সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট...

Homeআইন ও আদালতছবি ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্র নয়, হাইকোর্টের রুল খারিজ

ছবি ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্র নয়, হাইকোর্টের রুল খারিজ

আদালতের এ সিদ্ধান্তের ফলে ছবি ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির কোনো বিকল্প ব্যবস্থা চালুর পথ আপাতত বন্ধ থাকল। অর্থাৎ, জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়ার ক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় ছবি তোলার বিষয়টি বহাল থাকছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা, ৯ সেপ্টেম্বর : ছবি ছাড়া বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবহার করে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) দেওয়ার সুযোগ চেয়ে করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। এর ফলে বর্তমানে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ছবি সংযুক্ত করেই জাতীয় পরিচয়পত্র করতে হবে।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি মো. ইকবাল কবির ও বিচারপতি এস এম সাইফুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন।

আদালতের এ সিদ্ধান্তের ফলে ছবি ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির কোনো বিকল্প ব্যবস্থা চালুর পথ আপাতত বন্ধ থাকল। অর্থাৎ, জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়ার ক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় ছবি তোলার বিষয়টি বহাল থাকছে।

ছবি ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়ার সুযোগ চেয়ে ২০২২ সালে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন রাজধানীর শাহজাহানপুরের শান্তিবাগ এলাকার বাসিন্দা সুমাইয়া আহমাদ মুনা। তিনি আদালতকে জানান, ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী পর্দা পালন করায় তিনি ছবি তোলা থেকে বিরত থাকেন।

রিটে তার স্বামী মুহম্মদ আরিফুর রহমানকে অথরিটি দেওয়া হয়। আবেদনকারীর দাবি ছিল, ছবি তোলার বাধ্যবাধকতার কারণে তিনি জাতীয় পরিচয়পত্র করতে পারছেন না। এর ফলে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সেবা ও সুযোগ-সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রেও সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।

এর আগে একই বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে লিখিত আবেদন করেছিলেন সুমাইয়া আহমাদ মুনা। কিন্তু সেই আবেদনের কোনো কার্যকর নিষ্পত্তি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তিনি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন।

২০২২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশনের কাছে দেওয়া আবেদনে সুমাইয়া আহমাদ মুনা নিজেকে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ও পর্দানশীন মুসলিম নারী হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, ধর্মীয় বিধান মেনে চলার কারণে কোনো ধরনের ছবি তোলা থেকে বিরত থাকেন।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, ছবি না থাকায় তিনি জাতীয় পরিচয়পত্র পাননি। অথচ এনআইডি না থাকায় বিভিন্ন নাগরিক সেবা গ্রহণে তাকে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।

এ কারণে তিনি ছবি ছাড়া বিকল্প কোনো পদ্ধতিতে জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশনের কাছে অনুরোধ করেন। তবে সেই আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়ায় তিনি আদালতে রিট করেন।

রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে ২০২২ সালের ৬ মার্চ হাইকোর্ট একটি রুল জারি করেন। ওই রুলে ছবি ছাড়া বিকল্প পরিচয় পদ্ধতি এবং বায়োমেট্রিক ফিচার ব্যবহার করে জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়।

মূলত আবেদনকারীর ধর্মীয় বিশ্বাস ও পর্দা পালনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ছবি ছাড়াই পরিচয় শনাক্ত করার কোনো প্রযুক্তিগত বা বায়োমেট্রিক ব্যবস্থা করা সম্ভব কি না, সেই প্রশ্নটি আদালতের সামনে আসে।

দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে বুধবার সেই রুল খারিজ করে দেন হাইকোর্ট। ফলে ছবি ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার দাবিটি আদালতের এই পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা পেল না।

রুলের শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষ এই আবেদনকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে দাবি করেছিল। রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষ থেকে জাতীয় পরিচয় ও নাগরিক সেবা ব্যবস্থায় ছবি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরা হয়।

রাষ্ট্রপক্ষ আদালতকে উদাহরণ দিয়ে জানিয়েছিল, হজ পালনের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে। একইভাবে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা বা আর্থিক সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও পরিচয় যাচাইয়ের জন্য ছবি গুরুত্বপূর্ণ।

রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি ছিল, ছবি ছাড়া শুধু অন্য কোনো পরিচয় শনাক্তকরণ পদ্ধতির ওপর নির্ভর করলে পরিচয় নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে একজনের অর্থ বা সম্পদ অন্য কেউ ব্যবহার করলে সেটি শনাক্ত করার ক্ষেত্রে সমস্যার আশঙ্কা রয়েছে।

ছবি ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্রের বিকল্প হিসেবে বায়োমেট্রিক প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রস্তাবও রিটে উঠে আসে। তবে রাষ্ট্রপক্ষ বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহের বিষয়েও প্রশ্ন তোলে।

বায়োমেট্রিক শনাক্তকরণে সাধারণত আঙুলের ছাপ, চোখের আইরিশসহ বিভিন্ন শারীরিক বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য ছিল, আইরিশ শনাক্তকরণ করতে হলে চোখের নির্দিষ্ট অংশ ক্যামেরার সামনে আনতে হয়। সে ক্ষেত্রে আবেদনকারীর পর্দা পালনের বিষয়টি কীভাবে সমন্বয় করা হবে, সেটিও একটি বাস্তব প্রশ্ন।

অর্থাৎ, শুধু ছবি বাদ দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না; বিকল্প বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতেও ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় গোপনীয়তার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে—রাষ্ট্রপক্ষ শুনানিতে এমন যুক্তি তুলে ধরে।

হাইকোর্ট রুল খারিজ করায় ছবি ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির জন্য নির্বাচন কমিশনকে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হলো না। ফলে প্রচলিত নিয়মেই এনআইডি তৈরির প্রক্রিয়া চলবে।

রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে থাকা আইনজীবী কামাল হোসেন মিয়াজী বলেন, আদালত রুল খারিজ করেছেন। এর ফলে ছবি ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্র হবে না।

জাতীয় পরিচয়পত্র বাংলাদেশের নাগরিকদের পরিচয় যাচাইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নথি। ভোটার তালিকা, ব্যাংকিং সেবা, সরকারি বিভিন্ন সুবিধা, সম্পত্তি সংক্রান্ত কাজসহ নানা ক্ষেত্রে এনআইডি ব্যবহার করা হয়।

পরিচয়পত্রে ছবি থাকলে একজন ব্যক্তির পরিচয় সরাসরি যাচাই করা তুলনামূলক সহজ হয়। পাশাপাশি জালিয়াতি বা অন্যের পরিচয় ব্যবহার ঠেকাতেও ছবি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অন্যদিকে, ব্যক্তিগত বিশ্বাস, ধর্মীয় অনুশাসন ও গোপনীয়তার বিষয়টিও নাগরিক অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে ছবি ছাড়া এনআইডির দাবি ঘিরে মূলত নাগরিক সেবা ও ব্যক্তিগত ধর্মীয় স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্যের প্রশ্ন সামনে এসেছিল।

হাইকোর্টের বুধবারের রায়ের পর ছবি ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার বিষয়ে জারি করা রুলটি আর বহাল থাকল না। ফলে আবেদনকারীর উত্থাপিত দাবির ভিত্তিতে বিকল্প পরিচয়পত্র ব্যবস্থা চালুর কোনো আদালতীয় নির্দেশনা থাকছে না।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ