স্টাফ রিপোর্টার, নিউজবাংলা ডেস্ক : রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই ও স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজতে জাতিসংঘে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
‘দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানের নতুন আহ্বান’ শীর্ষক বৈঠকটি রোহিঙ্গা সংকটের রাজনৈতিক ও মানবিক সমাধান নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা জোরদারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আয়োজন করা হয়। জাতিসংঘের ইউএন ওয়েব টিভির সূচি অনুযায়ী, অনুষ্ঠানটি ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক সময় সকাল ১০টা ১৫ মিনিটের দিকে শুরু হয় এবং এতে রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘস্থায়ী সমাধান নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ উদ্যোগে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতায় আয়োজিত এই বৈঠকে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন, মানবাধিকার এবং জবাবদিহির বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। বৈঠকটির মূল লক্ষ্য ছিল দীর্ঘদিন ধরে চলা এই সংকটের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ ধরে রাখা এবং সংকটের মূল কারণ মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান তাদের নিজ মাতৃভূমি মিয়ানমারে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের মধ্যেই নিহিত। জাতিসংঘের বাংলাদেশ কার্যালয়ও ২০২৬ সালের মানবিক সহায়তা পরিকল্পনায় রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসইভাবে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়াকে সংকটের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ও দীর্ঘস্থায়ী সমাধান হিসেবে উল্লেখ করেছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান জানিয়েছেন। বুধবারের বৈঠকে তিনি রোহিঙ্গা সংকটের বর্তমান পরিস্থিতি এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি শুধু মানবিক নয়, দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও যুক্ত। কক্সবাজারে দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বসবাস করছে। তাদের খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন হচ্ছে।
রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দীর্ঘদিনের সহিংসতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই শুধু শরণার্থীদের মানবিক সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমে সংকটের পূর্ণাঙ্গ সমাধান সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরির বিষয়টিও সামনে আনছে বাংলাদেশ।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের শুরু থেকেই মিয়ানমারের পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি খালিলুর রহমান মিয়ানমারবিষয়ক মহাসচিবের বিশেষ দূত জুলি বিশপের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে মিয়ানমারের মানবিক পরিস্থিতি, কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের অবস্থা এবং সংকটের মূল কারণ মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়।
এ ধরনের আলোচনা থেকে বাংলাদেশের প্রত্যাশা হলো, রোহিঙ্গা সংকটকে সাময়িক মানবিক সমস্যা হিসেবে না দেখে এর রাজনৈতিক ও মানবাধিকারভিত্তিক কারণগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
নিউইয়র্কের বৈঠকে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা বা ওআইসি এবং গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের পক্ষ থেকেও প্রতিনিধিত্ব ছিল। তুরস্ক ও কুয়েত যথাক্রমে এসব আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মের প্রতিনিধিত্ব করে।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত ভূমিকা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সংকটটি শুধু বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে মানবাধিকার, শরণার্থী সুরক্ষা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক জবাবদিহির মতো বিষয়ও জড়িত।
বুধবারের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশ্বনেতাদের সামনে রোহিঙ্গা সংকটের বাস্তবতা তুলে ধরেন। দীর্ঘদিন ধরে বাস্তুচ্যুত থাকা এই জনগোষ্ঠীর নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সক্রিয় ও সমন্বিত ভূমিকার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি সামনে আসে।
বাংলাদেশের অবস্থান হলো, রোহিঙ্গাদের শুধু সাময়িক আশ্রয় দিয়ে সমস্যার সমাধান করা যাবে না। তাদের নিজেদের দেশে নিরাপদে ফিরে যাওয়ার মতো পরিবেশ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যাবাসন হতে হবে স্বেচ্ছামূলক, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ।
এই অবস্থানের সঙ্গে মানবিক সহায়তার বিষয়টিও যুক্ত। কারণ প্রত্যাবাসনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে মঙ্গলবার জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালিহের সঙ্গেও বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান এবং তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের নিজ মাতৃভূমিতে নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবর্তনের বিকল্প নেই। একই সঙ্গে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়।
রোহিঙ্গা সংকট যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই মানবিক সহায়তার ওপর চাপ বাড়ছে। ২০২৬ সালের জন্য জাতিসংঘ ও অংশীদাররা রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং বাংলাদেশি আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জরুরি প্রয়োজন মেটাতে ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সহায়তার আবেদন জানিয়েছে। জাতিসংঘ বলেছে, রোহিঙ্গাদের মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে মানবিক সহায়তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন।
কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে বছরের পর বছর বসবাসের ফলে খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও জীবিকার মতো বিষয়গুলোও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে গেলে সংকটের মানবিক চাপ আরও বাড়তে পারে।



