রুপক মূখার্জী,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : মঙ্গলগ্রহকে দূর থেকে দেখলে মনে হয়, লাল রঙের একটি নির্জন ও শুষ্ক পৃথিবী। কিন্তু এই গ্রহেরও রয়েছে ঋতুর পরিবর্তন। পৃথিবীর মতো মঙ্গলেও শীত আসে। আর সেই শীত কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তা ভাবলেই অবাক হতে হয়। মঙ্গলের কিছু অঞ্চলে তাপমাত্রা নেমে যেতে পারে মাইনাস ১৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি।
শুধু তীব্র ঠান্ডাই নয়, মঙ্গলের শীতকালে সেখানে এক ধরনের তুষারপাতও ঘটে। তবে সেই তুষার পৃথিবীর বরফের মতো নয়। মঙ্গলের বাতাসে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড থাকায় সেখানকার শীতের বরফ মূলত জমাট বাঁধা কার্বন ডাই-অক্সাইড বা ‘ড্রাই আইস’।
অর্থাৎ পৃথিবীতে যেখানে জল জমে বরফ হয়, মঙ্গলের মেরু অঞ্চলে প্রচণ্ড ঠান্ডায় বাতাসের কার্বন ডাই-অক্সাইডই সরাসরি কঠিন পদার্থে পরিণত হয়।
মঙ্গলগ্রহে কেন এত ঠান্ডা?
মঙ্গল সূর্য থেকে পৃথিবীর তুলনায় অনেক দূরে। ফলে সেখানে সূর্যের আলো ও তাপের পরিমাণও তুলনামূলকভাবে কম পৌঁছায়। তার ওপর মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর তুলনায় অত্যন্ত পাতলা।
মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলের প্রধান উপাদান কার্বন ডাই-অক্সাইড। এই গ্যাসের পরিমাণ প্রায় ৯৫ শতাংশ। বাকি অংশে রয়েছে অল্প পরিমাণ নাইট্রোজেন, আর্গন এবং অন্যান্য গ্যাস।
পাতলা বায়ুমণ্ডলের কারণে মঙ্গলগ্রহ তাপ ধরে রাখতে পৃথিবীর মতো কার্যকর নয়। দিনের বেলায় সূর্যের আলোয় কোনো কোনো এলাকায় কিছুটা উষ্ণতা তৈরি হলেও রাত নামার পর তাপমাত্রা দ্রুত কমে যায়।
বিশেষ করে মেরু অঞ্চলে শীতের সময় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। তখন তাপমাত্রা এতটাই কমে যায় যে বাতাসে থাকা কার্বন ডাই-অক্সাইড জমে কঠিন বরফে পরিণত হতে শুরু করে।
মঙ্গলের তুষারপাত পৃথিবীর মতো নয়
পৃথিবীতে তুষারপাত বলতে আমরা সাধারণত জলীয় বাষ্প থেকে তৈরি বরফের কণাকে বুঝি। মেঘের মধ্যে জল জমে বরফের কণা তৈরি হয় এবং পরে তা তুষার হিসেবে মাটিতে পড়ে।
মঙ্গলের ক্ষেত্রে গল্পটা একেবারেই আলাদা।
মঙ্গলের মেরু অঞ্চলে শীতের সময় কার্বন ডাই-অক্সাইডের তাপমাত্রা তার হিমাঙ্কের নিচে চলে গেলে তা গ্যাসীয় অবস্থা থেকে সরাসরি কঠিন অবস্থায় চলে যায়। ফলে সেখানে তৈরি হয় ড্রাই আইস।
এই প্রক্রিয়াকে অনেকটা এমনভাবে ভাবা যায়—পানি যেমন জমে বরফ হয়, তেমনই মঙ্গলের অত্যন্ত ঠান্ডা পরিবেশে কার্বন ডাই-অক্সাইড জমে বরফে পরিণত হয়।
তবে বিষয়টি শুধু মেঘ থেকে তুষার পড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মাটির কাছাকাছি থাকা কার্বন ডাই-অক্সাইডও প্রচণ্ড ঠান্ডায় জমাট বাঁধতে পারে। ফলে মঙ্গলের পৃষ্ঠে তৈরি হয় বরফের মতো একটি স্তর।
মঙ্গলের বরফ আসলে ড্রাই আইস
‘ড্রাই আইস’ শব্দটির সঙ্গে পৃথিবীর মানুষের পরিচয় রয়েছে। পৃথিবীতে কার্বন ডাই-অক্সাইডকে অত্যন্ত কম তাপমাত্রায় জমিয়ে ড্রাই আইস তৈরি করা হয়। এটি সাধারণ বরফের মতো গলে তরল হয় না। বরং উষ্ণ পরিবেশে সরাসরি গ্যাসে পরিণত হয়।
মঙ্গলেও একই ধরনের ঘটনা ঘটে।
শীতের সময় মেরু অঞ্চলের তাপমাত্রা অত্যন্ত কমে গেলে বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাই-অক্সাইড জমাট বাঁধে। এই জমাট কার্বন ডাই-অক্সাইড মঙ্গলের পৃষ্ঠে বরফের আস্তরণ তৈরি করে।
মজার ব্যাপার হলো, এই জমাট স্তরের পরিমাণও মঙ্গলের ঋতুর সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। শীত যত বাড়ে, তত বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড বরফে পরিণত হয়।
মঙ্গলগ্রহে কি সারা শীতকাল মাইনাস ১৩০ ডিগ্রি থাকে?
মঙ্গলের শীত মানেই সারাক্ষণ মাইনাস ১৩০ ডিগ্রি—বিষয়টি এমন নয়।
মাইনাস ১৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি তাপমাত্রা মূলত অত্যন্ত ঠান্ডা পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে মেরু অঞ্চলে দেখা যেতে পারে। মঙ্গলের বিভিন্ন জায়গায় তাপমাত্রার পার্থক্যও অনেক।
দিন ও রাতের সময়েও তাপমাত্রা বদলায়। মঙ্গলের বিষুবীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি যেমন, মেরু অঞ্চলের পরিস্থিতি তেমন নয়।
শীতের তীব্রতা নির্ভর করে গ্রহের কোন অংশে অবস্থান করা হচ্ছে, সেখানে সূর্যের আলো কতটা পৌঁছাচ্ছে এবং সেই সময় মঙ্গলের ঋতুচক্রের কোন পর্যায় চলছে—এসব বিষয়ের ওপর।
তাই ‘মঙ্গলের তাপমাত্রা মাইনাস ১৩০ ডিগ্রি’ বলার চেয়ে বলা বেশি সঠিক যে, মঙ্গলের কিছু এলাকায় এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে তাপমাত্রা এত নিচে নেমে যেতে পারে।
মঙ্গলের শীতকালে মেরু অঞ্চল অন্ধকার হয়ে যায়
মঙ্গলের মেরু অঞ্চলে শীত শুধু ঠান্ডা নিয়ে আসে না, আলোও কমিয়ে দেয়। দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে সূর্যের আলো অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই অন্ধকার ও ঠান্ডা পরিবেশ কার্বন ডাই-অক্সাইড জমাট বাঁধার জন্য আদর্শ পরিস্থিতি তৈরি করে। ফলে মঙ্গলের মেরু অঞ্চলে শীতকালে ড্রাই আইসের স্তর বাড়তে থাকে।
এই দৃশ্য পৃথিবীর মেরু অঞ্চলের বরফের সঙ্গে কিছুটা তুলনা করা গেলেও এর গঠন ও প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ আলাদা। পৃথিবীর মেরু বরফের প্রধান উপাদান জল। কিন্তু মঙ্গলের মৌসুমি মেরু বরফের বড় অংশই কার্বন ডাই-অক্সাইড।
বসন্ত এলেই গায়েব হতে শুরু করে বরফ
মঙ্গলের শীত চিরস্থায়ী নয়। পৃথিবীর মতো সেখানেও ঋতুর পরিবর্তন ঘটে। শীতের পর যখন বসন্ত আসে, তখন সূর্যের আলো বাড়তে শুরু করে।
তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মঙ্গলের পৃষ্ঠে জমে থাকা কার্বন ডাই-অক্সাইড বরফ আর স্থায়ী থাকতে পারে না। এটি ধীরে ধীরে আবার গ্যাসে পরিণত হয়ে বায়ুমণ্ডলে ফিরে যায়।
অর্থাৎ এখানে বরফ গলে পানি হয় না। বরং কঠিন কার্বন ডাই-অক্সাইড সরাসরি গ্যাসে পরিণত হয়।
এই প্রক্রিয়াকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘সাবলিমেশন’ বলা হয়। ফলে মঙ্গলের শীতকালে তৈরি হওয়া মৌসুমি ড্রাই আইসের স্তর বসন্ত ও উষ্ণতার সঙ্গে আবার কমতে থাকে।
মঙ্গলের ঋতু পৃথিবীর মতো হলেও এক নয়
মঙ্গলগ্রহের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, সেখানেও ঋতুর পরিবর্তন রয়েছে। এর অন্যতম কারণ পৃথিবীর মতোই মঙ্গলের ঘূর্ণন অক্ষ কিছুটা হেলে রয়েছে।
তবে মঙ্গলের একটি বছর পৃথিবীর বছরের তুলনায় অনেক দীর্ঘ। মঙ্গল সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে প্রায় ৬৮৭ পৃথিবী-দিন সময় নেয়। ফলে সেখানে একটি ঋতুও পৃথিবীর তুলনায় দীর্ঘ সময় ধরে থাকতে পারে।
এই দীর্ঘ ঋতুচক্রের কারণে মঙ্গলের মেরু অঞ্চলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের বরফ তৈরি এবং আবার গ্যাসে ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়াও দীর্ঘ সময় ধরে চলে।
বিজ্ঞানীরা মঙ্গলের এই পরিবর্তনগুলো পর্যবেক্ষণ করে গ্রহটির আবহাওয়া, বায়ুমণ্ডল এবং জলবায়ু সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করেন।
মঙ্গল নিয়ে গবেষণায় এই বরফ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
মঙ্গলের বরফ শুধু একটি আশ্চর্যজনক প্রাকৃতিক ঘটনা নয়। গ্রহটির সামগ্রিক পরিবেশ বোঝার ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব রয়েছে।
মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের চলাচল ঋতুর সঙ্গে বদলে যায়। শীতকালে মেরু অঞ্চলে এর একটি অংশ বরফ হয়ে জমে যায়। আবার উষ্ণতা বাড়লে সেটি গ্যাস হয়ে বায়ুমণ্ডলে ফিরে আসে।
এই প্রক্রিয়া মঙ্গলের বায়ুচাপ এবং বায়ুমণ্ডলের আচরণেও প্রভাব ফেলে। তাই মঙ্গলের ঋতু পরিবর্তন এবং মেরু অঞ্চলের বরফ নিয়ে গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা গ্রহটির বর্তমান পরিবেশের পাশাপাশি তার অতীত সম্পর্কেও ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
লাল গ্রহের শীত যেন অন্য এক পৃথিবী
পৃথিবীতে শীত মানেই কুয়াশা, শিশির, তুষার কিংবা বরফ। কিন্তু মঙ্গলের শীতের গল্প একেবারেই আলাদা।
সেখানে পানির বরফের পাশাপাশি কার্বন ডাই-অক্সাইডের বরফ তৈরি হয়। মেরু অঞ্চলে তাপমাত্রা ভয়াবহভাবে কমে যায়। অন্ধকার দীর্ঘ হয়। আর বসন্ত ফিরে এলে সেই জমাট কার্বন ডাই-অক্সাইড আবার গ্যাস হয়ে আকাশে ফিরে যায়।
তাই মঙ্গলগ্রহের শীতকে শুধু ‘অত্যন্ত ঠান্ডা’ বললে এর পুরো বৈশিষ্ট্য বোঝানো যায় না। এটি এমন একটি ঋতুচক্র, যেখানে বাতাসের একটি প্রধান গ্যাস নিজেই বরফ হয়ে গ্রহের মাটিতে জমে যায় এবং পরে আবার অদৃশ্য হয়ে বায়ুমণ্ডলে ফিরে আসে।
লাল গ্রহের এই অদ্ভুত আবহাওয়াই বিজ্ঞানীদের কাছে মঙ্গলকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। পৃথিবীর বাইরে আরেকটি গ্রহে ঋতুর এমন পরিবর্তন, তুষারপাতের এমন ভিন্ন রূপ এবং মাইনাস ১৩০ ডিগ্রির কাছাকাছি তাপমাত্রা—সব মিলিয়ে মঙ্গল যেন প্রকৃতির এক বিশাল পরীক্ষাগার।



