সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট...

Homeএক্সক্লুসিভএভারেস্ট বেস ক্যাম্পে প্রতিদিন ৬ হাজার লিটার মূত্র, বিপদে খুম্বু হিমবাহ

এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে প্রতিদিন ৬ হাজার লিটার মূত্র, বিপদে খুম্বু হিমবাহ

গবেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বেস ক্যাম্পে প্রতিদিন প্রায় ৬ হাজার লিটার মূত্র তৈরি হতে পারে। এর একটি অংশ যদি যথাযথভাবে সংরক্ষণ বা নিষ্কাশন না করে হিমবাহের কাছাকাছি এলাকায় ফেলা হয়, তাহলে স্থানীয় পরিবেশের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে।

রুপক মূখার্জী,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টে মানুষের আনাগোনা যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে পরিবেশের ওপর চাপ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ গলে যাওয়ার বিষয়টি বহুদিন ধরেই উদ্বেগের কারণ। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে আরও একটি অপ্রত্যাশিত বিষয়—মানুষের প্রস্রাব

প্রতি বছর পর্বতারোহণের মরসুমে এভারেস্ট বেস ক্যাম্প হয়ে ওঠে অত্যন্ত ব্যস্ত এলাকা। এভারেস্ট জয়ের উদ্দেশ্যে আসা পর্বতারোহী ও শেরপাদের পাশাপাশি সেখানে ভিড় করেন ট্রেকার এবং পর্যটকরাও। এই বিপুল মানুষের উপস্থিতির ফলে স্থানীয় পরিবেশের ওপর তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এভারেস্ট বেস ক্যাম্পের কাছেই থাকা খুম্বু হিমবাহ সেই চাপের অন্যতম শিকার।

কীভাবে হিমবাহের ক্ষতি করছে মানুষের প্রস্রাব?

এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে কয়েক মাস ধরে বিপুল সংখ্যক মানুষ অবস্থান করেন। তীব্র ঠান্ডার মধ্যে তাঁদের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে বিপুল পরিমাণ পানি ও জ্বালানি ব্যবহার হয়। একই সঙ্গে তৈরি হয় প্রচুর পরিমাণে বর্জ্য এবং মূত্র।

গবেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বেস ক্যাম্পে প্রতিদিন প্রায় ৬ হাজার লিটার মূত্র তৈরি হতে পারে। এর একটি অংশ যদি যথাযথভাবে সংরক্ষণ বা নিষ্কাশন না করে হিমবাহের কাছাকাছি এলাকায় ফেলা হয়, তাহলে স্থানীয় পরিবেশের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে।

মানুষের শরীর থেকে বের হওয়ার সময় মূত্রের তাপমাত্রা আশপাশের বরফের তুলনায় বেশি থাকে। ফলে বরফের ওপর সরাসরি জমা হলে স্থানীয়ভাবে গলন প্রক্রিয়ায় কিছুটা প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ মূলত এই স্থানীয় উষ্ণতা ও দূষণের প্রভাবকে ঘিরেই।

তবে খুম্বু হিমবাহের গলনের প্রধান কারণ হিসেবে বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়। মানুষের মূত্রকে সেই বৃহত্তর প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত একটি স্থানীয় পরিবেশগত চাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে মানুষের ভিড়ই বড় চ্যালেঞ্জ

এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে প্রতি বছর পর্যটক ও পর্বতারোহীর সংখ্যা বাড়ছে। পর্বতারোহণের মরসুমে সেখানে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মানুষ অবস্থান করেন।

তথ্য অনুযায়ী, একসঙ্গে প্রায় দেড় হাজারেরও বেশি মানুষ বেস ক্যাম্পে থাকতে পারেন। এত মানুষের জন্য খাবার তৈরি, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং প্রচণ্ড ঠান্ডায় শরীর গরম রাখার জন্য প্রচুর জ্বালানি প্রয়োজন হয়।

গ্যাস, কেরোসিনসহ বিভিন্ন জ্বালানি পোড়ানোর ফলে কার্বন নির্গমন ও স্থানীয় তাপমাত্রার ওপরও প্রভাব পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিষয়টিও হিমবাহের জন্য উদ্বেগের।

শুধু প্রস্রাব নয়, জ্বালানির ব্যবহারও উদ্বেগের

এভারেস্টের মতো দুর্গম এলাকায় বিদ্যুৎ ও তাপের ব্যবস্থা করা সহজ নয়। ফলে বেস ক্যাম্পে বিভিন্ন কাজে জ্বালানি পোড়াতে হয়।

গ্যাস ও কেরোসিনের মতো জ্বালানি ব্যবহারের ফলে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হয়। পাশাপাশি কালো কার্বন বা ‘ব্ল্যাক কার্বন’ বরফের ওপর জমলে সূর্যের তাপ বেশি শোষিত হতে পারে। এর ফলে বরফ গলার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তাই গবেষকদের উদ্বেগ শুধু মানুষের মূত্রকে ঘিরে নয়। বেস ক্যাম্পে মানুষের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি, জ্বালানি ব্যবহার, বর্জ্য এবং অন্যান্য মানবসৃষ্ট কার্যকলাপ—সব মিলিয়েই খুম্বু হিমবাহের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

জলবায়ু পরিবর্তনই সবচেয়ে বড় হুমকি

হিমালয়ের হিমবাহগুলির ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা চলছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, তুষারপাতের ধরনে পরিবর্তন এবং বরফ গলার হার বৃদ্ধি—সবই হিমালয়ের পরিবেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

খুম্বু হিমবাহও সেই পরিবর্তনের বাইরে নয়। ফলে এভারেস্টে পর্যটন ও পর্বতারোহণ যত বাড়ছে, ততই স্থানীয় পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এভারেস্টের মতো সংবেদনশীল পরিবেশে মানুষের উপস্থিতি সম্পূর্ণ বন্ধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু পর্যটন ও পর্বতারোহণের সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা জরুরি।

পরিবেশ রক্ষায় প্রয়োজন কার্যকর ব্যবস্থা

এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে মানুষের বর্জ্য ও মূত্র ব্যবস্থাপনা আরও উন্নত করা, জ্বালানির ব্যবহার কমানো এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। একই সঙ্গে পর্যটক ও পর্বতারোহীদেরও পরিবেশের বিষয়ে আরও সচেতন হতে হবে।

কারণ এভারেস্ট শুধু একটি পর্বতশৃঙ্গ নয়, হিমালয়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবেশব্যবস্থার অংশ। জলবায়ু পরিবর্তনের বড় চাপের মধ্যে থাকা এই অঞ্চলে মানুষের ছোট ছোট কর্মকাণ্ডও দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই মানুষের প্রস্রাবের মতো অপ্রত্যাশিত বিষয় সামনে আসা আসলে একটি বড় বার্তাই দিচ্ছে—এভারেস্টের পরিবেশ রক্ষায় শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই নয়, পর্যটন ও পর্বতারোহণের প্রতিটি ক্ষেত্রেই দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ