খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeবিশেষ প্রতিবেদনশাপলা চত্বর থেকে পরীমণি কাণ্ড! বেনজীর আহমেদের আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায়

শাপলা চত্বর থেকে পরীমণি কাণ্ড! বেনজীর আহমেদের আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায়

২০২১ সালে চিত্রনায়িকা পরীমণিকে কেন্দ্র করে ঢাকার একটি বোট ক্লাবে ঘটে যাওয়া ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। ঘটনার পর জানা যায়, ওই অভিজাত ক্লাবের সভাপতি ছিলেন বেনজীর আহমেদ।

বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ইতিহাসে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের নাম দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। ক্ষমতা, প্রভাব, বিতর্ক এবং সাম্প্রতিক দুর্নীতির অভিযোগ—সবকিছু মিলিয়ে তিনি দেশের অন্যতম আলোচিত সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা। একসময় যিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দৃশ্যমান প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিলেন, বর্তমানে তিনি বিপুল সম্পদের উৎস এবং দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে নতুন বিতর্কের মুখোমুখি।

বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে নতুন আলোচনা

সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে বেনজীর আহমেদ ও তাঁর পরিবারের নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদের তথ্য প্রকাশ্যে আসে। অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্যের ভিত্তিতে আদালত তাঁর বিভিন্ন সম্পদ জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন।

জব্দ হওয়া সম্পদের মধ্যে রয়েছে রাজধানীর গুলশানে একাধিক ফ্ল্যাট, অসংখ্য ব্যাংক হিসাব, শত শত বিঘা জমি, বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার এবং সঞ্চয়পত্র। এসব তথ্য সামনে আসার পর দেশজুড়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম হয়েছে—একজন সরকারি কর্মকর্তা কীভাবে এত বিপুল সম্পদের মালিক হলেন?

পুলিশ ক্যারিয়ারের শুরু থেকে শীর্ষ পদে আরোহন

১৯৮৮ সালে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেন বেনজীর আহমেদ। কর্মজীবনের শুরু থেকেই তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তবে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় আসেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে।

২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি ডিএমপি কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০১৫ সালের ১৫ জানুয়ারি র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান। প্রায় পাঁচ বছর র‍্যাবের নেতৃত্ব দেওয়ার পর ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল দেশের ৩০তম আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি অবসরে যান।

বিশ্লেষকদের মতে, স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে খুব কম পুলিশ কর্মকর্তা এতটা দৃশ্যমান এবং প্রভাবশালী অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছেন।

সবচেয়ে আলোচিত ও দৃশ্যমান আইজিপি

সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন এক সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেছিলেন যে, দেশের ইতিহাসে বেনজীর আহমেদ সম্ভবত সবচেয়ে দৃশ্যমান আইজিপি ছিলেন। তিনি প্রকাশ্যে নিজের অবস্থান এবং ক্ষমতার উপস্থিতি তুলে ধরতে কখনো পিছপা হননি।

ক্ষমতাসীন সরকারের বিভিন্ন নীতি বাস্তবায়ন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে তিনি প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক দুই অঙ্গনেই ব্যাপক আলোচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।

শাপলা চত্বর অভিযান ও দীর্ঘস্থায়ী বিতর্ক

২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের শাপলা চত্বরের সমাবেশ উচ্ছেদ অভিযান ছিল বেনজীর আহমেদের কর্মজীবনের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়। সে সময় তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

পরে তিনি দাবি করেছিলেন যে অভিযানে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়নি। তবে এই অভিযান নিয়ে রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার সংগঠন এবং বিভিন্ন মহলে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। শাপলা চত্বর অভিযান আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।

২০১৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পুলিশের ভূমিকা

২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিরোধী দলের আন্দোলন দমন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা দেখা দেয়।

বিশেষ করে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের সামনে বালুভর্তি ট্রাক রেখে সড়ক অবরুদ্ধ করার ঘটনাটি জাতীয় রাজনীতিতে বড় বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল। সে সময় ডিএমপি কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন বেনজীর আহমেদ।

র‍্যাব প্রধান হিসেবে মানবাধিকার বিতর্ক

র‍্যাবের মহাপরিচালক থাকাকালে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ বারবার সামনে আসে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা র‍্যাবের কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।

তবে বেনজীর আহমেদ বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, র‍্যাব আইন অনুযায়ী কাজ করেছে এবং দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক চাপ

২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র র‍্যাব এবং এর কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

র‍্যাবের সাবেক মহাপরিচালক হিসেবে বেনজীর আহমেদও সেই নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসেন। এর ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তিনি ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠেন। এটি ছিল বাংলাদেশের কোনো সাবেক আইজিপির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সবচেয়ে আলোচিত পদক্ষেপগুলোর একটি।

পরীমণি ও বোট ক্লাব বিতর্ক

২০২১ সালে চিত্রনায়িকা পরীমণিকে কেন্দ্র করে ঢাকার একটি বোট ক্লাবে ঘটে যাওয়া ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। ঘটনার পর জানা যায়, ওই অভিজাত ক্লাবের সভাপতি ছিলেন বেনজীর আহমেদ।

এরপর প্রশ্ন ওঠে, একজন কর্মরত আইজিপি কীভাবে একটি বাণিজ্যিক ও অভিজাত ক্লাবের নেতৃত্বে থাকতে পারেন। পাশাপাশি তাঁর ক্লাব-সংশ্লিষ্ট আর্থিক সম্পৃক্ততা নিয়েও নানা আলোচনা শুরু হয়। বিষয়টি জাতীয় সংসদ পর্যন্ত গড়ায় এবং গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।

অবসরের পর সম্পদ নিয়ে নতুন প্রশ্ন

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি অবস্থান করার কারণে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ওঠা অনেক অভিযোগ যথাযথ গুরুত্ব পায়নি।

তবে অবসরের পর দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সম্পদ, জীবনযাপন এবং বিভিন্ন আর্থিক কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। বর্তমানে তাঁর নামে থাকা সম্পদের উৎস নিয়েই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে।

সব অভিযোগ অস্বীকার বেনজীরের

অন্যদিকে বেনজীর আহমেদ তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। এক ভিডিও বার্তায় তিনি দাবি করেন, দুর্নীতির অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অবসরের পর পরিকল্পিতভাবে তাঁকে দুর্নীতিবাজ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি বিশ্বাস করেন, যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে সত্য প্রকাশ পাবে।

শেষ পর্যন্ত কোথায় যাবে এই বিতর্ক?

দুদকের অনুসন্ধান, আদালতের সম্পদ জব্দের নির্দেশ এবং জনমনে তৈরি হওয়া নানা প্রশ্নের কারণে বেনজীর আহমেদ এখন আবারও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

একসময় দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর আইনশৃঙ্খলা কর্মকর্তাদের একজন হিসেবে পরিচিত এই সাবেক আইজিপির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে, তা এখন সময়ই বলে দেবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে বেনজীর আহমেদের নাম দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক, ক্ষমতা এবং আলোচনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা