সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট...

Homeবিশ্ব সংবাদবাংলাদেশসায়মা ওয়াজেদের পদত্যাগ: অর্থাভাব ও আস্থাহীনতার কথা জানিয়ে হু-এর পদ ছাড়লেন হাসিনার...

সায়মা ওয়াজেদের পদত্যাগ: অর্থাভাব ও আস্থাহীনতার কথা জানিয়ে হু-এর পদ ছাড়লেন হাসিনার কন্যা

২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সদস্য দেশগুলোর ভোটে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক অধিকর্তা হিসেবে নির্বাচিত হন সায়মা ওয়াজেদ। পরের বছর ফেব্রুয়ারিতে পাঁচ বছরের মেয়াদে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি।

এনবি সংবাদ অনলাইন : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক অধিকর্তার পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। দীর্ঘদিন বেতন ও সম্মানী ছাড়া ছুটিতে থাকার পর বুধবার তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন। পদত্যাগপত্রে নিজের আর্থিক সংকটের পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রস অ্যাডানম গেব্রিয়েসুসের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা হারানোর কথাও জানিয়েছেন তিনি।

সায়মা ওয়াজেদের পদত্যাগের ঘটনাটি এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন তাঁর বিরুদ্ধে পদের অপব্যবহার, আর্থিক অনিয়ম এবং অন্যান্য অভিযোগ নিয়ে তদন্ত চলছিল। অবশ্য এসব অভিযোগ শুরু থেকেই অস্বীকার করে আসছেন শেখ হাসিনার কন্যা।

২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সদস্য দেশগুলোর ভোটে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক অধিকর্তা হিসেবে নির্বাচিত হন সায়মা ওয়াজেদ। পরের বছর ফেব্রুয়ারিতে পাঁচ বছরের মেয়াদে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি।

হু-এর আঞ্চলিক অধিকর্তার পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে জনস্বাস্থ্য নীতি, রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যবিধি এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্য কর্মসূচি বাস্তবায়নে এই পদে থাকা কর্মকর্তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে।

সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভোটের মাধ্যমে আঞ্চলিক অধিকর্তা নির্বাচিত হন। সেই প্রক্রিয়াতেই পাঁচ বছরের জন্য দায়িত্ব পেয়েছিলেন সায়মা।

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ওই সময় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি শেখ হাসিনার পরিবারের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ ও তদন্ত সামনে আসে।

সায়মা ওয়াজেদও এর বাইরে থাকেননি। বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদক তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত শুরু করে। এর পর থেকেই তাঁর হু-এর দায়িত্ব পালন নিয়েও নানা প্রশ্ন তৈরি হয়।

২০২৫ সালের জুলাই মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাঁকে বেতনহীন ছুটিতে পাঠায়। এরপর থেকে পদত্যাগের আগ পর্যন্ত তিনি আর নিয়মিত দায়িত্ব পালন করতে পারেননি বলে জানা যায়।

সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছিল। এর মধ্যে পদের অপব্যবহার ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ছিল অন্যতম। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে চীন সফরকে কেন্দ্র করে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও তোলা হয়েছিল।

এ ছাড়া তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। তবে এসব অভিযোগের কোনোটি স্বীকার করেননি সায়মা।

গত ৩ জুলাই তাঁর আইনজীবীরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করেন। সেখানে সায়মার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।

সায়মার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে একটি জমি অবৈধভাবে দখলের অভিযোগও সামনে এসেছিল। পদত্যাগপত্রে এই অভিযোগও অস্বীকার করেছেন তিনি।

সায়মার দাবি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক অধিকর্তার দায়িত্ব পাওয়ার অনেক আগেই তিনি ওই জমি অধিগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য একটি আইনের আওতায় ওই জমির মালিকানা তিনি পেয়েছেন।

অর্থাৎ, তাঁর দাবি অনুযায়ী, হু-এর দায়িত্বে থাকার সময় তিনি ওই জমি দখল করেননি। বরং দায়িত্ব গ্রহণের আগেই জমিটির সঙ্গে তাঁর মালিকানার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।

পদত্যাগপত্রে সায়মা ওয়াজেদ তাঁর আর্থিক পরিস্থিতির কথাও তুলে ধরেছেন। দীর্ঘ সময় বেতন বা সম্মানী না পাওয়ায় তাঁর ব্যক্তিগত আর্থিক চাপ বেড়ে গিয়েছিল বলে জানিয়েছেন তিনি।

তিনি অভিযোগ করেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালকের নির্দেশে তাঁকে দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখা হয়েছে। দীর্ঘদিন এভাবে থাকার ফলে সংস্থাটির নেতৃত্বের ওপর তাঁর আস্থা ও বিশ্বাস নষ্ট হয়েছে বলেও পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেন সায়মা।

তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, দায়িত্ব পালনের সুযোগ না দিয়ে দীর্ঘ সময় বেতনহীন অবস্থায় রাখা তাঁর জন্য আর্থিকভাবে অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। সেই কারণেই তিনি শেষ পর্যন্ত পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।

পদত্যাগপত্রে সায়মা ওয়াজেদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রস অ্যাডানম গেব্রিয়েসুসের নেতৃত্ব নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

তিনি জানান, দায়িত্ব পালন থেকে তাঁকে বিরত রাখার ধারাবাহিকতায় হু-এর নেতৃত্বের প্রতি তাঁর আস্থা ও বিশ্বাস নষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, নিজের দায়িত্ব তিনি আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করেছেন।

অর্থাৎ, সায়মার পদত্যাগের পেছনে শুধু তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নয়, দায়িত্ব পালনের সুযোগ না পাওয়া এবং দীর্ঘদিন বেতনহীন অবস্থায় থাকার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সায়মার পদত্যাগের আগে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে বরখাস্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, হু-এর পক্ষ থেকে নতুন আঞ্চলিক অধিকর্তা নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করার পরিকল্পনাও করা হয়েছিল। একটি সূত্র দাবি করেছে, ১২ অক্টোবর নতুন প্রার্থী মনোনয়নের জন্য আহ্বান জানানোর পরিকল্পনা ছিল। এরপর ডিসেম্বর মাসে মনোনয়ন যাচাই এবং পরবর্তী সময়ে ২৪ জানুয়ারি নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলেও ওই সূত্র জানিয়েছে।

তবে এসব পরিকল্পনা বাস্তবে কীভাবে এগোত, তা সায়মার পদত্যাগের পর নতুন পরিস্থিতিতে নির্ভর করবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক অধিকর্তার দায়িত্ব কেবল প্রশাসনিক নয়। একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি, রোগ প্রতিরোধ, জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি এবং সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে এই পদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চল জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। বাংলাদেশ, ভারতসহ বেশ কয়েকটি দেশ এই অঞ্চলের আওতায় রয়েছে। ফলে এই অঞ্চলের স্বাস্থ্যনীতি ও রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রমে আঞ্চলিক অধিকর্তার সিদ্ধান্তের প্রভাব রয়েছে।

এই গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচিত হওয়ার পর সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর বেতনহীন ছুটিতে যাওয়া আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার অন্দরেও বিষয়টি আলোচনায় নিয়ে আসে।

সায়মা ওয়াজেদের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক অধিকর্তা হিসেবে তাঁর দায়িত্বের অধ্যায় শেষ হলো। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে বাংলাদেশের তদন্ত বা অন্যান্য প্রক্রিয়ার কী ফল হবে, সেটি এখনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সায়মা অবশ্য অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন এবং নিজের পদত্যাগের ক্ষেত্রে আর্থিক সংকট ও হু-এর নেতৃত্বের সঙ্গে আস্থার সংকটকে সামনে এনেছেন।

ফলে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নিয়ে যে তদন্ত ও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সায়মা ওয়াজেদের পদত্যাগ সেই ধারাবাহিকতায় নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এখন নজর থাকবে তাঁর বিরুদ্ধে চলমান অভিযোগ ও তদন্তের পরবর্তী গতিপথের দিকে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ