সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট...

Homeবিশ্ব সংবাদওয়েস্ট বেঙ্গলমিরিকে ভূমিধসে রংভং নদী অবরুদ্ধ, তৈরি কৃত্রিম হ্রদ; তলব সেনাবাহিনী

মিরিকে ভূমিধসে রংভং নদী অবরুদ্ধ, তৈরি কৃত্রিম হ্রদ; তলব সেনাবাহিনী

এই মুহূর্তে প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য হল কৃত্রিম হ্রদ থেকে সম্ভাব্য বিপদ এড়ানো এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত নদী সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বিশ্বজ্যোতি দাস, আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : পাহাড়ি এলাকায় একের পর এক ভূমিধসে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সিকিমের পর এবার দার্জিলিং পাহাড়ের মিরিকে ভূমিধসের জেরে রংভং নদীর স্বাভাবিক গতিপথ কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছে। পাহাড় থেকে নেমে আসা বিপুল পরিমাণ মাটি ও পাথর নদীতে জমে যাওয়ায় সেখানে তৈরি হয়েছে বড়সড় একটি কৃত্রিম জলাধার বা হ্রদ।

এই পরিস্থিতিতে হড়পা বান বা আচমকা জলস্রোতের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কৃত্রিম হ্রদের বাঁধের মতো তৈরি হওয়া অংশ কোনওভাবে ভেঙে গেলে নীচের বিস্তীর্ণ এলাকায় দ্রুত জল নেমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন প্রশাসনের আধিকারিকরা। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে ইতিমধ্যেই বহু পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। মোতায়েন করা হয়েছে বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী। তলব করা হয়েছে সেনাবাহিনীকেও।

শনিবার থেকে মিরিক বস্তি-২ এলাকার রংভাং খোলায় ভূমিধস শুরু হয়েছে। পাহাড়ের ঢাল থেকে একের পর এক মাটি ও পাথর নেমে এসে রংভং নদীতে পড়তে থাকে। এর ফলে নদীর স্বাভাবিক জলপ্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয়।

ধসের ধ্বংসাবশেষ জমে নদীর একাংশে কার্যত কৃত্রিম বাঁধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সেই বাঁধের পিছনে বিপুল পরিমাণ জল জমে তৈরি হয়েছে কৃত্রিম হ্রদ।

প্রশাসনের কাছে এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ, এই অস্থায়ী জলাধার কতটা স্থিতিশীল। ফের বড় ধরনের ভূমিধস হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

রংভং নদীতে তৈরি হওয়া কৃত্রিম হ্রদ নিয়ে আতঙ্কের মূল কারণ হড়পা বান। যদি জমে থাকা জলের চাপ বাড়তে থাকে এবং কোনওভাবে মাটি-পাথরের তৈরি বাঁধ ভেঙে যায়, তাহলে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল জল নীচের দিকে নেমে যেতে পারে।

এতে মিরিকের নীচু এলাকার পাশাপাশি রাস্তাঘাট ও বসতবাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমনকি নকশালবাড়ি থেকে কার্শিয়াং বনাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তবে কৃত্রিম হ্রদটি নিশ্চিতভাবে ভেঙে পড়বে কি না, সে বিষয়ে এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি প্রশাসন। ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণে বিশেষজ্ঞরা পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছেন।

ভূমিধসের জেরে মিরিকের পাহিলাগাঁও স্কুল দারা-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের লাবারবোটার লোয়ার পালজারগাঁও এলাকায় পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক বলে জানা গিয়েছে।

এলাকায় প্রায় ৩৩টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃত্রিম হ্রদের কাছাকাছি বসবাসকারী পরিবারগুলিকে ইতিমধ্যেই নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় লেপচা কমিউনিটি হলে তাঁদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

দার্জিলিংয়ের জেলাশাসক হরিকৃষ্ণ পানিক্কর জানিয়েছেন, হ্রদ সংলগ্ন এলাকা থেকে ৩৩টি পরিবারকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতির উপর নিয়মিত নজর রাখা হচ্ছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় একাধিক বিপর্যয় মোকাবিলা সংস্থাকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। এনডিআরএফ এবং এসডিআরএফের বিশেষ দল ইতিমধ্যেই এলাকায় পৌঁছে কাজ শুরু করেছে। এসএসবিকেও পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজে লাগানো হয়েছে।

এর পাশাপাশি সেনাবাহিনীকে তলব করা হয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় উদ্ধারকাজ এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেনাবাহিনীর অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ বলে জানা গিয়েছে।

অন্যদিকে, অর্জুন বাহিনী ট্রাস্টের ‘ডিজাস্টার টাস্ক ফোর্স’-এর সদস্যরাও ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে হাত লাগিয়েছেন।

কৃত্রিম হ্রদে আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ জল কীভাবে নিরাপদে বের করে দেওয়া যায়, এখন সেটাই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এ জন্য নদী বিশেষজ্ঞ ও ইঞ্জিনিয়ারদের একটি বিশেষ দল ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। তাঁরা হ্রদের গভীরতা, জলস্তর, মাটি ও পাথরের বাঁধের স্থায়িত্ব এবং নদীর বর্তমান পরিস্থিতি পরীক্ষা করছেন।

হঠাৎ করে জল বের করে দেওয়ার চেষ্টা করলেও বিপদ হতে পারে। কারণ একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ জল নীচের দিকে নেমে গেলে সেটিও হড়পা বানের মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছে প্রশাসন।

রংভং নদী পাহাড় থেকে নেমে সমতলে এসে বালাসন নদীর সঙ্গে মিশেছে। ফলে রংভং নদীতে কোনও বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটলে তার প্রভাব শুধু মিরিকের আশপাশে সীমাবদ্ধ থাকবে না বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এই কারণেই নদী সংলগ্ন এবং সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলিতে প্রশাসন বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে। বাসিন্দাদেরও পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা জেলা প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জেলাশাসক, পুলিশ সুপার, মহকুমাশাসক, বিডিও-সহ প্রশাসনের অন্যান্য আধিকারিকরা।

বৈঠকে সম্ভাব্য বিপর্যয় মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়। কোনও বড় ধরনের দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে, তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

রাজু বিস্তা জানিয়েছেন, ভূমিধসের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উদ্ধার এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে অর্জুন বাহিনীকে মোতায়েন করা হয়।

কৃত্রিম হ্রদের বাঁধ ভেঙে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটবে কি না, এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে সম্ভাব্য ঝুঁকিকে কোনওভাবেই হালকাভাবে নিতে চাইছে না প্রশাসন।

এই কারণেই আগে থেকেই নদীর আশপাশের বিপজ্জনক এলাকা থেকে সাধারণ মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এনডিআরএফ, এসডিআরএফ, এসএসবি, অর্জুন বাহিনী এবং সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের নজরদারিতে রয়েছে কৃত্রিম হ্রদ এবং ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়ি ঢাল। নতুন করে ধস নামে কি না, জলস্তর বাড়ছে কি না এবং নদীর প্রবাহের পরিস্থিতি কী—সবকিছুর উপর নজর রাখা হচ্ছে।

মিরিকের এই ঘটনা পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের পর তৈরি হওয়া দ্বিতীয় পর্যায়ের বিপদের কথাও সামনে এনেছে। পাহাড় ধসে শুধু রাস্তা বা বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, নদীর গতিপথ বন্ধ হয়ে গেলে নতুন করে জল জমে বড় বিপদ তৈরি হতে পারে।

এই মুহূর্তে প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য হল কৃত্রিম হ্রদ থেকে সম্ভাব্য বিপদ এড়ানো এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত নদী সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

মিরিকে রংভং নদীর উপর তৈরি হওয়া এই কৃত্রিম জলাধারের পরিস্থিতি এখন প্রশাসন, বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী এবং বিশেষজ্ঞদের কড়া নজরদারিতে রয়েছে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ