৩০০ গোলও ছাড়িয়ে যেতে পারে—যা একেবারে নতুন ইতিহাস।
একটা বড় কারণ হলো খেলোয়াড়দের দুর্দান্ত ফর্ম। বড় বড় তারকারা যেন গোল করার মেশিন হয়ে উঠেছেন।
বর্তমান সময়ের তারকা স্ট্রাইকাররা যেমন কিলিয়ান এমবাপে, লিওনেল মেসি বা আর্লিং হালান্ড—এরা প্রত্যেকেই নিজেদের সেরা ছন্দে আছেন। মাঠে নামলেই সুযোগ তৈরি করছেন, আর সেই সুযোগকে গোলেও পরিণত করছেন।
যেমন ধরো, জার্মানি মাত্র ২ ম্যাচেই ৯ গোল করে ফেলেছে। এর মধ্যে এক ম্যাচে ৭-১ গোলের বিশাল জয়। এটা দেখেই বোঝা যায় আক্রমণ কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠেছে।
এবারের বিশ্বকাপে দলসংখ্যা বেড়েছে। নতুন ১৬টি দল অংশ নিয়েছে, যার মধ্যে কিছু দল একেবারেই নতুন।
এখন তুমি সহজ করে ভাবো—যখন শক্তিশালী দল আর তুলনামূলক দুর্বল দল একসাথে খেলবে, তখন কী হবে? স্বাভাবিকভাবেই বড় দলগুলো বেশি গোল করবে।
ঠিক সেটাই হচ্ছে। হাইতি, কাতার, তিউনিসিয়া, কুরাসাওয়ের মতো দলগুলো অনেক গোল হজম করছে। ফলে মোট গোলসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।
তবে একটা মজার দিকও আছে—কুরাসাওয়ের গোলকিপার এলয় রুম এক ম্যাচে ১৫টি সেভ করেছেন! মানে, গোল বেশি হলেও লড়াইও কম হচ্ছে না।
এবারের বিশ্বকাপের আরেকটা বড় ফ্যাক্টর হলো গরম। অনেক ম্যাচেই তাপমাত্রা এত বেশি যে মাঝখানে দুইবার করে হাইড্রেশন ব্রেক দিতে হচ্ছে।
গরমে খেলোয়াড়রা দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। আর ক্লান্ত হলে ডিফেন্সে ভুল বাড়ে—যার সুযোগ নেয় আক্রমণভাগ।
পরিসংখ্যান বলছে, মোট গোলের প্রায় ২৬% এসেছে ম্যাচের শেষ ১৫ মিনিটে। মানে, শেষ দিকে খেলোয়াড়দের ক্লান্তি কাজে লাগিয়ে সহজেই গোল হচ্ছে।
একটু নিজের জীবনের সাথে মিলিয়ে দেখো—গরমে বেশি সময় দৌড়ালে শরীর কেমন ঢিলে হয়ে যায়। ফুটবল মাঠেও ঠিক তাই হচ্ছে।
এবার ব্যবহৃত বল নিয়েও অনেক আলোচনা হচ্ছে। ইংল্যান্ডের সাবেক গোলকিপার জো হার্ট মনে করেন, এই বলের গতি আর মুভমেন্ট খুবই অদ্ভুত।
গোলকিপারদের জন্য বলের দিক বুঝে ওঠা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। অনেক সময় বল হাতে ঠিকভাবে ধরতেও সমস্যা হচ্ছে।
২০১০ সালের জাবুলানি বল নিয়েও একই অভিযোগ ছিল। এবারও সেই একই সমস্যা দেখা যাচ্ছে।
এর ফল কী? দূর থেকে নেওয়া শটও সহজে গোল হয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে বক্সের বাইরে থেকে বেশ কিছু গোল হয়েছে।
গোল বাড়ার আরেকটা কারণ হলো গোলকিপারদের ছোট ছোট ভুল।
একটু দেরিতে রিঅ্যাকশন, ভুল পজিশনিং, বা বল ধরতে না পারা—এসব কারণে সহজ গোল হয়ে যাচ্ছে। বড় টুর্নামেন্টে চাপ বেশি থাকে, আর সেই চাপেই এই ভুলগুলো বেশি চোখে পড়ে।
আগে অনেক ম্যাচ ০-০ ড্র হতো। কিন্তু এবার এমন ম্যাচ খুবই কম। এখন পর্যন্ত মাত্র কয়েকটি ম্যাচেই কোনো গোল হয়নি।
মানে, প্রতিটা ম্যাচেই কিছু না কিছু হচ্ছে। দর্শকদের জন্য এটা একদম পারফেক্ট—কারণ তারা গোল দেখতে চায়, আর সেটাই পাচ্ছে।
সব মিলিয়ে একটা জিনিস পরিষ্কার—এবারের বিশ্বকাপ পুরোপুরি আক্রমণভিত্তিক হয়ে উঠেছে।
দল বেশি, শক্তির পার্থক্য বেশি, খেলোয়াড়রা ফর্মে, গরমের প্রভাব, নতুন বল—সব কিছু মিলে গোলের সংখ্যা বাড়ছে।
সহজ করে বললে, এটা যেন এমন একটা ম্যাচ যেখানে সবাই আক্রমণে ব্যস্ত, আর ডিফেন্স একটু পিছিয়ে।
তাই তুমি যদি ফুটবল প্রেমী হও, তাহলে এই বিশ্বকাপটা তোমার জন্য একদম স্বপ্নের মতো। কারণ এখানে প্রতিটা ম্যাচেই আছে গোল, উত্তেজনা আর চমক।
এখন দেখার বিষয়—এই গোলের বন্যা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামে!

