Become a member

Get the best offers and updates relating to Newsbangla24x7.com

― Advertisement ―

spot_img
Homeলাইফস্টাইলসাস্থ্য এবং ফিটনেসরোগা শরীর কিন্তু ভুঁড়ি কেন? পূর্বপুরুষের জিন কি দায়ী এই ‘নেয়াপাতি’ পেটের...

রোগা শরীর কিন্তু ভুঁড়ি কেন? পূর্বপুরুষের জিন কি দায়ী এই ‘নেয়াপাতি’ পেটের জন্য!

গবেষকদের মতে, দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে ভারতীয় ও বাঙালি পুরুষদের মধ্যে পেটের মেদ জমার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো জিনগত বৈশিষ্ট্য।

অনেক মানুষের শরীরের গঠন দেখে মনে হয় তারা একেবারেই স্থূল নন। হাত-পা সরু, ওজনও স্বাভাবিক সীমার মধ্যে। কিন্তু তবুও পেটের মাঝখানে জমে ওঠে এক ধরনের গোলাকার ভুঁড়ি, যাকে অনেকেই মজার ছলে ‘নেয়াপাতি’ ভুঁড়ি বলে থাকেন। বহু মানুষ এটিকে বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন বলে ধরে নেন। আবার অনেকে মনে করেন, বাবা বা দাদার এমন ভুঁড়ি ছিল বলে তাদের ক্ষেত্রেও এটি অবশ্যম্ভাবী। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এই ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়।

পেটের মাঝখানে জমে থাকা অতিরিক্ত মেদ শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যের বিষয় নয়, বরং এটি শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো দেখাচ্ছে, এই বিশেষ ধরনের ভুঁড়ির পেছনে খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং বিপাকীয় সমস্যারও বড় ভূমিকা রয়েছে।

অনেকেই পেট ফেঁপে যাওয়াকে ভুঁড়ি বলে ভুল করেন। অতিরিক্ত খাওয়া, বদহজম, গ্যাস বা অম্বলের কারণে পেট সাময়িকভাবে ফুলে যেতে পারে। কিন্তু ‘নেয়াপাতি’ ভুঁড়ি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

এটি মূলত পেটের গভীরে ধীরে ধীরে জমে ওঠা চর্বির স্তর। একদিনে এই মেদ তৈরি হয় না। দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে অতিরিক্ত শক্তি জমা হতে হতে এটি স্থায়ী আকার ধারণ করে। একবার তৈরি হলে সাধারণ ডায়েট বা সামান্য ব্যায়ামে এটি সহজে কমে না।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই চর্বিকে বলা হয় ভিসেরাল ফ্যাট। বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরে জমা হওয়া চর্বির মধ্যে এটিই সবচেয়ে বিপজ্জনক।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, পেটের মাঝখানে অতিরিক্ত মেদ জমার অন্যতম কারণ হলো মেটাবলিক ডিজঅর্ডার বা বিপাকীয় সমস্যা।

আমাদের শরীর খাবার থেকে শক্তি তৈরি করে এবং সেই শক্তির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে বিপাকক্রিয়া। যখন এই প্রক্রিয়ায় ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়, তখন শরীর অতিরিক্ত চর্বি জমাতে শুরু করে। অনেক সময় ওজন স্বাভাবিক থাকলেও পেটের অংশে মেদ জমে যায়।

ফলে একজন ব্যক্তি দেখতে রোগা হলেও তার শরীরের অভ্যন্তরে বিপজ্জনক পরিমাণ চর্বি জমতে পারে।

গবেষকদের মতে, দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে ভারতীয় ও বাঙালি পুরুষদের মধ্যে পেটের মেদ জমার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো জিনগত বৈশিষ্ট্য।

অনেকের উচ্চতা ও ওজনের অনুপাত বা বডি মাস ইনডেক্স (BMI) স্বাভাবিক থাকে। তবুও পেটের চারপাশে মেদ জমতে থাকে। গবেষণায় কিছু নির্দিষ্ট জিনের উপস্থিতি এই প্রবণতার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষত A55T এবং K153R নামের জিন ভ্যারিয়েন্টগুলোর সঙ্গে পেটের মেদ বৃদ্ধির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

এই জিনগুলো বংশ পরম্পরায় এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে সঞ্চারিত হতে পারে। ফলে পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যেও একই ধরনের শারীরিক বৈশিষ্ট্য দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

তবে জিনগত প্রবণতা থাকলেই যে ভুঁড়ি হবেই, এমন নয়। জীবনযাত্রার ধরন এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

শরীরের বাইরের চর্বি অনেক সময় চোখে দেখা যায়। কিন্তু ভিসেরাল ফ্যাটের বড় সমস্যা হলো এটি শরীরের ভেতরে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর চারপাশে জমতে থাকে।

এই মেদ ধীরে ধীরে হৃদযন্ত্র, যকৃত, অন্ত্র ও পাকস্থলীর আশপাশে জমা হতে পারে। বাইরে থেকে শরীর স্বাভাবিক দেখালেও ভেতরে ক্ষতিকর পরিবর্তন চলতে থাকে।

ফলস্বরূপ যেসব স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি
  • ফ্যাটি লিভার রোগ
  • উচ্চ রক্তচাপ
  • টাইপ-২ ডায়াবেটিস
  • হজমজনিত জটিলতা
  • বিপাকীয় সিনড্রোম

এই কারণেই চিকিৎসকরা পেটের মেদকে শুধুমাত্র সৌন্দর্যগত সমস্যা হিসেবে দেখেন না।

অনেকেই মনে করেন, ভাজাপোড়া বা অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার খাওয়ার কারণেই ভুঁড়ি হয়। বাস্তবে বিষয়টি আরও জটিল।

পেটের মেদ বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো—

অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ শরীরে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এই হরমোন পেটের চারপাশে চর্বি জমাতে সাহায্য করে।

বর্তমান সময়ে অনেকেই দিনের বেশিরভাগ সময় বসে কাজ করেন। পর্যাপ্ত হাঁটাচলা বা ব্যায়ামের অভাবে শরীরের অতিরিক্ত ক্যালরি মেদ হিসেবে জমা হতে থাকে।

অফিস, কম্পিউটার কিংবা মোবাইলের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকলে বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে যায়। এতে পেটের মেদ দ্রুত বাড়তে পারে।

ঘুমের ঘাটতি শরীরের হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে। ফলে ক্ষুধা বাড়ে এবং মেদ জমার প্রবণতাও বৃদ্ধি পায়।

পেটের গভীরে জমে থাকা ভিসেরাল ফ্যাট কমানো সহজ নয়। তবে নিয়মিত জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে এটি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

প্রতিদিন অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট দ্রুত হাঁটা পেটের মেদ কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

কার্ডিওভিত্তিক ব্যায়াম শরীরের অতিরিক্ত চর্বি পোড়াতে সাহায্য করে। নিয়মিত জগিং করলে ভিসেরাল ফ্যাট কমতে শুরু করে।

বিভিন্ন যোগাসন পেটের পেশি শক্তিশালী করে এবং শরীরের নমনীয়তা বাড়ায়। পাশাপাশি মানসিক চাপও কমায়।

পিলাটিস এবং কোর স্ট্রেংথ বাড়ানোর ব্যায়াম পেটের অংশকে টোনড রাখতে সাহায্য করে। নিয়মিত স্ট্রেচিংও উপকারী।

অতিরিক্ত চিনি, প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং ট্রান্স ফ্যাট কমিয়ে শাকসবজি, ফল, প্রোটিন ও আঁশযুক্ত খাবার বাড়াতে হবে।

রোগা শরীর মানেই যে সুস্থ শরীর, এমন ধারণা এখন আর পুরোপুরি সত্য নয়। অনেক সময় স্বাভাবিক ওজনের মানুষও পেটের মাঝখানে বিপজ্জনক ভিসেরাল ফ্যাট বহন করেন। এর পেছনে যেমন জিনগত কারণ থাকতে পারে, তেমনি অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রা, মানসিক চাপ ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তাও দায়ী।

তাই ‘নেয়াপাতি’ ভুঁড়িকে বয়সের স্বাভাবিক লক্ষণ ভেবে অবহেলা না করে সময়মতো সচেতন হওয়া জরুরি। নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই পারে এই নীরব ঝুঁকি থেকে দূরে রাখতে।