সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট...

Homeবিশ্ব সংবাদট্রাম্পের হুঁশিয়ারির মধ্যেই ইরান-আমেরিকার তিন ঘণ্টার আলোচনা

ট্রাম্পের হুঁশিয়ারির মধ্যেই ইরান-আমেরিকার তিন ঘণ্টার আলোচনা

হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে তেহরান তাদের শর্তগুলো মার্কিন পক্ষের কাছে তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছাড় এবং যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ।

নিউজ বাংলা, আন্তর্জাতিক ডেক্স : জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন ঘিরে যখন ইরানকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ঠিক সেই সময় নিউইয়র্কে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘ তিন ঘণ্টার কূটনৈতিক আলোচনা হয়েছে। আলোচনায় ইরানের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার যুক্ত ছিলেন বলে মার্কিন পক্ষ জানিয়েছে। তবে ইরানের বক্তব্য অনুযায়ী, কাতারের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ হয়েছে।

বৈঠক নিয়ে ট্রাম্প ইতিবাচক মন্তব্য করলেও ইরান আলোচনায় নিজেদের আগের শর্তগুলোই তুলে ধরেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার সঙ্গে মার্কিন সামরিক চাপ, নৌ অবরোধ ও ইরানের জব্দ করা সম্পদ ফেরত দেওয়ার বিষয়গুলোকে যুক্ত করেছে তেহরান।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে মঙ্গলবার নিউইয়র্কে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, তাঁর প্রতিনিধিরা ইরানের সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টা বৈঠক করেছেন এবং আলোচনাটি ইতিবাচক ছিল।

ট্রাম্প নিজে ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন না। তাঁর বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার মার্কিন পক্ষের প্রতিনিধিত্ব করেন। ইরানের হয়ে আলোচনায় অংশ নেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।

মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বৈঠকে মধ্যস্থতাকারীরা দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগের কাজও করেছেন। উইটকফ পরে জানান, আলোচনা ছিল দীর্ঘ এবং গঠনমূলক। মধ্যস্থতাকারীরা পরবর্তী যোগাযোগ চালিয়ে যাবেন বলেও তিনি জানান।

এই বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের সামরিক সংঘাত ও কূটনৈতিক অচলাবস্থা। জুনের পর এটিই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের অন্যতম ঘটনা।

আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হিসেবে পরিচিত এই জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পরিবহন করা হয়। ফলে এই প্রণালীতে চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে তেহরান তাদের শর্তগুলো মার্কিন পক্ষের কাছে তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছাড় এবং যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ।

ইরানের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমিয়ে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ তুলে নিলে হরমুজ প্রণালী এক সপ্তাহের মধ্যে পুনরায় খুলে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। রয়টার্সও একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে একই ধরনের তথ্য জানিয়েছে।

তবে হরমুজ নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান এখনও পুরোপুরি এক হয়নি। ফলে শুধু নিউইয়র্কের এই বৈঠকের পরই প্রণালী স্বাভাবিক হয়ে যাবে এমন নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।

আলোচনার বিষয়ে ইতিবাচক সুর শোনা গেলেও ট্রাম্প একই সঙ্গে ইরানের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছেন। তাঁর বক্তব্য, ইরানের জন্য একটি চুক্তিতে পৌঁছানোই সুবিধাজনক।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণেও ট্রাম্প ইরান প্রসঙ্গে কঠোর অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তাঁর সামনে বড় একটি সিদ্ধান্ত রয়েছে ইরানের সঙ্গে সমঝোতার পথে যাওয়া, নাকি সামরিক পদক্ষেপ আরও বাড়ানো।

ট্রাম্পের বক্তব্যের একটি অংশে ইরানের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর সামরিক হুমকিও ছিল। তিনি চুক্তি না হলে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ‘ধ্বংস’ করার কথা বলেন। অন্যদিকে একই বক্তব্যে তিনি এমন একটি সমঝোতার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন, যার মাধ্যমে ইরান পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে যেতে পারে।

অর্থাৎ, ওয়াশিংটনের বর্তমান অবস্থানে একদিকে রয়েছে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার বার্তা, অন্যদিকে সামরিক চাপ অব্যাহত রাখার হুঁশিয়ারি।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধের অন্যতম কেন্দ্র হলো তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্র চায়, ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে না পারে এবং এ বিষয়ে একটি কার্যকর চুক্তি করা হয়।

ইরান অবশ্য দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ, নিষেধাজ্ঞা, সামরিক চাপ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা—সবগুলো বিষয়ই সম্ভাব্য চুক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে।

ট্রাম্প জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে আলোচনার কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর মতে, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখাই যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

ইরানের পক্ষ থেকে আলোচনায় শুধু হরমুজ প্রণালী নয়, যুদ্ধ বন্ধ এবং মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ কমানোর বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, মার্কিন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের সময় তেহরানের অবস্থান ও শর্তগুলো জানানো হয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধের অবসান, মার্কিন আগ্রাসী পদক্ষেপ বন্ধ, নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইরানের সম্পদ ছাড়ার বিষয় ছিল।

তেহরানের এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টিকে তারা বৃহত্তর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সমঝোতার অংশ হিসেবে দেখছে।

নিউইয়র্কের আলোচনায় কাতারের ভূমিকার কথাও সামনে এসেছে। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কাতারের মধ্যস্থতায় মার্কিন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে সরাসরি কূটনৈতিক সম্পর্কের সীমাবদ্ধতার কারণে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কাতার একই সময়ে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ করছে। দেশটি হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগে যুক্ত রয়েছে।

হরমুজ প্রণালী পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় এর গুরুত্ব অনেক। এই পথ দিয়ে তেল ও গ্যাস পরিবহনের বড় অংশ পরিচালিত হয়।

ফলে দীর্ঘ সময় ধরে এই জলপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে শুধু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্র নয়, এশিয়া, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়।

এই কারণেই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে সমঝোতা আন্তর্জাতিক মহলের অন্যতম প্রধান আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে।

তিন ঘণ্টার আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই কিছুটা কূটনৈতিক যোগাযোগের সুযোগ রেখেছে। মার্কিন পক্ষ আলোচনাকে ইতিবাচক ও গঠনমূলক হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে ইরানও নিজেদের শর্তগুলো স্পষ্ট করে দিয়েছে।

তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। হরমুজ প্রণালী, মার্কিন সামরিক অবরোধ, ইরানের সম্পদ, যুদ্ধের অবসান এবং পারমাণবিক কর্মসূচির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে দুই দেশের অবস্থানে পার্থক্য রয়েছে।

এর মধ্যেই ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমালে এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ প্রত্যাহার করলে হরমুজ প্রণালী দ্রুত পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে তারা প্রস্তুত।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ