রুপক মূখার্জী,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : ট্যাটু এখন অনেকের কাছেই শরীর সাজানোর অন্যতম মাধ্যম। কেউ পছন্দের ছবি, কেউ প্রিয় মানুষের নাম, আবার কেউ বিশেষ কোনও স্মৃতি ধরে রাখতে শরীরে ট্যাটু করান। কিন্তু এক মা তাঁর হাতে যে ট্যাটু করিয়েছেন, তার পিছনে রয়েছে এমন এক গল্প, যা নিছক ফ্যাশনের নয়—বরং সন্তানের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের।
আমেরিকার এক মা জেসিকা তাঁর হাতে একটি কম্পিউটার কিবোর্ডের ট্যাটু করিয়েছেন। প্রথম দেখায় বিষয়টি হয়তো অদ্ভুত মনে হতে পারে। কিন্তু এর পিছনে রয়েছে তাঁর ১১ বছরের ছেলে হান্টারের সঙ্গে যোগাযোগের এক হৃদয়স্পর্শী গল্প।
কথা বলতে পারে না ছেলে, ট্যাবেই মনের কথা জানায়
হান্টার অটিস্টিক এবং সে কথা বলতে পারে না। নিজের প্রয়োজন, ইচ্ছা কিংবা মনের কথা জানাতে তাই তাকে লিখে যোগাযোগ করতে হয়। এজন্য ট্যাবই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের মাধ্যম।
মায়ের সঙ্গে বাইরে খেতে গেলে হান্টার সাধারণত ট্যাব ব্যবহার করেই জানায় সে কী খেতে চায় বা কী বলতে চায়। প্রযুক্তির সাহায্যে নিজের ভাবনা প্রকাশ করতে পারা তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু একদিন রেস্তরাঁয় গিয়ে ঘটে বিপত্তি।
অর্ডার দেওয়ার আগেই শেষ ট্যাবের ব্যাটারি
মা জেসিকা ছেলেকে নিয়ে খাবার খেতে গিয়েছিলেন। অর্ডার দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার সময়ই দেখা যায়, হান্টারের সঙ্গে থাকা ট্যাবটির ব্যাটারি শেষ হয়ে গিয়েছে।
ফলে আচমকাই বন্ধ হয়ে যায় হান্টারের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। ট্যাব কাজ না করায় সে কী খেতে চায়, সেটিও স্বাভাবিকভাবে মাকে জানাতে পারছিল না।
তবে হান্টার থেমে থাকেনি। রেস্তরাঁর একটি ন্যাপকিন নিয়ে তাতেই অক্ষর লিখে নিজের পছন্দের খাবারের কথা মাকে জানায়।
এই ছোট্ট ঘটনাটিই জেসিকার চিন্তার জগতে বড় পরিবর্তন এনে দেয়।
ট্যাব সবসময় সঙ্গে থাকলেও ব্যাটারি শেষ হতে পারে
সেদিনের ঘটনা জেসিকাকে বুঝিয়ে দেয়, প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করা প্রয়োজন হলেও সেটিই একমাত্র ভরসা হতে পারে না। কারণ ট্যাবের ব্যাটারি শেষ হয়ে যেতে পারে, যন্ত্র নষ্ট হতে পারে কিংবা কোনও কারণে সেটি ব্যবহার করা সম্ভব নাও হতে পারে।
কিন্তু হান্টারের তো সবসময় নিজের কথা জানানোর একটি উপায় প্রয়োজন।
সেই ভাবনা থেকেই জেসিকা এমন একটি বিকল্প যোগাযোগের ব্যবস্থা করার সিদ্ধান্ত নেন, যা কখনও ব্যাটারি শেষ হওয়ার কারণে বন্ধ হবে না।
মায়ের হাতে ফুটে উঠল কিবোর্ড
এরপরই ট্যাটু আর্টিস্টের কাছে গিয়ে নিজের হাতে একটি কম্পিউটার কিবোর্ডের নকশা করান জেসিকা।
এই কিবোর্ডের সাহায্যে হান্টার প্রয়োজনে মায়ের হাতের অক্ষর দেখিয়ে নিজের কথা বোঝাতে পারবে—এমনটাই ছিল ভাবনা।
অর্থাৎ, ট্যাবের ব্যাটারি শেষ হয়ে গেলেও যোগাযোগের রাস্তা যেন বন্ধ না হয়। মায়ের হাতেই যেন থেকে যায় একটি বিকল্প কিবোর্ড।
জেসিকার কাছে এই ট্যাটু কোনও ফ্যাশন স্টেটমেন্ট নয়। এটি তাঁর ছেলের প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা এক বিশেষ ব্যবস্থা।
সৌন্দর্যের চেয়ে সন্তানের প্রয়োজনই বড়
শরীরে ট্যাটু করানোর ক্ষেত্রে অনেকেই নকশা, সৌন্দর্য কিংবা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি বিবেচনা করেন। কিন্তু জেসিকার কাছে এসবের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাঁর সন্তানের স্বাভাবিকভাবে নিজের কথা জানানোর সুযোগ।
ছেলের কথা বলতে না পারার বিষয়টি মাথায় রেখে তিনি এমন একটি সমাধান বেছে নিয়েছেন, যা একই সঙ্গে ব্যক্তিগত এবং ব্যবহারিক।
একজন মায়ের এই উদ্যোগই এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের মন ছুঁয়ে যাচ্ছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশংসার ঝড়
ঘটনাটি সামনে আসার পর জেসিকার এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই তাঁর উদ্যোগকে সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসা, সহমর্মিতা এবং দায়িত্ববোধের অসাধারণ উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
আমেরিকার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ঘটনাটি আলোচনায় এসেছে। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন জায়গার মানুষও এই গল্পের সঙ্গে নিজেদের আবেগকে মিলিয়ে দেখছেন।
একটি সাধারণ ট্যাটু কীভাবে একজন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে, সেই ভাবনাই সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে।
ট্যাটুর নেপথ্যে আসলে মায়ের ভালোবাসা
জেসিকার হাতে আঁকা কিবোর্ড হয়তো দেখতে একটি সাধারণ ট্যাটুর মতো। কিন্তু এর প্রতিটি অক্ষরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তাঁর সন্তানের প্রয়োজন, নিরাপত্তা এবং স্বাধীনভাবে নিজের কথা বলার অধিকার।
হান্টারের ট্যাবের ব্যাটারি একদিন শেষ হয়ে গিয়েছিল। সেই ছোট্ট সমস্যাই মাকে ভাবতে বাধ্য করেছিল আরও স্থায়ী একটি বিকল্পের কথা।
সেখান থেকেই জন্ম নেয় হাতে কিবোর্ডের ট্যাটুর এই অভিনব ভাবনা। তাই এটি শুধু শরীরের ওপর আঁকা একটি নকশা নয়; বরং সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগের পথ সবসময় খোলা রাখার জন্য এক মায়ের ভালোবাসার প্রতীক।



