বাংলাদেশের দেয়ালচিত্রের জগতে রহস্যময় এক নাম ‘সুবোধ’। গত এক দশকে রাজধানী ঢাকা থেকে দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া ‘হবেকি?’ সিরিজের এই গ্রাফিতি এবার দেখা গেল ভারতের সিকিমে। নতুন এই শিল্পকর্ম শুধু সাধারণ দেয়ালচিত্র নয়, বরং এটি সীমান্ত, রাজনীতি এবং সামাজিক বাস্তবতার প্রতীকী ভাষা হিসেবেই আলোচনায় এসেছে।
জুন মাসের শেষ দিনে ভারতের সিকিমের গ্যাংটক-রংপো সড়কের মাঝিতার নালা ব্রিজের একটি কংক্রিট দেয়ালে ফুটে উঠেছে নতুন এই গ্রাফিতি। প্রায় ২০ ফুট দীর্ঘ এই দেয়ালচিত্রটি স্প্রে পেইন্ট এবং স্টেনসিল পদ্ধতিতে তৈরি করা হয়েছে, যা ‘হবেকি?’ সিরিজের পরিচিত শিল্পশৈলীর অংশ।
চিত্রটিতে দেখা যায়, এলোমেলো লম্বা চুলের সুবোধ একটি ঝুলন্ত হ্যামকে শুয়ে আছেন। হ্যামকের দুই প্রান্ত বাঁধা রয়েছে কাঁটাতারের সঙ্গে। তার এক হাতে ধরা রয়েছে ওয়্যার কাটার, আর অন্য হাতটি হ্যামকের বাইরে ঝুলে আছে। ঠিক নিচে রাখা একটি বালতি পুরো দৃশ্যটিকে আরও প্রতীকী করে তুলেছে।
গ্রাফিতির একদম শেষ প্রান্তে রয়েছে শিল্পীর স্বাক্ষর—‘হবেকি?’।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকদিন ধরেই এই গ্রাফিতি দেয়ালে দেখা যাচ্ছে। তবে এর সময় এবং অবস্থান নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন আলোচনা।
এই চিত্রটি এমন সময়ে আঁকা হয়েছে, যখন ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে অনুপ্রবেশের অভিযোগে বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানো নিয়ে উত্তেজনা চলছে। একই সময়ে প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর ভারত আবার বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য ভিসা চালুর ঘোষণা দেয়।
শিল্পকর্মের ডকুমেন্টেশন করা প্রতিষ্ঠান Artcon-এর প্রতিষ্ঠাতা এআরকে রিপন জানান, এই গ্রাফিতির ভাবনায় সীমান্ত, কাঁটাতার, কাটাতার কাটার যন্ত্র এবং তিস্তার পানিবণ্টন ইস্যুর গভীর প্রতিফলন রয়েছে।
তার ভাষায়, রংপো মূলত সিকিমের প্রবেশদ্বার। প্রতিদিন এখানে চলাচল, অনুমতি এবং পরিচয় যাচাইয়ের মতো বিষয় ঘটে। ফলে এই জায়গায় সুবোধের উপস্থিতি কেবল একটি শিল্প নয়, বরং একটি সীমান্ত-বাস্তবতার ভাষ্য।
বাংলাদেশে ‘সুবোধ’ শুধু একটি চরিত্র নয়; এটি এক ধরনের সামাজিক প্রতীক। প্রতিবাদ, ব্যঙ্গ, হতাশা কিংবা প্রশ্ন—সবকিছুর বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এই চরিত্রের মাধ্যমে।
‘হবেকি?’ ট্যাগলাইনসহ সুবোধ সিরিজের প্রতিটি দেয়ালচিত্রে থাকে একটি বিশেষ বার্তা। এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো স্টেনসিল আর্ট—যেখানে ধাতব পাতের ছাঁচ ব্যবহার করে দ্রুত ও নিখুঁতভাবে ছবি আঁকা হয়।
অদ্ভুত বিষয় হলো, এত আলোচিত এই শিল্পীর পরিচয় আজও অজানা। কখনও তাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি, এমনকি কোনো কাজের মালিকানা দাবি করতেও সামনে আসেননি।
যদিও সুবোধ সিরিজের শুরু ঠিক কবে তা স্পষ্ট নয়, তবে ২০১৭ সালের দিকে এটি প্রথম ব্যাপকভাবে মানুষের নজরে আসে। তখন থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং শহরের রাস্তায় এটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও একসময় এই রহস্যময় শিল্পীর পরিচয় জানার চেষ্টা করেছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।
ঢাকার আগারগাঁওয়ে দেখা গিয়েছিল এই বিখ্যাত গ্রাফিতি। সেখানে সুবোধকে দেখা যায় খাঁচাবন্দি হলুদ সূর্য নিয়ে দৌড়াতে।
এখানে সুবোধকে হতাশ হয়ে বসে থাকতে দেখা যায়। তার হাতে সেই একই বন্দি সূর্য।
এই চিত্রে এক ছোট্ট মেয়ে সুবোধকে প্রশ্ন করছে। এটি ছিল ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের শক্তিশালী প্রতীক।
এই বার্তায় দেখা যায়, সুবোধ আবারও পালিয়ে যাচ্ছে, তবে এবার পেছনে তাকিয়ে আছে—যেন সমাজের প্রতি শেষবারের মতো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে।
এখানে সুবোধকে কারাগারের গরাদের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। বার্তাটি ছিল—‘পাপবোধ নিশ্চিন্তে মানুষের হৃদয়ে বাস করছে।’
সিকিমের নতুন এই গ্রাফিতি দেখে অনেকে মনে করছেন, এটি সরাসরি সীমান্ত রাজনীতি, মানুষের চলাচল, স্বাধীনতা এবং নিয়ন্ত্রণের প্রতীক। কাঁটাতারের সঙ্গে বাঁধা হ্যামক যেন বন্দি জীবনের ইঙ্গিত দেয়, আর হাতে থাকা কাটার হয়তো মুক্তির সম্ভাবনার প্রতীক।
সুবোধ বরাবরই সমাজের না বলা কথাগুলো দেয়ালে লিখে এসেছে। এবার সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের সিকিমে তার উপস্থিতি সেই বার্তাকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে গেল।

