সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট...

Homeবিশ্ব সংবাদবাংলাদেশ‘রাজনৈতিকভাবে নিশানা করা হয়েছে’, হু ছাড়ার পর মুখ খুললেন সায়মা ওয়াজেদ

‘রাজনৈতিকভাবে নিশানা করা হয়েছে’, হু ছাড়ার পর মুখ খুললেন সায়মা ওয়াজেদ

পদত্যাগের পর হু-এর মহাপরিচালক টেড্রস অ্যাডানম গেব্রিয়েসাসের বিরুদ্ধেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সায়মা। তাঁর প্রশ্ন, হু-এর প্রধানের বিরুদ্ধে যখন বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছিল, তখন তাঁকে ছুটিতে পাঠানো হয়নি। এমনকি সবেতন ছুটিতেও তাঁকে পাঠানো হয়নি বলে দাবি করেছেন সায়মা।

এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক অধিকর্তার পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছেন শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। তাঁর দাবি, শেখ হাসিনার মেয়ে হওয়ার কারণেই তাঁকে রাজনৈতিকভাবে নিশানা করা হয়েছে। একই সঙ্গে হু-এর মহাপরিচালক টেড্রস অ্যাডানম গেব্রিয়েসাসের নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

সায়মা ওয়াজেদ বুধবার ওই পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এর ঠিক এক দিন আগে, ৮ সেপ্টেম্বর, তাঁকে পদ থেকে সরানোর সুপারিশ করেছিল হু-এর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আঞ্চলিক কমিটি। এরপরই নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে সংবাদমাধ্যমে মুখ খোলেন তিনি।

‘নিউজ১৮’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সায়মা ওয়াজেদ সরাসরি দাবি করেন, তাঁর পারিবারিক পরিচয়ের কারণে তাঁকে রাজনৈতিকভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বিরোধীরাই তাঁকে নিশানা করেছেন।

সায়মার কথায়, তিনি শেখ হাসিনার কন্যা এবং সেই কারণেই তাঁকে রাজনৈতিকভাবে টার্গেট করা হয়েছে। তাঁর দাবি, বিষয়টি শুধুমাত্র পেশাগত বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে রাজনৈতিক প্রভাবও রয়েছে।

এই অভিযোগের মধ্যেই হু-এর গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে তাঁর পদত্যাগ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

পদত্যাগের পর হু-এর মহাপরিচালক টেড্রস অ্যাডানম গেব্রিয়েসাসের বিরুদ্ধেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সায়মা। তাঁর প্রশ্ন, হু-এর প্রধানের বিরুদ্ধে যখন বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছিল, তখন তাঁকে ছুটিতে পাঠানো হয়নি। এমনকি সবেতন ছুটিতেও তাঁকে পাঠানো হয়নি বলে দাবি করেছেন সায়মা।

তাহলে তাঁকেই কেন দীর্ঘ সময়ের জন্য বেতনহীন ছুটিতে রাখা হল, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

পদত্যাগপত্রেও গেব্রিয়েসাসের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা হারানোর কথা উল্লেখ করেছিলেন সায়মা। ফলে তাঁর পদত্যাগের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ও পেশাগত অসন্তোষের পাশাপাশি হু-এর নেতৃত্বের সঙ্গে মতপার্থক্যের বিষয়টিও সামনে এসেছে।

সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ওঠার পর দীর্ঘ সময় ধরে তিনি দায়িত্ব থেকে দূরে ছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় এক বছর তিনি বেতন বা সম্মানী ছাড়াই ছুটিতে ছিলেন।

পদত্যাগপত্রে নিজের আর্থিক সমস্যার কথাও তুলে ধরেছিলেন তিনি। সায়মার দাবি, দীর্ঘ সময় ধরে কোনও বেতন না পাওয়ায় তাঁর আর্থিক পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে ওঠে।

সাক্ষাৎকারে তিনি আরও জানান, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে তাঁর কোনও কাজ ছিল না। তদন্ত শেষ হওয়ার পরও তাঁকে কাজে ফেরানো হয়নি বলে অভিযোগ তাঁর।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই পরিস্থিতি তাঁকে মানসিকভাবেও ভেঙে দেয়। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাজের বাইরে থাকায় আর্থিক চাপও তৈরি হয়।

২০২৪ সালের অগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত শুরু হয়। বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনও তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে তদন্ত শুরু করেছিল।

এরপর ২০২৫ সালের জুলাইয়ে হু তাঁকে বেতনহীন ছুটিতে পাঠায়। পদত্যাগের আগ পর্যন্ত সেই ছুটিতেই ছিলেন তিনি।

সায়মার অভিযোগ, হু-এর শীর্ষ নেতৃত্ব বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল। এই যোগাযোগের বিষয়ে তাঁর কাছে প্রমাণ রয়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।

তাঁর মতে, কোনও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে একটি দেশের সরকারের যোগাযোগ থাকা স্বাভাবিক হলেও সেই যোগাযোগের ধরন নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। সায়মা দাবি করেছেন, হু ও বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের যোগাযোগ প্রচলিত কূটনৈতিক বিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে চিন সফরকে কেন্দ্র করে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও উঠেছিল। পাশাপাশি তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগও প্রকাশ্যে আসে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এসব অভিযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও আলোচনা হয়েছিল। তবে সায়মা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তাঁর আইনজীবীরা গত ৩ জুলাই হু-কে একটি চিঠি দিয়ে অভিযোগগুলোর জবাব দেন। সাক্ষাৎকারে সায়মা দাবি করেন, চিন সফর নিয়ে যে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল, তা থেকে তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণেই ওই সফর শেষ পর্যন্ত হয়নি বলেও জানান তিনি।

অর্থাৎ, তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযোগগুলো নিয়ে যে তদন্ত বা পর্যালোচনা হয়েছিল, সেটি শেষ হওয়ার পরও তাঁকে দায়িত্বে ফেরানো হয়নি।

সায়মা ওয়াজেদ ২০২৩ সালের নভেম্বরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ভোটে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক অধিকর্তা হিসেবে নির্বাচিত হন।

এরপর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁকে পাঁচ বছরের জন্য ওই পদে নিয়োগ দেয় হু। দায়িত্বটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একাধিক দেশের স্বাস্থ্যনীতি, জনস্বাস্থ্য এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে এই পদটির গুরুত্ব রয়েছে।

তবে দায়িত্ব গ্রহণের পর খুব বেশি সময় ওই পদে সক্রিয়ভাবে কাজ করার সুযোগ পাননি সায়মা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং পরবর্তী সময়ে বেতনহীন ছুটি তাঁর দায়িত্ব পালনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

সায়মার পদত্যাগপত্রে তাঁর সিদ্ধান্তের অন্যতম কারণ হিসেবে দীর্ঘ সময় বেতন ছাড়া ছুটিতে থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে। তিনি জানিয়েছেন, প্রায় এক বছর ধরে তিনি হু-এর নির্দেশে কোনও বেতন বা সম্মানী ছাড়াই ছুটিতে ছিলেন।

এই অবস্থায় তাঁর আর্থিক পরিস্থিতি ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাজের বাইরে থাকার কারণে ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

সাক্ষাৎকারে সায়মা বলেন, তদন্তপ্রক্রিয়ায় তিনি সম্পূর্ণ সহযোগিতা করেছিলেন এবং তদন্ত শেষ হয়ে গিয়েছিল। এরপরও পরিস্থিতির পরিবর্তন না হওয়ায় তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন।

তিনি আরও জানান, দীর্ঘ সময়ের এই পরিস্থিতিতে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এবং আর্থিকভাবে নিঃশেষিত হয়ে পড়েছিলেন।

পদত্যাগের পর নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েও কথা বলেছেন সায়মা। তাঁর বক্তব্য, তিনি আবার কাজে ফিরতে চান। বিশ্বের মানুষের জন্য ইতিবাচক কিছু করার ইচ্ছাও তাঁর রয়েছে।

দীর্ঘ সময়ের বিতর্ক, তদন্ত এবং বেতনহীন ছুটির পর হু-এর দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তকে তাই নিজের কর্মজীবনের নতুন অধ্যায় শুরুর পদক্ষেপ হিসেবেও দেখছেন তিনি।

তবে সায়মার রাজনৈতিক নিশানার অভিযোগ এবং হু-এর নেতৃত্ব নিয়ে তাঁর প্রশ্ন কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়ে ভবিষ্যতে আরও আলোচনা হতে পারে। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।

সব মিলিয়ে, সায়মা ওয়াজেদের পদত্যাগ শুধু হু-এর একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত, দুর্নীতির অভিযোগ এবং দুই পক্ষের পাল্টা বক্তব্য। ফলে বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নজর অব্যাহত থাকার সম্ভাবনাই বেশি।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ