Become a member

Get the best offers and updates relating to Newsbangla24x7.com

― Advertisement ―

spot_img
Homeবিশেষ প্রতিবেদনউনসত্তরের নায়ক থেকে রাজনৈতিক একাকীত্ব! তোফায়েল আহমেদের উত্থান-পতনের অজানা গল্প

উনসত্তরের নায়ক থেকে রাজনৈতিক একাকীত্ব! তোফায়েল আহমেদের উত্থান-পতনের অজানা গল্প

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান একটি মাইলফলক। সেই আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। সে সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর ভিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

বাংলাদেশের রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম তোফায়েল আহমেদ। ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্থান-পতনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল তার নাম। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি যেমন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন, তেমনি শেষ সময়ে দলীয় রাজনীতিতে প্রভাব হারিয়ে এক ধরনের নিঃসঙ্গতাও অনুভব করেছিলেন।

সম্প্রতি ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন বর্ষীয়ান এই রাজনীতিক। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। বয়সজনিত নানা জটিলতা ও শারীরিক অসুস্থতায় দীর্ঘদিন ভুগছিলেন তিনি। তার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তোফায়েল আহমেদের জন্ম ও শিক্ষাজীবন

১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা জেলার সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোরালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তোফায়েল আহমেদ। শৈশব ও কৈশোর কাটে নিজ জেলায়। পরে বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ (বিএম কলেজ) থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকা বিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই তিনি ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন এবং ধীরে ধীরে জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্বে উঠে আসেন।

উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান একটি মাইলফলক। সেই আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। সে সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর ভিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন এবং অন্যান্য ছাত্র সংগঠন নিয়ে গঠিত সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন তিনি। ছয় দফার সঙ্গে ছাত্রসমাজের ১১ দফা দাবি যুক্ত করে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তার নেতৃত্বের সামনের সারিতে ছিলেন তোফায়েল আহমেদ।

১৯৬৯ সালের ২৪ জানুয়ারির গণঅভ্যুত্থান পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে গণরোষকে নতুন মাত্রা দেয়। এই আন্দোলনের ফলেই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামিদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তান সরকার।

একই বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে আয়োজিত ঐতিহাসিক জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমানকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে ভূষিত করার ঘোষণা দেন তোফায়েল আহমেদ। এই ঘটনা তাকে জাতীয় রাজনীতির অন্যতম আলোচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।

মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

১৯৭০ সালের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেন তোফায়েল আহমেদ। মাত্র ২৭ বছর বয়সে জাতীয় রাজনীতিতে তার শক্ত অবস্থান তৈরি হয়।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মুজিব বাহিনীর চারজন আঞ্চলিক প্রধানের একজন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ে তার সাংগঠনিক ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় রাজনৈতিক সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন। সেই সময় তিনি আওয়ামী লীগের তরুণ ও প্রভাবশালী নেতাদের অন্যতম ছিলেন।

আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা হিসেবে উত্থান

স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তোফায়েল আহমেদ। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি আরও আটবার সংসদ সদস্য হন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগের অনেক নেতার সঙ্গে তাকেও গ্রেপ্তার করা হয়। প্রায় ৩৩ মাস কারাভোগের পর তিনি মুক্তি পান এবং আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও তিনি ছিলেন অন্যতম সক্রিয় নেতা। বিভিন্ন রাজনৈতিক জোট গঠন ও আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল।

মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তোফায়েল আহমেদ শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় মেয়াদের সরকারে তিনি বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর গঠিত মন্ত্রিসভায় তাকে রাখা হয়নি। আবার ২০১৮ ও ২০২৪ সালের পরও তিনি মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এখান থেকেই তার দলীয় প্রভাব কমতে শুরু করে।

কেন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়ে পড়েন?

তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তার অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়া।

দলীয় সূত্র এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আশির দশকের শেষ দিকে শেখ হাসিনার সঙ্গে তার সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার পরবর্তী সময়ের ভূমিকা নিয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ে কিছু প্রশ্ন ও অসন্তোষ ছিল বলে ধারণা করা হয়।

এর পাশাপাশি তিনি দলের সাধারণ সম্পাদক হতে না পারার পরও কিছুটা হতাশ হয়ে পড়েছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।

যদিও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং পরে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, তবুও দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার আগের মতো প্রভাব ছিল না।

এক-এগারোর রাজনীতি ও সংস্কারপন্থী তকমা

২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার সঙ্গে তোফায়েল আহমেদও দলীয় সংস্কারের পক্ষে মত দেন।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, আব্দুর রাজ্জাক ও আমির হোসেন আমুর সঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগের সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিতি পান। যদিও পরবর্তীতে সেই উদ্যোগ সফল হয়নি, তবে এই অবস্থানের কারণে দলের ভেতরে তার গ্রহণযোগ্যতা কিছুটা কমে যায়।

অনেক বিশ্লেষকের মতে, এক-এগারোর সময়কার অবস্থানই তাকে দীর্ঘমেয়াদে দলীয় রাজনীতিতে কোণঠাসা করে দেয়।

শেষ জীবনের হতাশা ও রাজনৈতিক বাস্তবতা

রাজনৈতিক সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, জীবনের শেষ এক দশকেরও বেশি সময় তিনি নিজেকে কিছুটা অবহেলিত মনে করতেন। দলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাকে খুব কমই সম্পৃক্ত করা হতো।

শারীরিক অসুস্থতাও তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সীমিত করে দেয়। স্ট্রোকের কারণে শরীরের একাংশ অবশ হয়ে যায় এবং দীর্ঘদিন তাকে হুইলচেয়ারে চলাফেরা করতে হয়।

তবুও তিনি আওয়ামী লীগ ছাড়েননি। রাজনৈতিক মতাদর্শ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতি অবিচল থেকে শেষ দিন পর্যন্ত দলটির সঙ্গেই ছিলেন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে তোফায়েল আহমেদের উত্তরাধিকার

তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী। ছাত্রনেতা হিসেবে উত্থান, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্ব এবং দীর্ঘ সংসদীয় জীবন—সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র।

সমর্থক ও সমালোচকদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু একটি বিষয় নিয়ে দ্বিমত কম—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তোফায়েল আহমেদের অবদান অনস্বীকার্য। জীবনের শেষ সময়ে দলীয় রাজনীতিতে প্রভাব হারালেও, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের নেতা এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে তার নাম ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা।