রুপক মূখার্জী,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : দিল্লির সত্য নিকেতনে ভয়াবহ ভবন ধসের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬। এখনও পর্যন্ত ১১ জনকে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও আরও বেশ কয়েকজন সেখানে আটকে রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আহতদের মধ্যে দু’জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
প্রাথমিক তদন্তে অনুমান, টানা বর্ষণের মধ্যে বহুতলটির বেসমেন্টে নির্মাণকাজ চলছিল। বেসমেন্টে জল জমে থাকা অবস্থায় ওই কাজ চলার কারণে ভবনের ভিত দুর্বল হয়ে থাকতে পারে। সেই কারণেই ছ’তলা ভবনটি হঠাৎ ভেঙে পড়ে বলে তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান।
ঘটনার পর ইতিমধ্যেই উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিখোঁজ বাড়ির মালিকের সন্ধানে তল্লাশি শুরু করেছে পুলিশ।
দিল্লির বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ ক্যাম্পাসের কাছে সত্য নিকেতন ও তার আশপাশের এলাকায় বহু বাড়ি মেস ও পেইং গেস্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বেশ কিছু ভবনের নিচেই রয়েছে বেসমেন্ট।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, শুক্রবার থেকে দিল্লিতে টানা বৃষ্টির জেরে ওই ভবনের নিচে জল জমেছিল। সেই অবস্থাতেই বেসমেন্টে নির্মাণকাজ চলছিল বলে জানা গিয়েছে।
তদন্তকারীদের আশঙ্কা, জল জমে থাকা অবস্থায় নির্মাণকাজ চলায় ভবনের ভিত বা কাঠামোগত অংশ দুর্বল হয়ে থাকতে পারে। শেষ পর্যন্ত সেই দুর্বলতার জেরেই বহুতলটি ধসে পড়ে থাকতে পারে।
তবে এটি এখনও তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ের অনুমান। ভবন ধসের প্রকৃত কারণ জানতে বিস্তারিত তদন্ত চলছে।
ভবনটির নির্মাণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পুরসভার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, আবাসিক ভবনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট উচ্চতার সীমা রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী রেসিডেন্সিয়াল বিল্ডিংয়ের সর্বোচ্চ উচ্চতা ১৭.৫ মিটার হওয়ার কথা।
অভিযোগ, দুর্ঘটনাগ্রস্ত ভবনটির উচ্চতা সেই সীমার তুলনায় অনেক বেশি ছিল। ফলে নির্মাণের সময় নিয়ম মানা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও তদন্ত শুরু হয়েছে।
বেসমেন্টে নির্মাণকাজ এবং ভবন তৈরির ক্ষেত্রে সম্ভাব্য নিয়ম লঙ্ঘনের বিষয়টি তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দুর্ঘটনাগ্রস্ত ভবনটি মূলত পেইং গেস্ট বা মেস হিসেবে ব্যবহৃত হত বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে। সেখানে বহু পড়ুয়া থাকতেন।
রবিবার ছুটির দিন হওয়ায় অনেক পড়ুয়াই সেই সময় ভবনের ভিতরে ছিলেন। ফলে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এক প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, দুর্ঘটনার পর তিনি ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে ধ্বংসস্তূপের ভিতর থেকে বেশ কয়েকজনের আর্তনাদ শুনতে পেয়েছিলেন।
স্থানীয়দের একাংশের দাবি, ওই ভবনে অন্তত ৫০ জন পড়ুয়া থাকতে পারেন। তবে ধ্বংসস্তূপের নিচে ঠিক কতজন আটকে রয়েছেন, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
রবিবার দুপুর দেড়টা নাগাদ দিল্লির চাণক্যপুরীর কাছে মোতিবাগ এলাকায় ভারী বৃষ্টির মধ্যে আচমকাই ভবনটি ভেঙে পড়ে।
খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দমকল বাহিনীর আটটি ইঞ্জিন ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। পরে উদ্ধারকাজ জোরদার করতে আরও বেশ কয়েকটি ইঞ্জিন পাঠানো হয়।
উদ্ধারকারী দল ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে থাকা মানুষদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ভারী ধ্বংসাবশেষের কারণে উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে।
এদিকে আহতদের দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। গুরুতর আহত দু’জনের অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
দুর্ঘটনার পর থেকেই বাড়ির মালিকের কোনও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। পুলিশ জানিয়েছে, মালিকের খোঁজে একাধিক তদন্তকারী দল গঠন করা হয়েছে।
জানা গিয়েছে, অভিযুক্ত বা বাড়ির মালিকের বাড়ি গুরুগ্রামে। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে এবং সম্ভাব্য বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
ভবনটির নির্মাণ, বেসমেন্টে চলা কাজ এবং নিরাপত্তা বিধি মানা হয়েছিল কি না—সব বিষয়ই তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
ভয়াবহ এই দুর্ঘটনার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ভবন ধসের আগে সেখানে কী ধরনের নির্মাণকাজ চলছিল, কার অনুমতিতে সেই কাজ হচ্ছিল এবং ভবনটির নকশা ও নির্মাণে কোনও অনিয়ম ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বর্ষার সময় বেসমেন্টে জল জমে থাকার পরও নির্মাণকাজ চালানো হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তকারীদের নজরে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা এবং নির্মাণবিধি মেনে চলার বিষয়টি তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
দিল্লির সত্য নিকেতনে ভবন ধসের ঘটনায় শোকপ্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন। পাশাপাশি দুর্ঘটনাস্থলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্ধার ও সহায়তার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
রাজনৈতিক মহলেও এই দুর্ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বলেন, প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবন অত্যন্ত মূল্যবান। যে কোনও পরিস্থিতিতে তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে ঘটনাটিকে অত্যন্ত বেদনাদায়ক বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, যথাযথ সতর্কতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলে এমন দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতে পারত।
এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মানুষ আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা রয়েছে। ফলে উদ্ধারকারী দল দ্রুত ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে জীবিতদের সন্ধান করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
দিল্লির এই দুর্ঘটনা বর্ষার সময়ে নির্মাণকাজ, বেসমেন্টে জল জমা এবং ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভবন ধসের প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে বেসমেন্টে নির্মাণকাজ, জল জমে থাকা এবং সম্ভাব্য নির্মাণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়গুলি এখন তদন্তের কেন্দ্রে রয়েছে।
সবচেয়ে বড় লক্ষ্য এখন ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের দ্রুত উদ্ধার করা এবং আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা।



