রাহুল রাহা, আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আবারও যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল শুরু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক এগোলে আগামী অক্টোবর থেকেই দুই দেশের মধ্যে মৈত্রী, বন্ধন ও মিতালি এক্সপ্রেসের চাকা ফের গড়াতে পারে। দুর্গাপুজোর আগে এই পরিষেবা চালু হলে দুই বাংলার মানুষের যাতায়াতে নতুন করে গতি আসবে।
দুই দেশের রেল কর্তৃপক্ষের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। মঙ্গলবার ঢাকায় শুরু হচ্ছে ভারত-বাংলাদেশের দু’দিনের বার্ষিক আন্তঃসরকার রেলওয়ে বৈঠক। এই বৈঠকেই আন্তঃদেশীয় ট্রেন পরিষেবা পুনরায় চালুর বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে রেল সূত্রের খবর।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে রেল যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তিনটি ট্রেন হলো মৈত্রী এক্সপ্রেস, বন্ধন এক্সপ্রেস এবং মিতালি এক্সপ্রেস। দীর্ঘদিন ধরে এই ট্রেনগুলো দুই দেশের নাগরিকদের মধ্যে যোগাযোগ সহজ করেছে।
রেল কর্তৃপক্ষের বৈঠকে তিনটি ট্রেন পুনরায় চালুর বিষয়টি গুরুত্ব পাবে বলে জানা গেছে। ভারতীয় রেল কর্তৃপক্ষও এই পরিষেবা ফের চালু করার বিষয়ে আগ্রহী বলে সূত্রের দাবি।
তবে শুধু রেল মন্ত্রকের সিদ্ধান্তেই পরিষেবা চালু করা সম্ভব নয়। দুই দেশের বিদেশ, স্বরাষ্ট্র এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রকের মতামতও প্রয়োজন হবে। মঙ্গলবারের বৈঠকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের প্রতিনিধিদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। ফলে বৈঠকে আলোচনা হলেও শেষ সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক পর্যায়েই নেওয়া হবে।
সূত্রের খবর, কূটনৈতিক পর্যায়ে সবুজ সংকেত মিললে আগামী অক্টোবর থেকেই মৈত্রী, বন্ধন ও মিতালি এক্সপ্রেস চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
অক্টোবর মাসেই দুর্গাপুজো। ফলে পুজোর আগে ট্রেন পরিষেবা চালু হলে দুই বাংলার বহু মানুষ উপকৃত হবেন। বিশেষ করে চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা, আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা করা কিংবা পর্যটনের জন্য ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে যাতায়াত করা যাত্রীদের জন্য এটি বড় স্বস্তির খবর হতে পারে।
ট্রেন পরিষেবা বন্ধ থাকায় এতদিন যাত্রীদের বিকল্প পরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক হলে তুলনামূলক সহজ ও সাশ্রয়ী পথে দুই দেশের মধ্যে যাতায়াতের সুযোগ আবার তৈরি হবে।
শুধু বন্ধ থাকা ট্রেন চালু করাই নয়, ভারত-বাংলাদেশের রেল বৈঠকে নতুন ট্রেন পরিষেবা নিয়েও প্রস্তাব দিতে পারে বাংলাদেশ।
রাজশাহী থেকে কলকাতার মধ্যে একটি নতুন যাত্রীবাহী ট্রেন চালুর প্রস্তাব আলোচনায় আসতে পারে বলে জানা গেছে। এই ট্রেন চালু হলে উত্তর-পশ্চিম বাংলাদেশের যাত্রীদের কলকাতার সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ আরও সহজ হবে।
রাজশাহী ও কলকাতার মধ্যে যাতায়াতকারী মানুষের দীর্ঘদিনের একটি বড় চাহিদা পূরণ হতে পারে এই পরিষেবার মাধ্যমে। পাশাপাশি দুই দেশের পর্যটন ও ব্যবসায়িক যোগাযোগও আরও বাড়তে পারে।
ঢাকা-কলকাতা মৈত্রী এক্সপ্রেসের রুট পরিবর্তনের বিষয়েও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আগ্রহ প্রকাশ করা হতে পারে। বর্তমানে ট্রেনটি যমুনা সেতু হয়ে চলাচল করে।
বাংলাদেশ চাইছে, ভবিষ্যতে ঢাকা-কলকাতা মৈত্রী এক্সপ্রেসকে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে চালানো যায় কি না, সেই সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হোক। পদ্মা সেতু হয়ে ট্রেন চললে ঢাকা ও দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে কলকাতার রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে এই রুট পরিবর্তনের বিষয়টি বাস্তবায়ন করতে হলে প্রযুক্তিগত, পরিচালনাগত এবং দুই দেশের রেল কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন হবে। তাই এটি দ্রুত বাস্তবায়ন হবে কি না, তা বৈঠকের আলোচনার ওপর নির্ভর করবে।
ঢাকা ও কলকাতার মধ্যে রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে মৈত্রী এক্সপ্রেসের গুরুত্ব অনেক বেশি। ২০০৮ সালের ১৪ এপ্রিল, বাংলা নববর্ষের দিনে এই ট্রেন পরিষেবা চালু হয়।
এরপর ২০১৭ সালের ৯ নভেম্বর খুলনা ও কলকাতার মধ্যে শুরু হয় বন্ধন এক্সপ্রেস। দুই দেশের মধ্যে রেল যোগাযোগ আরও বিস্তৃত করতে ২০২২ সালের ১ জুন ঢাকা ও নিউ জলপাইগুড়ির মধ্যে চালু করা হয় মিতালি এক্সপ্রেস।
এই তিনটি ট্রেনের মাধ্যমে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নিয়মিত যাত্রী যাতায়াত করতেন। বিশেষ করে চিকিৎসা, ব্যবসা, শিক্ষা, পর্যটন ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করার ক্ষেত্রে ট্রেনগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় দুই দেশের রেল যোগাযোগে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। ওই সময় থেকেই মৈত্রী, বন্ধন ও মিতালি এক্সপ্রেসের পরিষেবা স্থগিত হয়ে যায়।
এরপর বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দুই দেশের সম্পর্ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও নতুন সমীকরণ তৈরি হয়। দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ থাকা আন্তঃদেশীয় রেল পরিষেবা পুনরায় চালুর বিষয়টিও সেই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে রেল যোগাযোগ শুধু যাত্রী পরিবহনের মাধ্যম নয়। দুই দেশের মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এর বড় ভূমিকা রয়েছে।
ঢাকা থেকে কলকাতা কিংবা খুলনা থেকে কলকাতা যাওয়ার ক্ষেত্রে ট্রেন অনেক যাত্রীর কাছে সুবিধাজনক বিকল্প। বাস বা বিমানের তুলনায় অনেকের কাছে রেলপথে যাতায়াত বেশি স্বস্তিদায়ক এবং ব্যয়সাশ্রয়ী হতে পারে।
বিশেষ করে দুর্গাপুজো, ঈদ বা অন্যান্য উৎসবের সময় দুই বাংলার মানুষের মধ্যে যাতায়াত বাড়ে। তাই অক্টোবরের মধ্যে রেল পরিষেবা চালু হলে উৎসবের মৌসুমে যাত্রীদের জন্য তা বড় স্বস্তি নিয়ে আসতে পারে।
তবে এখনই ট্রেন পরিষেবা চালু হচ্ছে—এমন চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি। মঙ্গলবার শুরু হওয়া ভারত-বাংলাদেশের আন্তঃসরকার রেলওয়ে বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মতামত এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই পরিষেবা চালুর দিনক্ষণ নির্ধারিত হবে।
ফলে মৈত্রী, বন্ধন ও মিতালি এক্সপ্রেস কবে থেকে আবার যাত্রী নিয়ে ছুটবে, তা জানতে আরও কিছুটা অপেক্ষা করতে হবে। তবে অক্টোবর থেকে পরিষেবা ফের চালুর সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় দুই বাংলার যাত্রীদের মধ্যে ইতিমধ্যেই আশার সঞ্চার হয়েছে।



